চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার গুঠইল গ্রামের রুবিনা খাতুন (২৬) সুঁই-সুতার কাজে তৈরি করছেন নতুন ইতিহাস। একসময় সংসারের টানাপোড়েন সামলাতে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। এখন ওই কাজে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
রুবিনা খাতুন কাপড়ে আঁকছেন ফুলসহ নানা নকশা। তৈরি করছেন পাঞ্জাবি, শাড়ি, ওড়না ও অন্যান্য পোশাক। রাজধানীর অভিজাত বাজার ছাড়িয়ে এখন অনলাইনের মাধ্যমে বিদেশেও বিক্রি হচ্ছে তার তৈরি পোশাক। বিশেষ করে সৌদি আরব ও দুবাইতে পৌঁছেছে তার নকশি করা পাঞ্জাবি।
রুবিনা বলেন, ‘প্রথমে অনেকে আমার কাজকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে ক্রেতারা কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছে। এখন আমি অর্ডার পাচ্ছি। শুধু আমি নই, আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন নারী কাজ করছেন। আমি চাই গ্রামের মেয়েরা সংসারের বাইরে এসে নিজেদের প্রতিভা দিয়ে স্বাবলম্বী হোক।’
রুবিনার তৈরি সুঁই-সুতার পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন হাজার টাকায়। বিশেষ নকশির শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায়। বর্তমানে তার মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। শুধু নিজের আয়ই নয়, রুবিনা তার গ্রামের আরও কয়েকজন নারীকে কাজ শিখিয়ে যুক্ত করেছেন। এতে গুঠইল গ্রামে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একই গ্রামের গৃহিণী রহিমা বেগম বলেন, ‘আগে গ্রামের মেয়েরা শুধু ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন রুবিনা আপার হাত ধরে অনেকেই সুঁই-সুতার কাজ শিখছে। এটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।’
কসবা গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভাবতেই পারিনি গ্রামের কাজ বিদেশে যাবে। এখন দেখি রুবিনার বানানো পাঞ্জাবি ঢাকা থেকে শুরু করে সৌদি আরব, দুবাইয়েও যাচ্ছে। এটা সত্যিই গর্বের বিষয়।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও রুবিনার সাফল্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। নাচোল ৩ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রামীণ নারীরা অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। রুবিনা খাতুন এর প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি শুধু নিজের আয় করছেন না, অন্য নারীদেরও কাজের সুযোগ তৈরি করেছেন। আমরা চাই এ ধরনের উদ্যোগ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আরও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ুক।’
নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামাল উদ্দিন বলেন, ‘হাতে তৈরি সুঁই-সুতার কাজ দেশের ঐতিহ্যের অংশ। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নাচোল উপজেলায় আরও নারী যাতে রুবিনা খাতুনের মতো এগিয়ে আসতে পারে, সে জন্য আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’
নাচোলের বিভিন্ন গ্রামে এখন নারীরা সুঁই-সুতার কাজে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ শখের বশে শুরু করলেও এখন তা আয়ের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঈদ ও পূজার মৌসুমে পাঞ্জাবি ও শাড়ির ব্যাপক চাহিদা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাতে তৈরি সুঁই-সুতার পোশাক শুধু দেশের ঐতিহ্যকে ধরে রাখছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।