টাঙ্গাইল শহিদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে আয়োজিত বিসিক শিল্পমেলাকে ঘিরে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের আবক্ষ ভাস্কর্যের গলায় দড়ি বেঁধে মেলার প্যান্ডেল টানানোর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় ওঠে।
গত ২৪ এপ্রিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি এই মেলার উদ্বোধন করেন। মেলাটি ৩ মে পর্যন্ত চলে।
তবে মেলার শেষের দিকে ভাস্কর্যের প্রতি এমন অবমাননাকর আচরণের ছবি প্রকাশ পেলে তা বিতর্কের জন্ম দেয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্যের গলায় দড়ি বেঁধে সেই দড়িতে স্টলের বাঁশ বাঁধা হয়েছে। ভাস্কর্যের পাশেই রয়েছে ময়লার স্তূপ, যা পুরো বিষয়টিকে আরও দৃষ্টিকটু করে তুলেছে। অনেকেই এটিকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন।
এ বিষয়ে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর দৌহিত্র আজাদ খান ভাসানী বলেন, ‘টাঙ্গাইল পৌর শহিদ স্মৃতি উদ্যানে বিসিক শিল্পমেলা চললেও পাশেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের আবক্ষ ভাস্কর্য অবহেলায় পড়ে থাকা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। স্বাধীনতার জন্য যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। উন্নয়ন ও আয়োজনের পাশাপাশি শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা না গেলে আমাদের চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
টাঙ্গাইল জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক আল আমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘যাদের রক্তে এই দেশ স্বাধীন হলো, মেলায় ব্যবসার জন্য আজ তাদের গলায় দড়ি? এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। খুব দ্রুত তা বন্ধ করে, ক্ষমা চাইতে হবে।’
বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা মীর নাসিমুল হক তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিসিকের মেলার আয়োজন করা অত্যন্ত দুঃখজন। বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্যের গলায় মেলার স্টলের দড়ি বাঁধা ও পাশেই রয়েছে ময়লার স্তূপ। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, বরং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরদের প্রতি চরম অসম্মান। প্রশাসন, বিসিক কর্তৃপক্ষ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অবিলম্বে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
কবি ও কলামিস্ট এনায়েত করিম বলেন, বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্যের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু অবহেলা নয়, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস ও আত্মত্যাগের প্রতি চরম অসম্মান। তবে যারা এই কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।
এ বিষয়ে বিসিক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক শাহনাজ বেগম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মেলার ৯ দিন পর কারা এই কাজ করেছে জানা নেই। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
স্মৃতিসৌধ ও বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য শুধু স্থাপনা নয়, এগুলো জাতির গৌরব ও আত্মত্যাগের প্রতীক। সেগুলোর এমন অবহেলা ও অসম্মান কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে জানান সচেতনমহল। তারা দ্রুত ভাস্কর্যগুলোর সংরক্ষণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। ভবিষ্যতে যেকোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে জাতীয় স্মৃতিচিহ্নগুলোর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান তারা।
জুয়েল রানা/আমান/