জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে মেয়রের পদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সর্বশেষ একযোগে বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এগুলো মধ্যে দুটিতে সম্প্রতি প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে। এখানে এখনো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় প্রশাসন ও বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বরিশাল সিটিতে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায় থেকে এখনো ‘গ্রিন সিগন্যাল’ মেলেনি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভাগীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অন্য সিটি করপোরেশন নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু বরিশালের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পর্যায়ে সমঝোতার অভাবে বিষয়টি আটকে আছে। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা এলে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি প্রশাসক হিসেবে এমন একজনকে খুঁজছে, যিনি নগরবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এবং চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মামলাবাজি বা দখলবাজির মতো অভিযোগ থেকে দূরে থাকবেন।’
দলীয় সূত্র জানায়, বরিশাল সিটি করপোরেশন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্রশাসক পদ ঘিরে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রাখছেন। এ পদে আগ্রহী অন্তত ডজনখানেক নেতা।
আলোচনায় যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে আছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়েদুল হক চান, সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম খান রাজন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ, জেলার সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন, মহানগরের আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন, সদস্যসচিব মীর জাহিদুল ইসলাম এবং সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলী হায়দার বাবুল।
বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, প্রশাসক হিসেবে যাকে নেওয়া হবে, তিনি ভবিষ্যতের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন নেতার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তারা জানান, ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ছয় সিটিতে প্রশাসক নিয়োগের পর বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার এসেছে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নাম। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি দলটির জাতীয় পর্যায়ের নেতা। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের মতামত এবং পর্যালোচনা হলো, যদি আলালকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্রশাসক করা হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব কেমন থাকবে? দলের নেতারা সব দিক বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বরিশাল মহানগরের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা মনে করেন, বিএনপির হাত ধরেই বরিশাল সিটি করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাই এখানে দল-মতনির্বিশেষে সাধারণ নগরবাসীর জন্য নিবেদিত, সৎ ও যোগ্য নেতাকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুল আলম ফরিদ বলেন, ‘বরিশাল সিটি করপোরেশনের ছয়টি পরিষদের মধ্যে তিনটিতে মেয়র ছিলেন বিএনপি-সমর্থিত। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসক পদে এমন একজন প্রার্থী প্রয়োজন, যিনি সৎ, গ্রহণযোগ্য ও সাংগঠনিকভাবে অভিজ্ঞ।’
মহানগর বিএনপির সদস্য কামরুল হাসান রতন বলেন, প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে বিএনপি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘নিবেদিত ও জনদরদি ব্যক্তিকেই প্রশাসক করা হোক। জনগণের আস্থা ও সেবা প্রদানের মানদণ্ড বিবেচনায় এমন পদধারীর নিয়োগ দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সমন্বয়ক রফিকুল ইসলাম বলেন, বরিশাল সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ায় প্রশাসক নিয়োগে ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ কৌশল বিবেচনা করা হচ্ছে। রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের প্রশাসনে এ ধরনের সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সেবার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।’