ছাত্র আন্দোলনে নিহত ফয়সালের বৃদ্ধা মা হাজেরা বেগম বলেন, ‘রেজাল্ট দিয়া কী করুমু? আমার সোনার মানিক চানই তো নাই। তোমরা যদি পারো, ফয়সাল কই শুয়ে আছে বলো। আমার সোনার মানিকরে দেখতে যামু। আমার পোলা কত দিন মা কইয়া ডাক দেয় না। আমার বুক ফেটে যাইতেছে। আমার পোলারে চাই, কেউ আমার পোলারে আইন্না দাও, আমি জড়াইয়া ধরি।’
ফয়সালের ভগ্নিপতি আবদুর রহিম বলেন, ‘পরীক্ষায় পাসের খবরে কলিজা ফেটে যাচ্ছে। ফয়সাল আন্দোলনে শহিদ হয়েছে প্রায় তিন মাস আগে। এখন তার পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। সে পাস করেছে। তার বাবা খুব অসুস্থ, কানে কম শোনেন। শুধু মানুষের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। ফয়সাল পাস করেছে শুনে চোখের পানি ফেলছেন, কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না। তার এখনো বিশ্বাস, ফয়সাল বাড়িতে ফিরে আসবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রাণ হারানো ফয়সাল সরকার জিপিএ ৪ দশমিক ৩৫ পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। গত মঙ্গলবার পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর ফয়সালের উত্তীর্ণ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ওই দিন সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফয়সালের ভগ্নিপতি মো.আবদুর রহিম। এইচএসসিতে ফয়সালের উত্তীর্ণ হওয়ার খবরে উচ্ছ্বাসের বদলে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবার, সহপাঠী ও স্বজনদের মধ্যে।
ফয়সাল কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার কাচিসাইর গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকার দক্ষিণখান এস এম মোজাম্মেল হক টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ফয়সাল সংসারের অভাব ঘুচাতে লেখাপড়ার পাশাপাশি শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। বাবা-মা, ভাইসহ পরিবার নিয়ে আবদুল্লাহপুরে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুলাই বিকেলে আবদুল্লাহপুরের শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে যাবেন বলে বাসা থেকে বের হন ফয়সাল। ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে গত ২৮ জুলাই দক্ষিণখান থানায় জিডি করে তার পরিবার। এরপর কেটে যায় ১২ দিন। এই ১২ দিন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি করেও ফয়সালের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে গত ১ আগস্ট বিকেলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে খোঁজ নিলে তারা বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা লাশগুলোর ছবি দেখান। পরে সেখানে ফয়সালের লাশের ছবি দেখতে পান তার স্বজনরা। তবে কোথায় দাফন করা হয়েছে বলতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। শুধু বলেছেন, ১৫-২০টি লাশ একসঙ্গে গণকবর দেওয়া হয়েছে।