অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি অটোমোবাইলশিল্প নিয়েও কাজ করছে আকিজ গ্রুপ। এই শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, সংকট, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খবরের কাগজ কথা বলেছে আকিজ মোটরসের সিইও শেখ আমিনুদ্দিনের সঙ্গে।
খবরের কাগজ: অটোমোবাইল শিল্প সম্পর্কে কিছু বলুন।
শেখ আমিনুদ্দিন: দেশের ১৮ কোটি জনগণের জন্য অটোমোবাইল একটি অপরিহার্য যন্ত্র। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হওয়ায় নতুন গাড়ির চাহিদা কমে গেছে। তবে এই শিল্পের সম্ভাবনা অনেক বেশি। আগামী দিনে এর চাহিদা আরো কয়েকগুণ বাড়বে বলে আমি মনে করছি।
খবরের কাগজ: এই শিল্পের শুরু এবং বিকাশ নিয়ে কিছু বলুন।
শেখ আমিনুদ্দিন: অটোমোবাইল শিল্পের শুরু তো ব্রিটিশ আমল থেকেই। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে এর বিকাশ ঘটে। সার্বিকভাবে আমাদের দেশে ৮০-এর দশকে এর প্রসার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে অটোমোবাইল শিল্পের বাজার ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। অদূর ভবিষ্যতে এটা আরও বাড়বে।
খবরের কাগজ: অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে কোনো বাধা আছে কি?
শেখ আমিনুদ্দিন: এই শিল্পের বিকাশে অন্যতম বাধা হচ্ছে শুল্ক। এখানে আমরা শুধু অ্যাম্বেলিং (তৈরি) করতে পারছি। তাও সম্পূর্ভাবে হচ্ছে না। সরকারের যে নীতিমালা আছে, সেটা মেনে তৈরি করা সম্ভব না। কারণ এখানে শুল্কহারের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রে এই শুল্কহারের পরিমাণ অত্যধিক বেশি। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রে শুল্কহার নাই বললেই চলে। অনেক দেশে আবার ভর্তুকিও দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে ভর্তুকি তো দেয়ই না, উল্টো শুল্কহারও অনেক বেশি। প্রযুক্তির এই যুগে উন্নত বিশ্বে অধিকাংশ যানবাহনই বৈদ্যুতিক। আগামী দিন হবে বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিন। ফলে আমাদের দেশেও এই যানবাহনের ব্যবহার দিনে দিনে বাড়বে। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি সরকারের এই অটোমোবাইল খাতের স্টেকহোল্ডার এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সমন্বিতভাবে ভালো একটা নীতিমালা তৈরি করা দরকার।
খবরের কাগজ: সম্প্রতি সরকার অধিকাংশ পণ্যে ভ্যাট বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এতে অটোমোবাইল শিল্পে কী ধরনের প্রভাব পড়বে?
শেখ আমিনুদ্দিন: আমি শুনেছি, সেবার উপরেও ভ্যাট বাড়িয়েছে। অবশ্যই সরকারের টাকার প্রয়োজন। আমরা যদি সরকারকে সঠিকভাবে কর না দিই, তাহলে সরকার দেশটা চালাবে কীভাবে? তবে ভ্যাট বাড়ানোর একটা যৌক্তিক কাঠামো থাকতে হবে। যেমন বিলাসদ্রব্যে অবশ্যই ভ্যাট বেশি বাড়াতে পারে। যদি ডিজেলচালিত যন্ত্রে কর দিতে হয় ৩৭ থেকে ৫৭ শতাংশ তবে বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর ৮৯ শতাংশ হওয়া উচিত না। এক্ষেত্রে সরকারকে সমন্বয় করা উচিত। ডিজেল গাড়িকে কম উৎসাহিত করতে এর ওপর একটু বেশি হারে কর আরোপ করতে পারে। বিপরীতে বৈদ্যুতিক যানবাহনে করহার কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। যেহেতু আগামী দিনে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার অনেক বাড়বে। আর সেবার ক্ষেত্রে আমি মনে করি ১০ শতাংশ শুল্কহার হলে ভালো হতো।
খবরের কাগজ: আপনি বলছেন, আগামী দিনে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়বে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশেই সেটা উৎপাদনের সুযোগ আছে কি না।
