রাজবাড়ীতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সবজি ও ইলিশসহ সাধারণ মাছের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।
সোমবার (২০ জুলাই) রাজবাড়ী শহরের প্রধান কাঁচাবাজার ও মাছ বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি সবজির দামই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
কয়েকদিন আগেও দেখা যায়, ঢেঁড়স ১৫-২০ টাকা কেজি ছিলো এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। এক সপ্তাহ আগে ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজি দরে।
একইভাবে মিষ্টি কুমড়ার দাম ৩০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা কেজি। কচুরমুখী ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা, করলা ৫০ থেকে ৮০ টাকা, কাকরোল ৩০-৪০ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা কেজি হয়েছে। ধুন্দল ২০ থেকে ৫০ টাকা, ঝিঙে ৩০ থেকে ৭০ টাকা, পটল ২৫-৩০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাঝারি আকারের একটি লাউ, যা আগে ৪০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন কিনতে হচ্ছে ৭০ টাকায়। বাজারে তুলনামূলক কম দামের সবজি হিসেবে শুধু পেঁপেই পাওয়া যাচ্ছে, যার দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা।
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী দাম। বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় তিন হাজার টাকা কেজি দরে। আর ৩৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে।
চাষের পাঙ্গাস, রুই, কাতলা, সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন মাছের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে মাছ এখন অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
বাজার করতে আসা রাইহান শেখ বলেন,‘আগে ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে এলে পরিবারের জন্য কয়েক দিনের সবজি ও কিছু মাছ কিনে বাড়ি ফেরা যেত। এখন ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে এলে শুধু কয়েক ধরনের সবজি কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। মাছ কেনার সুযোগই থাকে না। সংসারের খরচ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এভাবে বাজার করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অনেক সময় প্রয়োজনের সবজি না কিনে কম দামের যা পাওয়া যায়, তাই নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
আরেক ক্রেতা রাজ্জাক মণ্ডল বলেন, ইলিশ এখন গরিব মানুষের স্বপ্নের মাছ হয়ে গেছে। এক কেজি দূরের কথা, ছোট ইলিশ কেনারও সামর্থ্য নেই। শুধু ইলিশ নয়, পাঙ্গাস মাছের দামও কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে। আগে সপ্তাহে এক-দুদিন মাছ কিনতাম, এখন সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।
সবজি বিক্রেতা রাজু মণ্ডল বলেন, আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াই না। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজির সরবরাহ অনেক কমে গেছে। আড়ত থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ক্রেতারা বাজারে এসে আমাদের ওপর রাগারাগি করেন, কিন্তু আমাদের কিছুই করার নেই।
আরেক ব্যবসায়ী ইমান আলী বলেন, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অনেক কৃষকের জমিতে পানি জমে গেছে। ফলে সবজি নষ্ট হয়েছে এবং আড়তে পর্যাপ্ত মাল আসছে না। এখন বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। এ কারণেই প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে সাধারণত দেশে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। এ সময় অনেক কৃষক সবজি চাষ কম করেন। আবার যেসব জমিতে সবজি আবাদ করা হয়, অতিবৃষ্টির কারণে সেখানে গাছ মারা যায় বা ফলন নষ্ট হয়। ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়ে যায়। এটি মৌসুমি একটি পরিস্থিতি।
বর্তমানে চাল ও ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে চিনি আতপ চালর দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ষাকালে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সাময়িকভাবে সবজির দাম বাড়লেও যদি বৃষ্টিপাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দাম আরও বাড়তে পারে। আর সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে সীমিত আয়ের মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সুমন বিশ্বাস/খাদিজা রুমি/