আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী (১৯৩৪-১৯২২) বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী; গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও নাটক রচয়িতা হিসেবে তার যেমন খ্যাতি, তেমনি খ্যাতি কিংবদন্তি সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবেও। তবে এসব ছাপিয়ে তার ‘একুশের গানের রচয়িতা’ পরিচয়টি বড় হয়ে উঠেছে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’- এ গানটি তাকে অমরত্ব দান করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি এলে গানটির সুরের আগুন ছড়িয়ে পড়ে বাংলা ভাষাভাষী সব মানুষের প্রাণে। দেশ থেকে দেশান্তরে কোটি মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এর সুর। গানটি রচনার প্রেরণা আবদুল গাফ্ফার চেধুরীর মনে হঠাৎ করে আসেনি। শৈশব থেকে তিলে তিলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তার মধ্যে যে প্রতিবাদী সত্তা ও মা-মাটি-মানুষের প্রতি ভালোবাসার চিরন্তন বোধ জাগ্রত হয়, তার সারনির্যাস থেকেই এমন একটি গান রচনা করতে পেরেছিলেন।
বরিশালের উলানিয়ার জমিদার-পরিবারের সন্তান আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী অল্প বয়সে বাবাকে হারান। এজন্য তাকে জীবন-সংগ্রামে নামতে হয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছুটতে হয় কর্মের সন্ধানে। স্কুলে অধ্যয়নকালেই সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে হাত পাকান। পারিবারিক ঐতিহ্য, উলানিয়া গ্রামের পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা তার শিশুমনে উদারতা ও মানবিকতার বীজ বপন করে। শৈশবের শিক্ষকদের কাছে লাভ করেন দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা। বিশেষভাবে বলতে হয় তার মাদ্রাসা শিক্ষক ও উলানিয়া গ্রামের মসজিদের ইমাম মৌলবি আহমদ আলীর কথা। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর শিশুমনে তিনি কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, সে সম্পর্কে পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন- ‘সেই শৈশবের সোনালি ঊষার উত্তাপমাখা ছ’টি বছরে মৌলবি আহমদ স্বদেশ ও ধর্ম সম্পর্কে আমার মনে যে চেতনা সৃষ্টি করেছিলেন, সম্ভবত সেই চেতনাই সারা জীবন আমাকে প্রভাবিত করেছে।... মৌলবি আহমদের কাছেই শিখেছি, আমরা বাঙালি এবং বাংলাদেশকে ভালোবাসা আমাদের ইমানের অঙ্গ।’ মৌলবি আহমদের কাছে পেয়েছিলেন মানবতা এবং দেশপ্রেমের শিক্ষা; বাবা দিয়েছিলেন অহিংসা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং স্বদেশিকতার দীক্ষা। ফলে তার রাজনীতি ও সংগ্রামী চেতনার উন্মেষ সেই শৈশবেই ঘটে। তার বাবা ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন বরিশাল জেলা কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির সভাপতি। অসহযোগ আন্দোলনের যোগ দিয়ে কারাভোগ করেন। বাবার দেখানো পথই তাকে রাজপথে বজ্রমুষ্টি তুলে স্লোগান দেওয়ার প্রেরণা জোগায়। বাবার প্রভাবে প্রথমে কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হলেও, বরিশাল শহরে আসমত আলী খান ইনস্টিটিউটে পড়তে এসে সম্পৃক্ত হন ছাত্র ফেডারেশন ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ড। এ স্কুলে অধ্যয়নকালে ১৯৪৮ সালে বরিশাল শহরে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। এ সময় গ্রেপ্তার হন এবং কারাভোগ করেন। স্কুলের পাঠ শেষ হলে ঢাকায় চলে আসেন, ভর্তি হন ঢাকা কলেজে।
অল্প বয়সেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ঘটে। পিতৃবন্ধু দুর্গামোহন সেনের সান্নিধ্য তার সাংবাদিকতায় প্রবেশের পথ সুগম করে। তার সম্পাদিত ‘বরিশাল হিতৈষী’ পত্রিকায় কিশোর আবদুল গাফফার চৌধুরী নিয়মিত লিখতেন। এর পর ‘সওগাত’, ‘সোনার বাংলা’, ‘মোহাম্মদী’, ‘মাহে-নও’, ‘দিলরুবা’ প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি মাসিক পত্রিকা, সাহিত্য সাময়িকী, দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্যিক সত্তার উন্মেষও অল্প বয়সেই ঘটে। যে শহরে তিনি বেড়ে ওঠেন, সেই বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে অধ্যাপনা করতেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তখন বরিশালের পটুয়াখালী মহকুমার প্রশাসক মুন্সেফ ছিলেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন সুসাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়। কাজী নজরুল ইসলামের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ গ্রন্থ পাঠ করে জেনেছিলেন ‘বরিশাল বাংলার ভেনিস’। এই শহরে বারবার এসেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন কবীর প্রমুখ লেখক। তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাহিত্যিক সত্তাকে উজ্জীবিত করে। গ্রামের মাদ্রাসায় পড়ার সময় ১৯৪৫ সালে ‘নবযুগ’ পত্রিকার শিশুদের পাতা ‘আগুনের ফুলকি’তে তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। এর পর আর থামতে হয়নি তাকে। সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং সাংবাদিকতায় তার প্রতিভার বিকাশ ঘটে এবং লেখনীর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। দেশ-বিদেশে খ্যাতি লাভ করেন স্বনামে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো- ‘কৃষ্ণপক্ষ’ (১৯৫৯), ‘সম্রাটের ছবি’ (১৯৫৯), ‘সুন্দর হে সুন্দর’ (১৯৬০), ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’ (১৯৬০), ‘নাম না জানা ভোর’ (১৯৬২), ‘নীল যমুনা’ (১৯৬৪), ‘শেষ রজনীর চাঁদ’ (১৯৬৭), ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’ (১৯৯৪), ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ প্রভৃতি। সাহিত্য-সাধনা, সাংবাদিকতা, দেশ ও মানুষের কল্যাণে জীবনোৎসর্গ করার স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০০৯) প্রভৃতি।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের অগ্রসেনানীদের একজন। ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধেও অবদান রাখেন। তিনি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশে যোগ দেন এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পিকেটিং করেন। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ রফিকউদ্দিন আহমদের রক্তাক্ত দেহ দেখে তার মনে যে ভাবান্তর ঘটে, তা রূপ পায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানে। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে একুশের শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় তিনি যোগ দেন। এর পর সর্বস্তরের ক্ষুব্ধ ও শোকার্ত জনতা ঢাকা শহরে যে শোভাযাত্রা বের করে, তাতেও তিনি শামিল হন। এদিনও পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী পুলিশি হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। আহত অবস্থায়ই রচনা করেন একুশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি। গানটিতে প্রথমে আবদুল লতিফ সুরারোপ করলেও, পরে আলতাফ মাহমুদের সুরের মোহনীয়তায় তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৫৩ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা কলেজের স্মরণিকায় মুদ্রিত হয়। একই বছর কলেজটির ছাত্র-সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠানে এটি প্রথম গাওয়া হয়। ১৯৫৪ সাল থেকে এটি লাভ করে প্রভাতফেরির গানের মর্যাদা। গানটির ভাবোদ্দীপনা ও সুরের মূর্ছনা সবার মন ছুঁয়ে যায়। এর পর প্রভাতফেরির সংগীত হিসেবে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয় বাঙালির মনে। একুশের চেতনা বিস্তার ও প্রসারে এ গান ব্যাপক অবদান রাখে। জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রে স্থান পাওয়ার পর এ গান জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসির জরিপে গানটি বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থান লাভ করে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী হয়ে ওঠেন জীবন্ত কিংবদন্তি। বর্তমানে হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশসহ ১৫টি ভাষায় এ গান গাওয়া হয়। এটি কেবল একুশের গান নয়, বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ এবং স্বতন্ত্র অস্তিত্বের স্মারক হিসেবেও লাভ করেছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। একটি গানের জন্য একজন গীতিকারের জীবদ্দশায় এত সম্মান ও খ্যাতি খুব কম মানুষের ভাগ্যেই জুটেছে। এই গানটিই আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে অমর করে রেখেছে।
লেখক: অধ্যাপক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়