শেখ আমিনুদ্দিন: সুযোগ আছে। তবে, এজন্য এখনই এ খাতের সব স্টক হোল্ডার এবং ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে যথাযথ এবং যুগোপযোগী একটা নীতিমালা করা দরকার। তাহলে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানও এই খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে স্থানীয়রাও উৎপাদনে আগ্রহী হবেন।
খবরের কাগজ: আমাদের দেশে অটোমোবাইল শিল্পে কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়? আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
শেখ আমিনুদ্দিন: বৈদ্যুতিক যান এবং হাইব্রিড একটি উন্নত প্রযুক্তির যান। এখানে আরও বেশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সামনে আমাদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কীভাবে আমরা পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নত প্রযুক্তির হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক যান আমদানি করতে পারি এবং এর ব্যবহারে বিস্তৃতি ঘটাতে পারি। আমরা যদি ভালোভাবে এর সেবা না দিতে পারি, তাহলে অনেক গাড়ি বসে যাবে। যেহেতু আমাদের প্রায় সব যানবাহনই বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়, সেক্ষেত্রে অবশ্যই আমরা আন্তর্জাতিক মানের যানবাহন আমদানি করি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের যানবাহন আমদানি করলাম কিন্তু এসব যানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যদি আন্তর্জাতিক মানের সেবা না দিতে পারি, তাহলে তো কোনো লাভ হবে না। তাই এখনই আন্তর্জাতিক মানের একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার।
খবরের কাগজ: আমাদের দেশে কোন ধরনের যানবাহনের চাহিদা বেশি?
শেখ আমিনুদ্দিন: আমাদের দেশে তো এখনো ডিজেলচালিত যানবাহনের চাহিদাই বেশি। তবে আমি মনে করি অদূর ভবিষ্যতে সবকিছুই বৈদ্যুতিক যানে চলে আসবে। বিদেশে বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক এবং মোটরসাইকেলের ব্যবহার অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক বাসগুলো আমাদের দেশে আসা উচিত। আমাদের দেশে ডিজেলচালিত যে বাস-ট্রাকগুলো চলে সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে আমাদের এখানে দুর্ঘটনার হারও বেশি। এখন যদি আমরা বৈদ্যুতিক যানে মনোযোগ দিই এবং আন্তর্জাতিক মানের যানবাহন ব্যবহারে আগ্রহী হই, তাহলে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাও অনেক বাড়বে। তবে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মান যাচাই-বাছাই করেই আমদানি করতে হবে।
বর্তমানে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হওয়ায় নতুন গাড়ি বিক্রি অনেকটাই কমে গেছে। তবে সারা বিশ্বে ইঞ্জিনচালিত মোটরসাইকেলের ব্যবহার অর্ধেকে নেমে গেছে। এর পরিবর্তে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে। ২০১৬-১৭ সালে আমরা মাত্র ১০টি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল আমদানি করে যাত্রা শুরু করেছিলাম। তখন অনেকেই খেলনা মোটরসাইকেল বলে আমাদের সমালোচনা করেছিলেন। আকিজ গ্রুপের জন্য এটা কোনো ভালো পদক্ষেপ নয় বলেও অনেকে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এখন আমরা প্রতি মাসেই অনেক বেশি পরিমাণে মোটরসাইকেল বিক্রি করছি। দিনে দিনে এর চাহিদা অনেক বেশি বাড়ছে।
খবরের কাগজ: আমদানি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে দেশেই যদি বৈদ্যুতিক-যানবাহনের উৎপাদন এবং বাজারজাত বাড়াতে চান, তাহলে সরকারের কোন ধরনের নীতি সহায়তা দরকার?
