কক্সবাজারের সীমান্ত শহর টেকনাফে অবস্থিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরটি খোলা থাকলেও মায়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রায় এক বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর থেকে এই স্থবিরতা বিরাজ করছে, যার প্রভাব পড়েছে সরকারি রাজস্ব আয়, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকায়।
টেকনাফ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, ‘টেকনাফ বন্দর সচল রয়েছে। তবে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বর্তমানে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।’
তিনি জানান, সাধারণত আকিয়াব ও ইয়াঙ্গুন থেকে সরাসরি পণ্য টেকনাফ বন্দরে আসে। কিন্তু মায়ানমারের জলসীমা দিয়ে পণ্যবাহী ট্রলার চলাচলের সময় আরাকান আর্মির বাধার কারণে এ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি আশা করেন সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পুনরায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।
টেকনাফ স্থলবন্দর কাস্টমস কর্মকর্তা মাহামুদুল রহমান জানিয়েছেন, বন্দর বন্ধ নেই। বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিদিন নিয়মিতভাবে অফিস করছেন। তবে বর্তমানে মায়ানমার থেকে কোনো আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলছে না। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি জানান, সর্বশেষ গত বছরের এপ্রিল মাসে এ বন্দর দিয়ে আমদানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। মায়ানমারের মংডু শহর দখলের পর থেকে নাফনদী দিয়ে পণ্য আসা-যাওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এ বন্দর দিয়ে সরকার অতীতে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে। তাই টেকনাফ স্থলবন্দর বাংলাদেশ ও মায়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে রপ্তানি আয় যেমন কমে গেছে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নাফনদীর নাব্য পুনরুদ্ধার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে এই বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে আবারও গতি ফিরতে পারে।
টেকনাফ স্থলবন্দরের ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্টের মহাব্যবস্থাপক জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বন্দর খোলা রয়েছে এবং প্রতিদিন অফিস কার্যক্রম চলছে। তবে মায়ানমারের সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের কারণে বর্তমানে মায়ানমার থেকে পণ্যসামগ্রী আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল মায়ানমার থেকে একটি কাঠবোঝাই ট্রলার টেকনাফ স্থলবন্দরে পৌঁছায়। এরপর থেকে আর কোনো পণ্য আমদানি হয়নি। বর্তমানে বন্দরের ওয়্যারহাউসে রপ্তানির জন্য জমা রয়েছে সিমেন্ট ২২ হাজার ২৬০ বস্তা, আলু ২ হাজার ৭০০ বস্তা, সফট ড্রিংক ১৯০ বস্তা, চানাচুর ৩ বস্তা এবং চিপস ১২ বস্তা।
২০২৫ সালের প্রথম তিন মাস ১০ দিনে এই বন্দর দিয়ে মায়ানমারে মোট ৭ হাজার ১৮৫ টন পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল সিমেন্ট, আলু, পানীয়, বিস্কুট, পানি, স্যান্ডেল, অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক, গেঞ্জি, মুড়িসহ বিভিন্ন সামগ্রী।
ব্যবসায়ী জানান, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে শাহপরীরদ্বীপ সংলগ্ন নাফনদীর কিছু অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় জাহাজ চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ইয়াঙ্গুন থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে মায়ানমার সীমান্ত ঘেঁষে চলাচল করতে হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বন্দর অচল থাকায় সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে পণ্য পাচারও বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সার, জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের অবৈধ প্রবাহ উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
বন্দরের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি জাহাজ বন্দরে ভিড়ত এবং ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাক পণ্য পরিবহন হতো। বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি বন্ধ। এতে ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ওমর ফারুক বলেন, ‘২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বন্দরটির আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কিছুদিন এই কার্যক্রম চালু ছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় বর্তমানে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে অনেক আমদানিকারকের লাখ লাখ ডলারের পণ্য মায়ানমারে আটকে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলে আবারও আমদানি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। ইতোমধ্যে রপ্তানির জন্য সরকারকে রাজস্ব দেওয়ার পরও আলুসহ বিভিন্ন পণ্য বন্দরে আটকে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু না হলে চোরাচালান বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।’
কাস্টমস সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর থেকে কোনো আমদানি না হওয়ায় সরকার প্রতি মাসে শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এক বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। রাজস্ব বিভাগের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে ৬৪০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪০৪ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো রাজস্ব আদায় হয়নি।
টেকনাফ স্থলবন্দরের বর্তমান চিত্র এক সময়ের ব্যস্ততার সঙ্গে একেবারেই মিলে না এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের আগ পর্যন্ত যে বন্দরটি ছিল আমদানি পণ্যের ভিড়ে ঠাসা, শ্রমিকদের কোলাহলে মুখর এবং সারি সারি যানবাহনের দীর্ঘ লাইনে পরিপূর্ণ আজ সেই একই বন্দর পড়ে আছে প্রায় জনশূন্য অবস্থায়। এক সময় বন্দরের জেটি এলাকাজুড়ে ছিল পণ্য ওঠানামার ব্যস্ততা। দিনভর শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য, ব্যবসায়ীদের দৌড়ঝাঁপ এবং সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীদের তৎপরতায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। জেটিতে নেই কোনো ভিড়, নেই পণ্যবাহী ট্রলারের আনাগোনা, এমনকি গাড়ির দীর্ঘ লাইনও এখন অতীত স্মৃতি।
মায়ানমার থেকে পণ্যবাহী ট্রলার আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্দর কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। মাঝেমধ্যে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্য নিয়ে দু-একটি ট্রলার গেলেও তা এই স্থবিরতা কাটাতে পারছে না। ফলে বন্দরনির্ভর অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শ্রমিকরা। হাজার হাজার শ্রমিক আজ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দিনের পর দিন অলস বসে থাকতে হচ্ছে তাদের, যার ফলে জীবিকা নির্বাহ করা হয়ে উঠছে কঠিন। একইভাবে ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীরাও পড়েছেন চরম সংকটে। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে বিরাজ করছে গভীর অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এক সময় যে বন্দরটি ছিল জীবিকার প্রধান কেন্দ্র, আজ সেটিই যেন পরিণত হয়েছে ভূতের ঘরে। চারদিকে নীরবতা, কর্মচাঞ্চল্যের কোনো চিহ্ন নেই নিস্তব্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে পুরো বন্দর এলাকা। টেকনাফ স্থলবন্দরের এই স্থবিরতা শুধু একটি বন্দর নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত হাজারও মানুষের জীবনে নেমে এসেছে গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার ছায়া।
বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ মায়ানমার সমুদ্রসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানব পাচারসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বিশেষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম। তিনি বলেন, ‘এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শিগগিরই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভা শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।’
এদিকে, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। পরে ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর ২৭ একর জমির ওপর টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর মায়ানমারের মংডু শহরসহ ২৭০ কিলোমিটার এলাকা দখল করার পর আরাকান আর্মি নাফনদী মোহনায় সীমান্ত অতিক্রম করে বন্দরে আসা পণ্যবাহী ট্রলার আটকে রাখে। পরে ব্যবসায়ীরা পুনরায় যোগাযোগ করে জাহাজগুলো বন্দরে ফিরিয়ে আনেন।