‘তুমি ঢেউ, আমি পাহাড়, তুমি আসো, আমি দাঁড়িয়ে থাকি, তুমি ফিরে যাও, আমি ভিজে থাকি, তবু ভালোবাসি তোমার ছোঁয়া মেঘের মতো, বৃষ্টির মতো, মল্লার রাগের মতো।
আকাশের চোখে ছিল পাহাড়ের নীল ছায়া। তার কল্পনার ডানায় ছিল মেঘ, ঝরনা, রোদের ছায়া। সে পাহাড় ভালোবাসে, কারণ পাহাড় নীরব, ধৈর্যশীল, গভীর। আর বৃষ্টি? সে সমুদ্রের মেয়ে। ঢেউয়ের মতো তার হাসি, জোয়ার-ভাটার মতোই তার মেজাজ। বৃষ্টি বলত- ‘সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই আমি, আকাশ। তুমি কি পারবে আমায় ধরে রাখতে?’ আকাশ হেসে বলত- ‘আমি তো আকাশই, বৃষ্টি। তোমার ঢেউ আমার বুকেই তো খেলে যায়।’
তাদের পরিচয় হয়েছিল এক সাহিত্যসভায়। আকাশ কবিতা পড়ে, বৃষ্টি গল্প লেখে। দুজনেই প্রকৃতির প্রেমিক। আকাশের কবিতায় পাহাড়, ঝরনা, মেঘ; বৃষ্টির গল্পে সমুদ্র, জাহাজ, বালুকাবেলা। প্রথম দেখাতেই তারা বুঝেছিল- তাদের মধ্যে কিছু একটা আছে, যা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। যেন মল্লার রাগের মতো- বিষণ্ণ, অথচ মুগ্ধকর। আকাশ চেয়েছিল মিরিক যাবে। ভোরের আলোয় ঝকমক করা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবে কফি মগ হাতে নিয়ে।
বৃষ্টি আবার বহুদিন ধরেই যেতে চেয়েছিল কক্সবাজার। সে বলত- ‘জানো আকাশ, আমি স্বপ্ন দেখি- সমুদ্রের ধারে বসে আমি লিখছি, আর তুমি পাহাড়ের ছবি আঁকছো। ঢেউয়ের শব্দে আমাদের কথা হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অনুভব থেকে যাচ্ছে।’ আকাশ বলত- ‘তা বেশ তো। তুমি সমুদ্রের কথা বলো, আমি পাহাড়ের। চল, একদিন কক্সবাজার যাই। তুমি সমুদ্র দেখো, আমি তোমার চোখে পাহাড় খুঁজি।’ অবশেষে সেই দিন এল। বাংলাদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো। পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট- সব ঠিক। তারা ভেবেছিল, এই সফর হবে তাদের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়।
কক্সবাজার পৌঁছেই বৃষ্টি যেন বদলে গেল। সে যেন আরও উচ্ছ্বসিত, আরও উদাসীন। সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে সে বলল- ‘আকাশ, আমি যেন আমার জন্মভূমিতে ফিরে এসেছি। এই ঢেউ, এই বালু, এই গন্ধ- সব আমার চেনা।’ আকাশ অবাক হয়েছিল। সেও তো ভেবেছিল, তারা একসঙ্গে সময় কাটাবে, গল্প করবে, কবিতা লিখবে। কিন্তু বৃষ্টি যেন সমুদ্রেই ডুবে গেল। সে একা একা হাঁটে, ছবি তোলে, কখনো স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে। আকাশ বিশ্বাস করতে পারছে না কেউ এরকমভাবে বদলে যেতে পারে দুটো দিনের মধ্যে। জিজ্ঞেস করল- ‘তুমি কি ঠিক আছো, বৃষ্টি?’ বৃষ্টির একটুও অস্বাভাবিক লাগছে না এই পুরো বদলে যাওয়া। সে হেসে বলল- ‘আমি ঠিকই আছি। আমি যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছি এখানে। তুমি বুঝবে না।’ আকাশ যতরকম সম্ভব চেষ্টা করা যায় তাই করেছে এ কদিন। যদি বৃষ্টি ফিরে আসে কলকতায়। এবার মিরিক। সমুদ্র ভয় পাচ্ছে আকাশ।
এক সন্ধ্যায়, সমুদ্রের ধারে বসে আকাশ তার কবিতার খাতা খুলে বৃষ্টিকে পড়তে দিল। কবিতার নাম ছিল ‘মল্লার রাগ’। বৃষ্টি কবিতাটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার পর বলল- ‘তুমি জানো, আকাশ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি নিজেকে আরও ভালোবাসি। আমি সমুদ্রের মেয়ে। পাহাড়ের ছায়ায় আমি থাকতে পারি না।’ আকাশের বুকটা হিম হয়ে গেল। সে বলল- ‘তুমি কি বলতে চাও, তুমি ফিরে যাবে না?’ বৃষ্টি মাথা নেড়ে বলল- ‘আমি এখানে থেকে যেতে চাই কিছুদিন। হয়তো আরও বেশি। তুমিও চাইলে থাকতে পার, ফিরেও যেতে পার।’ অবশেষে আকাশ ফিরে যাবে ঠিক হলো। অফিস আর বেশি ছুটি দেবে না। বৃষ্টি ভিসার মেয়াদ বাড়াবার আবেদন করল। আকাশ জমা দিয়ে এল। হয়তো পরে মত বদলাবে বৃষ্টি। এরকম কি হয়? বৃষ্টি মনে করাল সমারসেট মমের গল্প ‘দ্য লোটাস ইটার’ বা পদ্মভোজী সেই ওডেসির লোটাস ল্যান্ডের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ। মম-এর গল্পের উইলসন কেপরির ফ্য। রাগলিওনির চাঁদনী রাত দেখে আর লন্ডনে ফিরে যায়নি। বৃষ্টি পড়েছে সমুদ্রপ্রেমে।
কী আর করা। আকাশও যে কবি। কবি মনের আবেগ কবিই তো বুঝবে। একা ফিরে এল আকাশ। বিমানে বসে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। মেঘের ফাঁকে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের রেখা। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু সেই স্বপ্নে ছিল- বৃষ্টির হাসি, সমুদ্রের ঢেউ, আর একটুকরো কষ্ট। কলকাতায় ফিরে এসে আকাশ তার কবিতার খাতা খুলল। সেখানে সে লিখল- ‘তুমি ছিলে মেঘ, আমি ছিলাম পাহাড় তুমি এলেও, আমি জানতাম, তুমি থামবে না তবু আমি অপেক্ষা করেছিলাম মল্লার রাগের মতো, বিষণ্ণ অথচ মুগ্ধ।’
বৃষ্টি মাঝে মাঝে মেসেজ করে- ‘আজ সমুদ্র খুব রাগ করেছে’, ‘আজ ঢেউ আমাকে ছুঁয়ে গেল’- এসব। আকাশ উত্তর দিত না। সে জানত, কিছু সম্পর্ক শব্দে বাঁধা যায় না। কিছু ভালোবাসা হয় শুধু অনুভবে, ঠিক যেমন মল্লার রাগ- যার সুরে আছে প্রেম, বেদনা, আর একটুকরো চিরন্তন অপেক্ষা। কলকাতার আকাশ তখন ধূসর, কিন্তু শহর জেগে উঠেছে। মহালয়ার ভোর।
রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘যা চণ্ডী’ ভেসে আসছে। গলির মোড়ে ফুলের দোকানে গাঁদা আর শিউলি সাজানো, পুজোর গন্ধ বাতাসে। আকাশের ঘুম তখনো পুরো ভাঙেনি। কফির কাপটা হাতে নিয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎই দরজার বেল বাজল। আকাশের মনে হলো, এত সকালে কে এল? সে ধীরে দরজা খুলল। আর তখনই চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখটা দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন থমকে গেল।
-‘বৃষ্টি?’ বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে, একটুও বদলায়নি। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। হাতে একটা ছোট ব্যাগ, পরনে সাদা সালোয়ার, চোখে সেই পুরোনো চাহনি- যেটা আকাশ ভুলতে চেয়েও পারেনি।
-‘তুমি... তুমি এখানে?’
-‘হ্যাঁ, আমি ফিরে এসেছি।’ আকাশ কিছুক্ষণ চুপ। যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। বৃষ্টি নিজেই বলল, ‘সমুদ্র আমাকে রাখেনি। আমি কদিন ছিলাম কক্সবাজারে। ভেবেছিলাম, সব ভুলে নতুন করে শুরু করব। কিন্তু মনটা বারবার তোমার কাছে ফিরে যাচ্ছিল।’ আকাশের চোখে জল। সে জানে, বৃষ্টি চলে যাওয়ার পর তার জীবনটা কেমন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিল। তারা একসঙ্গে ছিল, কিন্তু সময়ের ভুল বোঝাবুঝিতে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। বৃষ্টি চলে গিয়েছিল, আকাশ তাকে আটকায়নি। হয়তো সাহস ছিল না, হয়তো অভিমান।
-‘তুমি হঠাৎ ফিরে এলে কেন?’