শেখ আমিনুদ্দিন: বৈদ্যুতিক যানবাহন তৈরির জন্য আমাদের পরিকল্পনা আছে। এজন্য দেশেই প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ উৎপাদন করব। এর জন্য যেসব উপকরণ দরকার সেখানে ডিউটি কমিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া যেসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে এই ধরনের কারখানা তৈরি করা হবে, তাদের প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দর কমিয়ে দিতে পারে। সরকার যদি এসব সহায়তা দেয়, তাহলে অনেক উদ্যোক্তাই এই খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। ফলে দেশেই বৈদ্যুতিক যানবাহনের উৎপাদন এবং ব্যবহার বাড়বে। এতে গ্রাহকরা অনেক কম দামেই এসব যান কিনতে পারবেন। তবে সরকারকে অবশ্যই আর্থিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। সরকারের শুল্ক নীতিমালা এবং প্রণোদনা যতদিন পর্যন্ত যুগোপযোগী না হবে ততদিন পর্যন্ত উৎপাদনকারীরা এই খাতে বিনিয়োগে আসবে না। কেননা এই খাতে বিনিয়োগে যারা আসবে তাদের যদি সরকার সুযোগ-সুবিধা না দেয় তাহলে এই অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশ ঘটবে না।
এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে সরকারের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়নি। সরকার যদি ডিজেল গাড়িতে ৫ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে দেয় ঠিক সেই পরিমাণ ই-ভিতে ছাড় দিতে পারেন। এক্ষেত্রে একটা অসমতাও নিশ্চিত হয়। কিছু সুযোগ সুবিধা দিলেই এই শিল্পটি ভবিষ্যতে বিকশিত হবে। একদিন যদি ঢাকা শহরে তেল ছাড়া গাড়ি চলে তাহলে কত টাকার সাশ্রয় হবে- এটা একটু চিন্তা করে দেখবেন। সেই সঙ্গে পরিবেশের ওপর কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটা বাস্তবায়ন হলে স্বাস্থ্য খাতের অনেক খরচ কমে যাবে। এটাকে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ, সারা পৃথিবীতেই আজ বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি।
খবরের কাগজ: আকিজ ছাড়া আর কোন কোন কোম্পানি বৈদ্যুতিক যান নিয়ে কাজ করছে?
শেখ আমিনুদ্দিন: আমরাই প্রথমদিকে বৈদ্যুতিক ভ্যান আমদানি করেছি। এবং আমরা খুব ভালো সাড়াও পেয়েছি। বৈদ্যুতিক যানের ক্ষেত্রে থ্রি হুইলার বা আমরা যেটাকে সিএনজি বলতাম, সেটা যেমন আমাদের পরিবেশের জন্য উপকার করেছে, ঠিক একই জিনিস পেট্রলের পরিবর্তে আমরা বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার আমদানি করেছি। এখানেই আমরা সেগুলো সংযোজন করছি।
এখন নতুন অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানই এই বৈদ্যুতিক যান নিয়ে কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে আগামীতে আরও অনেক কোম্পানি এই খাতে এগিয়ে আসবে। তারা সংযোজনের পাশাপাশি উৎপাদনও করবে। আমরা ২০১৭ সালে বৈদ্যুতিক যানের একটা মাত্র মোটরসাইকেলের মডেল নিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন আমাদের প্রায় সাত থেকে আটটি মডেল রয়েছে। শুধু তাই নয়, এখন আমরা মোটরসাইকেলের পাশাপাশি থ্রি-হুইলার, পিকআপ ভ্যানসহ আরও কিছু যান আমদানি করছি। আগামীতে তা আরও বাড়বে বলে আশা করছি।
খবরের কাগজ: বৈদ্যুতিক যানের ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন?
শেখ আমিনুদ্দিন: খুবই নগণ্য। তবে বাজারে যে ইজিবাইক চালু রয়েছে, সেগুলোর কথা ভিন্ন। তবে সত্যিকার অর্থে যেটাকে বৈদ্যুতিক যানবাহন বলি সেটা বাংলাদেশে একেবারেই নগণ্য।
খবরের কাগজ: অটোমোবাইল শিল্পের রপ্তানির কোনো সম্ভাবনা আছে কি না।
শেখ আমিনুদ্দিন: স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন না হলেও আমাদের এখানে সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানির সুযোগ আছে। আমরা এখানে রাইট হ্যান্ড ড্রাইভ করি। এটা পৃথিবীর অনেক দেশেই করে থাকে। আমরাও সে অনুযায়ী, অনেককেই বলেছি। তোমরা আমাদের দেশে সংযোজনে করে উন্নত বিশ্বে সেগুলো রপ্তানি করলে সেখানে শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি আমরা নিজেরাও পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও ভুটানে রপ্তানির চিন্তাভাবনা করছি। এই ব্যাপারে চলতি বছরই কাজ শুরু করবো বলে আশা করছি।
বর্তমানে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হওয়ায় নতুন গাড়ি বিক্রি অনেকটাই কমে গেছে। তবে সারা বিশ্বে ইঞ্জিনচালিত মোটরসাইকেলের ব্যবহার অর্ধেকে নেমে গেছে। এর পরিবর্তে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে।