শত শত বারকি নৌকা। চলছিল বালু-পাথর আহরণ। সেসব নৌকাকে তাড়া করছিল একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। একেকটি বারকিকে সজোরে ধাক্কা দিচ্ছিল ইঞ্জিন নৌকা। এতে করে কোনোটি উল্টে যাচ্ছিল। আবার কোনোটি ডুবছিল।
সিলেটের জাফলংয়ে পিয়াইন নদে এভাবেই গত রবিবার অবৈধ খনিজ সম্পদ আহরণ এবং পরিবহনের বিরুদ্ধে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অভিযান হয়েছে।
রবিবার (২৭ জুলাই) রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভেরিফাইড ফেসবুকে এ অভিযানের একটি ভিডিও আপ করে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযানকারীরা ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে বালু-পাথরবোঝাই বারকি নৌকাকে তাড়া করতে। এর মধ্যে অভিযানসংশ্লিষ্টদের ইঞ্জিন নৌকা তিনটি বারকি নৌকার ওপর চলে গিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বারকি নৌকা ডুবিয়ে এ রকম অভিযানের বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘নৌকা বিনষ্ট করা’ বলে উল্লেখ করা হয়।
বারকি সিলেট অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী নৌকা। বালু ও পাথরমহালের হাতে বাওয়া নৌকাটির প্রচলন প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। বর্ষা মৌসুমে একটি বারকি নৌকায় অন্তত চারজন শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হয়। সিলেট ও সুনামগঞ্জের সব সীমান্ত নদ-নদী দিয়ে চলাচল করে অন্তত ৫০ হাজার বারকি নৌকা। গত বছর এমন মৌসুমে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে ধলাই নদে এ রকম একটি অভিযানে বারকি নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অমানবিকতায় ঘটনাটি ‘বারকি ডুবাও-কাণ্ড’ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বারকি শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদী নানা কর্মসূচি পালন করেন। এ নিয়ে গত বছরের ১ জুন খবরের কাগজে ‘ইউএনওর বারকি ডুবাও কাণ্ডে তোলপাড়’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রকাশ হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে ১১ জুন তৎকালীন ইউএনও সুনজিত কুমার চন্দকে কোম্পানীগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এক বছর পর এবার কোম্পানীগঞ্জ পাশের উপজেলা গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ের পিয়াইন নদ অববাহিকায় অভিযানে বারকি-ডুবাও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে বারকি ডুবানোর বিষয়টি এড়িয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে খনিজ সম্পদ আহরণ ও পরিবহনের বিরুদ্ধে দুটি সফল মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। এই অভিযানগুলোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পাথর ও বালু জব্দ করা হয়েছে এবং পরিবেশ রক্ষায় সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ২৭ জুলাই, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিমন সরকার সিলেটের জাফলংয়ের বল্লাঘাট থেকে জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং প্রবল বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে এই অভিযান সফলভাবে পরিচালিত হয়।
অভিযানে খনিজ বালু মিশ্রিত পাথরবোঝাই প্রায় ৫০টি নৌকা বিনষ্ট করা হয়েছে এবং পাঁচটি ট্রাকে লোডিং করা বালু জব্দ করা হয়েছে জানিয়ে আরও বলা হয়, জব্দ বালু জাফলং পুলিশ চৌকিতে সংশ্লিষ্ট থানার এসআই এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদারের জিম্মায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, জব্দ এই মালামালগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
যোগাযোগ করলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরকার মো. তোফায়েল আহমদ। তবে বারকি ডুবাও ঘটনার বিষয়টি তার জানা নেই বলে দাবি করেন।