উত্তর স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জে আটলান্টিক সাগরের গর্জন ভেদ করে একটা ছোট্ট গ্রাম হাজার হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যার নাম স্কারা ব্রে। ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন বসতি। প্রাক ইতিহাসের নিওলিথিক যুগে, প্রায় ৩২০০ থেকে ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এখানে মানুষ নিজেদের জীবন সাজিয়েছিল পাথরের ঘরে, কৌশলে নির্মিত আসবাব এবং বুদ্ধিদীপ্ত নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, রোমান সাম্রাজ্য কিংবা মিসরের পিরামিডের আগেই এই গ্রামটি ছিল ব্যস্তবহুল এক সম্প্রদায়ের আশ্রয়স্থল।
১৮৫০ সালে এক প্রবল ঝড় স্কারা ব্রেকে প্রথম মানুষের চোখের সামনে উন্মোচিত করে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ বালুর টিলাগুলোকে ভেঙে ফেললে বেরিয়ে আসে ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। দেখতে দেখতে প্রত্নতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেন, এটি কোনো দুর্গ বা সমাধি নয় বরং মানুষের বসবাসের আবাস। আজও স্কারা ব্রে দেখে বিস্মিত হতে হয়, কারণ এখানকার প্রতিটি ঘর যেন জীবন্ত প্রমাণ; প্রাচীন মানুষজন কতটা উন্নত ছিল তাদের জীবনযাপনে।
গ্রামটিতে আটটি প্রায় সমান মাপের ঘর রয়েছে। প্রত্যেকটিতে দেখা যায় বিছানার মতো পাথরের কাঠামো, মাঝখানে অগ্নিকুণ্ড এবং দেয়ালের পাশে নির্মিত তাক, যা আজকের আধুনিক আলমারির পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়। বসতিগুলোর সংযোগ ছিল সুড়ঙ্গাকৃতির পথ দিয়ে, যা ঝোড়ো হাওয়া ও ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করত বাসিন্দাদের। বুদ্ধিমত্তার এই নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে যে, স্কারা ব্রের মানুষরা প্রকৃতিকে বুঝে নিজেদের জীবনযাপনকে নিরাপদ করে তুলতে জানত। তাদের খাদ্যতালিকায় ছিল মূলত মাছ, সামুদ্রিক শামুক-ঝিনুক, গৃহপালিত গরু, ভেড়া ও শস্য। ঘরগুলোর ভেতর পাওয়া গেছে মাছ কাটার ছুরি, হাড়ের তৈরি সুচ এবং নানা ধরনের পাথরের বাসন; যা তাদের দৈনন্দিন শিল্পকর্মের চিহ্ন বহন করে।
স্কারা ব্রে শুধু স্থাপত্যের জন্য নয়, মানুষের সামাজিক কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ঘর প্রায় একই নকশায় তৈরি, যা ইঙ্গিত দেয় এখানে সামাজিক সমতার ধারণা ছিল প্রবল। কোনো প্রাসাদ বা আলাদা অভিজাত আবাসের সন্ধান পাওয়া যায় না। মনে হয়, তারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল ছিল, পরিবারের সীমা ছাড়িয়ে গোটা গ্রামই ছিল সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা।
তবে স্কারা ব্রের মানুষের জীবন শুধু সংগ্রামের ছিল না; তাদের ছিল সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান এবং বিশ্বাস। এখানে বেশ কিছু পাথরের বস্তু এবং অলংকার পাওয়া গেছে, যেগুলোর ব্যবহার শুধু দৈনন্দিন কাজে নয়, ধর্মীয় বা প্রতীকী উদ্দেশ্যে হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এতে তাদের কল্পনাশক্তি ও ধর্মীয় চিন্তা-কল্পনার ছাপও স্পষ্ট।
তাহলে কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল এই গ্রাম? এই প্রশ্ন আজও গবেষকদের ভাবায়। একসময় ধারণা করা হতো, এক প্রবল ঝড় বা সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস গ্রামটিকে বসবাসের অনুপযোগী করে তোলে। আবার অনেকে বলেন, ধীরে ধীরে জলবায়ুর পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর কৃষিকাজের সমস্যার কারণে মানুষ নতুন আবাসের খোঁজে চলে যায়। উত্তর যাই হোক, স্কারা ব্রে যেন মানব ইতিহাসের একটি স্থির মুহূর্ত ধরে রেখেছে, যেখানে সময় থেমে আছে, আর আমরা তাকিয়ে আছি হাজার বছরের পুরোনো এক জগতে।
আজ স্কারা ব্রে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে সংরক্ষিত। প্রতি বছর পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসে এই বিস্ময়কর গ্রামটি দেখতে। এখানে দাঁড়ালে মনে হয়, পাথরের আসবাবগুলো যেন এখনো কোনো গৃহিণীর হাতের ছোঁয়া খুঁজছে, আগুনের চুল্লিতে এখনো ধোঁয়া ঠিকরে বেরিয়ে আসবে; মানুষদের হাসি-আনন্দ ঠিক এখানেই প্রতিধ্বনিত হবে আবার।
তারেক/
.jpg)
.jpg)