জামালপুরে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ায় টানা চার দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর ফলে সঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে না পারায় এই চার দিনে ভর্তি থাকা পাঁচ নবজাতক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া চরম ভোগান্তিতে পড়ে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা অন্য রোগী ও তাদের স্বজনরা। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ও বিশেষায়িত নবজাতক পরিচর্যাকেন্দ্রে (স্ক্যানো) শয্যাসংখ্যা ২৪টি। তবে সব সময়ই ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শিশু ভর্তি থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হয়। হঠাৎ গত শনিবার হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত দুটি ট্রান্সফরমারের মধ্যে একটি পুড়ে বিকল হয়ে যায়। এরপর থেকেই হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দিনে-রাতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও বাকি সময় পুরো হাসপাতাল ছিল বিদ্যুৎহীন।
অন্যদিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডটি ৪তলা ভবনের একেবারে ওপর তলায় হওয়ায় সেখানে গরমের তীব্রতা অনেকটা বেশি। তার ওপর বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ থাকে শিশু ওয়ার্ডের সব বৈদ্যুতিক পাখা ও স্ক্যানো ওয়ার্ডের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত মেশিন।
অভিভাবক ও স্বজনরা হাতপাখা ও চার্জার ফ্যান দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় ও অতিরিক্ত রোগীর চাপে শিশু ওয়ার্ডের পরিস্থিতি খুবই নাজুক হয়ে ওঠে। অনেকেই সেবা না পেয়ে ও অত্যধিক গরম সহ্য করতে না পারায় হাসপাতাল ছেড়ে চলে যায়। বেশ কিছু শিশুকে অন্যত্র রেফার্ড করা হয়।
গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের নিয়ে এক জরুরি সভায় হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. এম এ কাভি সেকান্দর আলম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিশু মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ করলে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামত ও সরবরাহের কাজে গণপূর্ত বিভাগ দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা কোনো ভূমিকা রাখেনি। হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের কার্যালয় থেকে গণপূর্ত বিভাগকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার জন্য চিঠি দিলেও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত শনিবার শিশু ও স্ক্যানো ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ২০৬ জন শিশু, নতুন ভর্তি হয় ৭৬ শিশু। একজন শিশুকে অন্যত্র রেফার্ড করা হলেও ছুটি নেয় ৩৯ জন, স্বেচ্ছায় চলে যায় ৯ জন। ২২ জন শিশুকে নিয়ে তার স্বজনরা কাউকে না বলেই হাতপাতাল ত্যাগ করেন এবং এদিন স্ক্যানো ওয়ার্ডে ১ মেয়ে নবজাতক শিশুর মৃত্যু হয়। পরের দিন গত রবিবার নতুন পুরোনো মিলে শিশু ভর্তি ছিল ২৬৬ জন। ছুটি দেওয়া হয় ৬৮ জনকে, পলাতক দেখানো হয় ৭ শিশুকে, স্বেচ্ছায় চলে যায় ১০ শিশু। সেদিনও স্ক্যানো ওয়ার্ডে ১ ছেলে ও ১ মেয়ে নবজাতকের মৃত্যু হয়। সোমবার ২৪৯ শিশু ভর্তি থাকে। এদের মধ্যে ৪৩ শিশুকে ছুটি দেওয়া হয়, পালতক দেখানো হয় ৯ জনকে ও ৪ শিশুকে নিয়ে তাদের স্বজনরা স্বেচ্ছায় চলে যান। এদিন স্ক্যানো ওয়ার্ডে মারা যায় ১ ছেলে ও ১ মেয়ে নবজাতক। গত মঙ্গলবার ভর্তি শিশুর সংখ্যা ছিল ২৭৩ জন, ছুটি নেয় ৭০ শিশু। সেদিন কোন শিশুর মৃত্যু না হলেও ১ জনকে রেফার্ড করা হয়, ৪ জন স্বেচ্ছায় চলে যায় ও পলাতক দেখানো হয় ৩ শিশুকে।
শিশু ও স্ক্যানো ওয়ার্ডে কর্তব্যরত কয়েকজন নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত শনিবার থেকে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ ছিল না। রোগীদের সেবা দিতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন লেভেল কমে যাওয়ায় শিশুদের কষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে বিশেষায়িত নবজাতক পরিচর্যাকেন্দ্রে (স্ক্যানো) বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় প্রায় সময়ই অন্ধকারে থাকে ওয়ার্ডটি। এতে করে নবজাতক শিশুরা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। এই কয়েক দিনে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে সে সময় ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ ছিল না। ফ্রিজে রাখা বেশ কিছু জরুরি ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে।
মৃত শিশুর বাবা মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের সোলায়মান বলেন, ‘আমার নবজাতক শিশু সন্তানকে ঠাণ্ডার কারণে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু হাসপাতালে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সঠিক সেবা দিতে পারেনি ডাক্তার ও নার্সরা। আমার সন্তানের মৃত্যুর সময় হাসপাতালে বিদ্যুৎ ছিল না।’
এ ব্যাপারে জামালপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিবুল আজাদ বলেন, ‘হাসপাতালের বিদ্যুৎ সরবরাহের ট্রান্সফরমার দেওয়া হয় গণপূর্ত বিভাগ থেকে। তারা ট্রান্সফরমার পরিবর্তন করে দিলে আমরা তারপর বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে পারব। তারপরও আমাদের লোকজন গিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কাজে সহযোগিতা করে।’
গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমাকে এখনো জানানো হয়নি যে হাসপাতালের ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে। আমি হাসপাতালের সহকারী পরিচালককে ফোন করেছিলাম। তিনি বললেন বিদ্যুৎ আছে।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মুহা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু মৃত্যু ঘটনাটি সঠিক নয়। স্ক্যানো ওয়ার্ডে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন দুই-একজন শিশু মারা যায়। তবে বিদ্যুতের জন্য রোগীদের সেবা দিতে খুবই অসুবিধা হয়েছে, এটি সত্য।’