দেশের ফুটবলের পালে বেশ ভালোভাবেই হাওয়া লেগেছে। যেন বসন্ত বাতাসে উড়ছে দোপাট্টা। সিঙ্গাপুরের কাছে ২-১ গোলে হারের পরও দর্শকদের মধ্যে নেই বেদনার রং। সেখানে আছে অন্য রকম এক তৃপ্তি। দলকে নিয়ে উচ্ছ্বাস। কণ্ঠ দিয়ে বের হয়েছে হর্ষধ্বনি। ভালো খেলার জন্য খেলোয়াড়রা দর্শকদের কাছ থেকে পেয়েছেন লেটার মার্কস। জয়-পরাজয়কে তারা খেলারই একটি অংশ হিসেবে নিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর নারী-পুরুষে পূর্ণ দর্শক স্টেডিয়াম ছেড়েছেন তৃপ্তির ঢেকুর নিয়ে। আশার ভেলা ভাসিয়ে দিয়েছেন আগামীর জন্য। বুকে লালন করছেন জয়ের স্বপ্ন। এভাবে খেললে জয় পেতে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না বলে। দল একটি শক্ত অবস্থানেও পৌঁছে যাবে বলে বিশ্বাস তাদের।
মঙ্গলবার গোটা বাংলাদেশ ছিল ফুটবলময়। যারা টিকিটধারী ছিলেন তাদের গন্তব্য ছিল স্টেডিয়ামমুখী। যারা স্টেডিয়ামমুখী ছিলেন না, তারা প্রস্তুতি নিয়েছেন ঘরে বসে টিভির পর্দায় খেলা দেখার। বিভিন্ন জায়গায় জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখার যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেখানে ফুটবলপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল অকল্পনীয়। রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর, সিলেটের আলীয়া মাদ্রাসা কিংবা ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস পার্ক ছিল এক একটি মিনি স্টেডিয়ামের মতোই। ঈদ আড্ডায় একটা ভালো জায়গাজুড়ে ছিল এই ম্যাচ। এভাবেই সবাই ফুটবলজ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। খেলা শেষেও এর রেশে শেষ হয়ে যায়নি।
বুধবার বিভিন্ন জায়গায় ছিল ম্যাচ নিয়ে নিজেদের মতো করে পোস্টমর্টেম করা। যেখানে অনেকেই খোঁজে পেয়েছেন কোচ হাভিয়ের কাবরেরার ত্রুটি। দল নির্বাচনে ভুল। খেলোয়াড় পরিবর্তনে ভুল। ম্যাচের পরিকল্পনায় ভুল। দুটি গোলের জন্য দর্শকদের কাছে আসামির কাঠগড়ায় গোলরক্ষক মিতুল মার্মা। কিন্তু যখনই তারা জানতে পেরেছেন কয়েকদিন আগে ভাই মারা যাওয়ার কষ্ট নিয়ে খেলেছেন, তখনই আবার তারা মিতুলের প্রতি সদয় হয়ে উঠেছেন। এ রকম পরিস্থিতি তাকে খেলানোই কোচের ঠিক হয়নি বলে জানান তারা। অধিনায়ক হওয়ার পরও জামাল ভূঁইয়াকে না খেলানো, এমনকি বদলি হিসেবেও মাঠে না নামানোকে তারা মেনে নিতে পারেননি। ভুটানের বিপক্ষে জামাল ভূঁইয়ার কর্নার থেকে হামজা হেড দিয়ে গোল করেছিলেন।
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর একপর্যায়ে বাংলাদেশ টানা চারটি কর্নার পেয়েছিল, যার একটিও কাজে লাগাতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা হেড করার জন্য হামজার কাছাকাছিও একটি বল যায়নি। অনেকেই মনে করেন জামাল ভূঁইয়া থাকলে তার যেকোনো একটি কাজে লাগত বলে দর্শকদের অগাধ বিশ্বাস ছিল। আবার এক গোল পরিশোধ করার পর গোলদাতা রাকিবকে নিচে নামিয়ে খেলানোও অনেকে অবাক হয়েছেন। যখন গোল পরিশোধের জন্য আরও আক্রমণাত্মক হওয়া প্রয়োজন ছিল। একমাত্র কোচ কাবরেরা ছাড়া আর কাউকে তারা দোষারোপ করেননি। হামজা-সামিত-ফাহমিদুলের খেলার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এভাবে কয়েকটি ম্যাচ খেললে সবার মাঝে ভালো বোঝাপড়া হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তারা। তখন দল আরও এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের ফুটবলে তারা নতুন দিনের গান শুনতে পাচ্ছেন।
বুধবার দর্শকরা যখন ম্যাচ নিয়ে আলোচনায় বুঁদ, তারা আগে মঙ্গলবার রাতেই ভাঙা হাটে পরিণত হয় টিম হোটেল। রাতেই অধিকাংশ ফুটবলার হোটেল ছেড়ে নিজ নিজ বাসায় চলে যান। হামজা-সামিত রাতে হোটেল না ছাড়লেও ভোরে আলো ছড়ানোর আগেই তারা হোটেল ছেড়ে হযরত শাহজালার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন। তাদের গন্তব্য দুই দেশ হলেও ঢাকা থেকে গিয়েছেন একই বিমানে তার্কিস এয়ারওয়েজে। ইস্তাম্বুল হয়ে হামজা যাবেন লন্ডনে, সামিত কানাডা। ফাহমিদুল অবশ্য দেশ ছাড়েননি। আপাতত দেশেই থাকবেন কয়েকদিন।
এমন হারে দর্শকরা যেমন হতাশ হননি, তেমনি হামজা-সামিতও। মঙ্গলবার ম্যাচ শেষে রাত ১১টার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে হামজা চৌধুরী পোস্টে ছিল সে রকমই। তিনি আশায় বুক বাঁধতে বলেছেন। লিখেছেন, ‘আমরা যেমনটা চেয়েছিলাম তেমনটা হয়নি! কিন্তু দল এবং জাতি হিসেবে আমরা গর্ব করতে পারি! আমাদের ইতিবাচক থাকতে হবে কারণ আমরা মাত্র শুরু করছি এবং ইনশাআল্লাহ আমরা খুব শিগগিরই যেখানে যেতে চাই সেখানে পৌঁছে যাব! ভালোবাসা এবং সমর্থনের জন্য হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ। দেখা হবে অক্টোবরে।’
বাংলাদেশের ফুটবলে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের রূপকার হামজা চৌধুরী। সেখানে হাওয়া লাগিয়েছেন ফাহমিদুল-সামিত সোম। হামজার ভারতের বিপক্ষে, ফাহমিদুলের ভুটানের বিপক্ষে এবং সামিত সোমের সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে অভিষেক হয়। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সামিতও শুনিয়েছেন আশার বাণী। ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘প্রথমবারের মতো দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার এবং খেলার এক অসাধারণ অনুভূতি হয়েছে। ধন্যবাদ বাংলাদেশ। ম্যাচে আমরা যা চেয়েছি, তা করতে পারিনি। তাই একটু হতাশ। তবে আমি দারুণ গর্বিত এই দলের অংশ হতে পেরে। আমার সতীর্থ, কোচিং স্টাফ, বাফুফের সব সদস্যের অনেক ধন্যবাদ। অবশ্যই ভক্তদের ধন্যবাদ আমাকে এভাবে গ্রহণ করার জন্য। সবে তো শুরু হলো।’