রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মারুফ কারখীকে (৪০) ছুরিকাঘাতে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে শিক্ষার্থী সামিয়া রেজার (১৬) বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। বুধবার (২০ আগস্ট) বিকালে ভুক্তভোগী শিক্ষক মারুফ কারখী বাদী হয়ে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় এই মামলা দায়ের করেন। সন্ধ্যায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটের রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের প্রধান ফটকের সামনে এক কিশোরী হেল্প, হেল্প বলে চিৎকার করছিল। ঠিক এমন সময় সামনে দিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মারুফ কারখী। ওই কিশোরীর চিৎকার শুনে মোটরসাইকেল থামাতেই পেছন থেকে দৌড়ে গিয়ে শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করে ওই কিশোরী। শিক্ষককে ছুরিকাঘাতের সময়ের একটি সিসিটিভির ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ক্যান্টনমেন্ট স্কুল থেকে ভুক্তভোগী ওই শিক্ষক মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছেন। এমন সময় ওই কিশোরী ‘হেল্প হেল্প’ বলে চিৎকার করছে। ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে সামান্য অদূরে ওই শিক্ষক মোটরসাইকেল থামান। এসময় ওই ছাত্রী পেছন থেকে দৌড়ে গিয়ে হঠাৎ শিক্ষক মারুফ কারখীকে আক্রমণ করেন। গলায় ছুরি দিয়ে আঘাত করলে তিনি মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যান। তখন আশেপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের ভেতরে নিয়ে যান।
কী কারণে ওই শিক্ষার্থী এমন আক্রমণ করেছে জানতে চাইলে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল মোছা. তাসনুভা রুবাইয়াত আমিন বলেন, প্রথমত ওই শিক্ষার্থী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের বর্তমান শিক্ষার্থী নয়। দ্বিতীয়ত বারবার একাডেমিক ডিসিপ্লিন ভায়োলেট করায় ২০২৩ সালে তাকে টিসি দেওয়া হয়। তখন থেকেই হয়তো একটি ক্ষোভ পুষে রেখেছিল। যে শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে সে ওই ছাত্রীর সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিল না। এমন ঘটনা ঘটানোর পর ওই শিক্ষার্থীকে স্কুলে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তার আক্রোশ মূলত প্রতিষ্ঠানের ওপর। সে বলেছে, প্রতিষ্ঠানের যাকেই পেত, তাকেই মারতো।
শিক্ষককে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষক বুধবার বোয়ালিয়া থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান ভাইস প্রিন্সিপাল।
প্রদীপ নামে এক ব্যক্তি জানান, ক্যান্টনমেন্টের সামনে আমার অফিস। বাইরে বের হয়ে দেখি, অনেক লোকজন। কী হয়েছে জানতেই শুনি ওই স্কুলের সাবেক এক ছাত্রী এক শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করেছে। পরে শিক্ষককে স্টাফরা ভেতরে নিয়ে যায়। এসময় ওই ছাত্রী স্কুল সম্পর্কে অনেক খারাপ খারাপ কথা বলছিল।
ইউনুস নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, মেয়েটি স্কুলটির পাশেই দাঁড়িয়েছিল। স্যার বের হয়ে যাওয়ার সময় তার চিৎকারে দাঁড়ানো মাত্রই ওই শিক্ষার্থী দৌড়ে এসে চাকু মেরে দিয়েছে। আমি এতটুকু দেখেছি।
এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান বলেন, ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সালে টিসি দেওয়ায় স্কুলের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর ওই শিক্ষার্থীর ক্ষোভ ছিল। শুধু শিক্ষক মারুফ কারখী নন, যে কারও ওপর হামলা হতে পারত। দুর্ভাগ্যক্রমে শিক্ষক মারুফ কারখী হামলার শিকার হয়েছেন। হামলায় ওই শিক্ষকের হাত ও ঘাড় কেটে যায়। স্কুল কর্তৃপক্ষ ওই শিক্ষককে রাজশাহীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যান। সেখানে ওই শিক্ষকের শরীরে তিনটি সেলাই লাগে। পরে ওই শিক্ষককে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর ওই ছাত্রীর অভিভাবককে ফোন করে ডাকা হয়। অভিভাবক আসার পরে মেয়ের এমন কাণ্ডের কথা জানানো হয়। পরে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিনজন স্টাফ তাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসেন। এখন ওই ছাত্রী পরিবারের জিম্মায় আছে।
এনায়েত করিম/মাহফুজ