-‘মহালয়ার ভোরে মনে হলো, নতুন শুরু করার সময় এসেছে। আর নতুন শুরু তো তোমার সঙ্গে ছাড়া সম্ভব নয়।’ আকাশ কিছু বলল না। শুধু দরজাটা পুরো খুলে দিল। বৃষ্টি ধীরে ঘরে ঢুকল। ঘরটা যেন আবার প্রাণ পেল। সেই চেনা গন্ধ, সেই চেনা ছায়া। তারা দুজন বসে পড়ল সোফায়। বাইরে মহালয়ার গান চলছে, ‘জয় জয় শঙ্কর, জয় জয় শম্ভু...’। বৃষ্টি বলল, ‘তুমি জানো, আমি সমুদ্র ভালোবাসি। কিন্তু এবার সমুদ্র আমাকে ফিরিয়ে দিল। যেন বলল, তোমার জায়গা এখানে নয়।’ আকাশ হেসে বলল, ‘তুমি জানো, আমি আকাশ ভালোবাসি। কিন্তু আকাশ তো তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিল।’ বৃষ্টি বলল, ‘তুমি কি জানো, আমি কক্সবাজারে বসে প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখতাম আর ভাবতাম, তুমি কি এখনো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকো?’ আকাশ বলল, ‘আমি প্রতিদিন জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকি, ভাবি, তুমি কি এখনো সমুদ্রের ঢেউ গোনো?’ তাদের কথায় যেন সময় থেমে যায়।
পুরোনো স্মৃতি, পুরোনো অভিমান, সব যেন একে একে গলে যায়। বৃষ্টি বলল, ‘আমি ফিরে এসেছি, কারণ আমি বুঝেছি, ভালোবাসা পালিয়ে যাওয়ার নয়। ভালোবাসা ফিরে আসার।’ আকাশ বলল, ‘তুমি ফিরে এসেছো, এটাই আমার মহালয়ার আশীর্বাদ।’ বৃষ্টি হেসে বলল, ‘তুমি কি জানো, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে দেখে অবাক হবে। কিন্তু তুমি তো শুধু দরজা খুললে।’ আকাশ বলল, ‘আমি অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম- তুমি আবার চলে যাবে কি না।’ বৃষ্টি বলল, ‘না, এবার আমি কোথাও যাব না। এবার আমি থাকব।’ আকাশ ধীরে বৃষ্টির হাত ধরল। সেই স্পর্শে যেন সব অভিমান, সব দূরত্ব মুছে যায়।
বাইরে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ঢাকের শব্দ, ফুলের গন্ধ, আর ভোরের আলো- সব মিলিয়ে এক নতুন শুরু। তারা দুজন জানালার ধারে দাঁড়িয়ে। আকাশ বলল, ‘তুমি জানো, কলকাতা আজ অন্যরকম লাগছে।’ বৃষ্টি বলল, ‘হ্যাঁ, কারণ আমি ফিরে এসেছি।’ আকাশ বলল, ‘তুমি কি জানো, এভাবেও ফিরে আসা যায়?’ বৃষ্টি বলল, ‘হ্যাঁ, যদি মন চায়, যদি ভালোবাসা ডাকে- তাহলে এভাবেও ফিরে আসা যায়।’ এই গল্পের শেষটা যেন এক নতুন সূর্যোদয়। মহালয়ার ভোরে ফিরে আসা মানে শুধু শরতের আগমন নয়, মানে হৃদয়ের পুনর্জন্ম। বৃস্টি আর আকাশ- তাদের গল্পটা হয়তো অনেকের মতো, কিন্তু এই ফিরে আসা, এই চমক, এই ভালোবাসা- এটাই তো জীবনের আসল উৎস।
লেখক পরিচিতি: এপিজে আব্দুল কালাম পুরস্কার জয়ী লেখক ড. রতন ভট্টাচাৰ্য ভাৰ্জিনীয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ৰাক্তন অধিভুক্ত অধ্যাপক ও বহুভাষী কবি।