আজকের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মোট প্রার্থীর ৪৮ শতাংশই ব্যবসায়ী। এ প্রার্থীদের অনেকে দাবি করেছেন, তারা নির্বাচিত হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহজে ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, অতীতে অনেক ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে শুধু নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। দেশ ও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখেননি।
এবার ফেনী-৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসনে বিএনপির প্রার্থী দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি অতীতে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি হিসেবে কাজ করেছি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছি। আমি কী করেছি তা সবাই জানেন। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হতে পারলে অবশ্যই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করব। আমরা ব্যবসায়ীরা যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ভালো-মন্দ বুঝতে পারব তা অন্য পেশা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পারবেন না।’
আরেক ব্যবসায়ী প্রার্থী তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি মাহমুদ হাসান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে তৈরি পোশাক খাতসহ সব শিল্প খাতের জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করব। আশা করি, এতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
তবে সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে ব্যবসায়ীরা সংসদ সদস্য হয়েও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেননি। বরং নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। এসব ব্যবসা-বাণিজ্য সব যে আইনি পথে হয়েছে তাও না।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘নির্বাচনি হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থীর মূল পেশা ব্যবসা। এবারের সংসদ নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। এতে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে ২৭৭ জন স্বতন্ত্র । এর মধ্যে অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা ৮৯১ জন। অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের মোট মূল্যের ভিত্তিতে ২৭ জন শতকোটিপতি প্রার্থী।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রার্থীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থীর মূল পেশা ব্যবসা। এসব ব্যবসায়ী নির্বাচিত হওয়ার পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে অতীতে দেখা গেছে অনেক ব্যবসায়ী নির্বাচিত হওয়ার পর দেশের অর্থনীতির জন্য কিছু না করে নিজে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। তারা অনেক কিছু আইনিভাবে ঠিক না হলেও করেছেন।’
টিআইবির তথ্য মতে, আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত ২৬ জনের সম্পদের পরিমাণ শতকোটি টাকা। পাশাপাশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হালনাগাদ বাজারমূল্য বিবেচনায় মোট ৮৯১ প্রার্থী কোটিপতির তালিকায় রয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী ১০ প্রার্থীর মধ্যে শীর্ষে আবদুল আউয়াল মিন্টু। নির্বাচনি হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার এবং তার স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়ালের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য ৬০৭ কোটি টাকা। ধনী প্রার্থীদের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। নির্বাচনি হলফনামার তথ্যে দেখা যায়, তার ও তার স্ত্রী জামিলা নাজনীল মাওলা এবং কন্যা মেহরীন আনহারের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সম্মিলিত মূল্য ৪৭৪ কোটি টাকা। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তিনজনই পেশাগতভাবে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ধনী প্রার্থীদের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন ময়মনসিংহ-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদ। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তারের নামে রয়েছে ৭ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ। ফখর উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রী–দুজনই পেশায় ব্যবসায়ী। পাশাপাশি হলফনামায় তার নামে ১৫ কোটি টাকার ব্যাংকঋণের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ধনী প্রার্থীদের তালিকার চতুর্থ অবস্থানে আছেন কুমিল্লা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী জাকারিয়া তাহের। নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী, তার এবং তার স্ত্রী নাজনীন আহমেদের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২৯২ কোটি টাকা।
পঞ্চম অবস্থানে আছেন টাঙ্গাইল-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীর। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী, তার ও তার স্ত্রী সুলতানা জাহানের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সম্মিলিত বাজারমূল্য ২৮৩ কোটি টাকা।
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম। বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্য বাগেরহাট-১, ২ ও ৩–এই তিনটি আসনে নির্বাচন করছেন। হলফনামার তথ্যে দেখা যায়, তার একক মালিকানাধীন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২৬২ কোটি টাকা। একই সঙ্গে তার নামে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার দায়ের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে।
তালিকার সপ্তম স্থানে আছেন চাঁদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. জালাল উদ্দীন। নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী, তার এবং তার স্ত্রী শাহনাজ শারমীনের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য ২৪৯ কোটি টাকা। পেশাগতভাবে দুজনই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
ধনী প্রার্থীদের তালিকার অষ্টম স্থানে রয়েছেন বগুড়া-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। হলফনামার তথ্যে দেখা যায়, তিনি, তার স্ত্রী শাহনাজ সিরাজ এবং পুত্র আসিফ রাব্বানী– তিনজনই পেশায় ব্যবসায়ী। তাদের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য ২০৪ কোটি টাকা।
নবম অবস্থানে আছেন নোয়াখালী-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম। হলফনামা অনুযায়ী, স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তার মোট সম্পদের বর্তমান মূল্য ১৯০ কোটি টাকা।
শীর্ষ ১০ ধনী প্রার্থীর তালিকার দশম স্থানে রয়েছেন শরীয়তপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. সফিকুর রহমান। টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য ১৮৫ কোটি টাকা। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী এবং দুটি ব্যাংকে তার নামে ৪১ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে।