নিষিদ্ধ প্রেম এবং তাইওয়ানিজ খাবারের গল্প নিয়ে লেখা উপন্যাস আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার জয় করেছে। ম্যান্ডারিন বা চীনা ভাষা থেকে অনূদিত প্রথম কোনো উপন্যাস এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করল।
তাইওয়ানের লেখিকা ইয়াং শুয়াং-জির লেখা এবং তাইওয়ান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত লিন কিং অনূদিত ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ উপন্যাসটি ১৯৩০-এর দশকে জাপানি শাসনামলের দুই নারীর তাইওয়ানজুড়ে রন্ধনশিল্পভিত্তিক ভ্রমণের গল্প এটি। ভ্রামণিক স্মৃতিকথা হিসেবে কাল্পনিক পাদটীকাসহ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণিত বইটি ২০২০ সালে যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন অনেক পাঠকই ঐতিহাসিক গ্রন্থ মনে করে এটি পড়েছিলেন। বুকারের প্রধান বিচারক নাতাশা ব্রাউন উপন্যাসটিকে একটি মনোমুগ্ধকর ও সূক্ষ্মভাবে সাজানো অত্যন্ত চমৎকার উপন্যাস বলে আখ্যায়িত করেছেন।
‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ মূলত আওইয়ামা চিজুকো নামের কাল্পনিক জাপানি লেখিকাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যিনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাইওয়ান সফরে গিয়ে ও চিজুরু নামের এক তাইওয়ানি নারী অনুবাদকের প্রেমে পড়েন। এই দুই চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসটি প্রেম, সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো খুঁজেছে।
পুরস্কার ঘোষণার আগে ইয়াং বুকার প্রাইজ কমিটিকে বলেছিলেন, উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু ভ্রমণ এবং খাবার নিয়ে গবেষণা করা আমার জীবনকে দুটি দিক থেকে বদলে দিয়েছে। ভ্রমণের কারণে আমার সঞ্চয় কমে গেছে আর খেতে হয়েছে বলে ওজন গেছে বেড়ে। বুকার পাওয়ার আগে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ বেশ কয়েকটি সম্মাননা অর্জন করে।
৪১ বছর বয়সী ইয়াং প্রবন্ধ, মাঙ্গা (জাপানি কমিকস) এবং ভিডিও গেমের স্ক্রিপ্ট লিখে থাকেন। এই উপন্যাসের মূল ম্যান্ডারিন সংস্করণটি ২০২১ সালে তাইওয়ানের সর্বোচ্চ সাহিত্যিক সম্মাননা ‘গোল্ডেন ট্রাইপড অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছিল। অন্যদিকে লিন কিংয়ের ইংরেজি অনুবাদের সংস্করণটি ২০২৪ সালে ‘ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার’ জয় করে।
বুকার পুরস্কার পাওয়ার আগে কিং বলেছিলেন, জাপানি শাসনামলে তাইওয়ানের মানুষের দুঃখ ও আনন্দের মধ্যে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ যে ভারসাম্য বজায় রেখেছে তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তিনি তখন বলেন, ‘সময় যতই কঠিন হোক না কেন, আমি বিশ্বাস করি মানুষ সব সময় কিছুটা আনন্দের আলো এবং ভালোবাসার গভীর উৎস খুঁজে নিতে পারে।’ তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘কৌতুক, ভালো খাবার, সিনেমা, স্কুল, ছোটখাটো ঝগড়া এবং রোমাঞ্চ জীবনের অংশ। এসবের বিপরীতে কিছু ভাবা মানে সংস্কৃতিকে কেবল তার ক্ষত বা ট্রমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা।’
আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজকরা এক বিবৃতিতে ‘অনুবাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের’ কথা উল্লেখ করে পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড (৬৭ হাজার ডলার) সমপরিমাণ অর্থ লেখক এবং অনুবাদকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়ার কথা জানান।
সাক্ষাৎকার
‘আমি আমার নিজের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হতে রাজি নই’
১৯৩০-এর দশকে জাপানের দখলে থাকা তাইওয়ানের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসের রাজনৈতিক পটভূমি সম্পর্কে অকপটে কথা বলেন, ‘কিছু মানুষ মনে করেন শিল্প ও সাহিত্যকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্য যে মাটিতে জন্মায়, তা থেকে তাকে কখনো আলাদা করা যায় না।’
তিনি মনে করেন, ‘তাইওয়ানের মানুষ একটি পরিচয় সংকটে ভুগছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের চীনা মনে করে, আবার কেউ কেউ মনে করে আমরা তাইওয়ানি। তাইওয়ানের মানুষ হিসেবে আমাদের এখন নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে হবে–আমরা কি আবার ঔপনিবেশিক শাসনে ফিরে যাব না স্বাধীন থাকব? নিজেদের মাটিতে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকার পক্ষে আমি নই।’
এই উদ্বেগগুলোই আসলে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’-এর মূল ভিত্তি। উপন্যাসটি আওইয়ামা নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে রচিত, যিনি একজন ‘অত্যন্ত ভোজনরসিক’ জাপানি ঔপন্যাসিক এবং সরকারি অর্থায়নে রন্ধন সম্পর্কিত সফরে তাইওয়ানে ঘুরছেন। এ সময় তার তাইওয়ানি দোভাষী চিজুরুর প্রতি তিনি গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন। বইটির প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে তাইওয়ানি সুস্বাদু খাবারের নামে–যেমন কষানো কিমা করা শূকরের মাংস, কাঁচা মাছের টুকরো, তরমুজের চা। এসব খাবার ও পানীয়র স্বাদ উপন্যাস পাঠের অদ্ভুত অনুভূতি দেয়।
উপন্যাসটির পটভূমি ১৯৩০ দশকের, তবু তাইওয়ানের জাতীয় পরিচয় এবং উপনিবেশবাদ নিয়ে করা প্রশ্নগুলোর কারণে এটি পুরোপুরি একটা আধুনিক উপন্যাস। তাইওয়ান এখনো বিশ্বের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর একটি। দেশটিতে আছে স্বশাসিত গণতন্ত্র, যদিও তাইওয়ানকে বেইজিং চীনের অংশ বলে দাবি করে এবং দেশটির ওপর সামরিক আগ্রাসনের হুমকি রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে চীন সফরের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
এটিই ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়া ইয়াংয়ের প্রথম উপন্যাস, তবে তা ইতোমধ্যে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। ২০২০ সালে প্রকাশের পর তাইওয়ানে দারুণ সাড়া জাগায়। এরপর ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনূদিত সাহিত্যের জন্য ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পায় এবং এখন আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার অর্জন করল, যাকে ইয়াং একটি ‘অবাস্তব বা স্বপ্নের মতো’ অর্জিত সম্মান বলে বর্ণনা করেছেন।
প্রথম প্রকাশের পর অনেকে এটিকে জাপানি ঔপনিবেশিক আমলে আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক বই বলে মনে করেছিলেন। ইংরেজি সংস্করণে বইটির অনুবাদকের কাল্পনিক নোট এবং সম্পাদকীয় হস্তক্ষেপ এমন আবহ তৈরি করেছে, যাকে আন্তর্জাতিক বুকার বিচারক প্যানেলের প্রধান নাতাশা ব্রাউন ‘কৌতূহলোদ্দীপক মেটাফিকশনাল লেয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অনুবাদক কিং এ প্রসঙ্গে হেসে বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি এটি বেশ কঠিন একটি বই। কিন্তু মানুষ যেখানে বই পড়ায় একনাগাড়ে দুই মিনিটের বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন না, সেখানে পাঠকদের এই বইয়ের পেছনে শ্রম দিতে দেখাটা সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক।’
উপন্যাসটির কাঠামোগত এই জটিলতা এর আবেগীয় কেন্দ্রের সঙ্গেও মিলে যায়। আওইয়ামা এবং চিজুরুর সম্পর্কটি গড়ে উঠেছে অনুবাদ এবং ভুল অনুবাদের দোলাচলের মধ্য দিয়ে। একজন উপপত্নীর তাইওয়ানি কন্যা চিজুরু নিজেকে ঔপনিবেশিক সরকারের সুরক্ষায় ভ্রমণকারী বিখ্যাত জাপানি ঔপন্যাসিক আওইয়ামার চেয়ে সামাজিকভাবে নিজেকে নিকৃষ্ট ভাবে। ইয়াং বলেন, ‘এটি ভালোবাসার গল্প, কিন্তু একই সঙ্গে এমন গল্পও যে, ভালোবাসা কীভাবে ক্ষমতার অসমতার কাছে হেরে যায়, তা দেখায়। ভালোবাসা শাসক শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের মধ্যকার পার্থক্যকে ঘুচিয়ে দিতে পারে না।’
ইয়াংয়ের মতোই ৩৩ বছর বয়সী কিং (যিনি একাধারে তাইওয়ানি ও আমেরিকান) শিল্প ও রাজনীতির এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাষী লেখক। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে তিনি তাইওয়ানে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রতিফলন দেখতে পান, যা তাকে কেবল তাইওয়ানি সাহিত্য অনুবাদ করার প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পুরস্কার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমার নিজের এবং আমার সহ-অনুবাদকদের লক্ষ্য হলো বেশি বেশি করে তাইওয়ানের সৃষ্টিশীল কণ্ঠস্বরকে ইংরেজিতে নিয়ে আসা যাতে কেউ তাইওয়ানের সাহিত্যকে একঘেয়ে বা একক কোনো রূপের সাহিত্য মনে করে ছোট করে না দেখে। কারণ, আমাদের লেখকরা সমবেত সুরে লিখছেন না, বরং আমরা এক বৈচিত্র্যময় কোলাহল–পরস্পরবিরোধী অবাধ্য স্বরে লেখালেখি করছি, ঠিক যেমনটা কোনো সুস্থ ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের লক্ষণ হওয়া উচিত।’
তাইওয়ানকে এভাবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে দেখার সেই দর্শনের মূলে রয়েছে এই উপন্যাসের ‘ক্যুইয়ার’ বা সমকামী সত্তাটি। চিজুরুর প্রতি আওইয়ামার তাই মুগ্ধতা স্বাভাবিক মনে হয়। ইয়াং নিজে নারী হয়ে আরেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তিনি এই উপন্যাসটিকে তাইওয়ানের বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকে বিকশিত ‘ক্যুইয়ার সাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের’ অংশ হিসেবে দেখেন। ইয়াং বলেন, ‘তবে আমি বিশেষভাবে যা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম তা হলো নারীদের মধ্যকার সব ধরনের সম্পর্ক যাতে উঠে আসে। নারীদের মধ্যকার নিজস্ব ভালোবাসা, এসব।’
ইয়াং বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, তাইওয়ান পুরো পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে প্রগতিশীল রাষ্ট্র। সেটি এলজিবিটিকিউ অধিকার হোক কিংবা নারী অধিকার, আমরা উদাহরণ তৈরি করছি।’
‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’-এর এই সাফল্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইংরেজিভাষী পাঠকদের মধ্যে অনূদিত কথাসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর বিক্রিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের পাঠকরা অনূদিত কথাসাহিত্যের বইয়ের পেছনে ২ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছেন, অর্থাৎ বই কিনেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। লক্ষণীয় হচ্ছে এই অনুবাদ বইয়ের সবচেয়ে বড় ক্রেতাগোষ্ঠী ছিল ২৫-৩৪ বছর বয়সের পাঠকরা।
‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়। কিন্তু যুক্তরাজ্যে এটি প্রকাশিত হতে আরও দুই বছর সময় লেগে যায়। কারণ, কোনো প্রকাশকই ইয়াংয়ের মতো কিংয়ের নামও বইয়ের প্রচ্ছদে দিতে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত কিছুটা অপ্রথাগত প্রকাশক ‘অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ বইটি প্রকাশে এগিয়ে আসে। ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’সহ এই প্রকাশক টানা দ্বিতীয়বার ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার জয়ের আনন্দ উদযাপন করছে। গত বছর এই পুরস্কার জিতেছিলেন ভারতীয় লেখক বানু মুশতাক তার ‘হার্ট ল্যাম্প’ বইটির জন্য, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন দীপা ভাস্তি, প্রকাশ করেছিল এই প্রকাশক।
কিংয়ের কাছে অনূদিত কথাসাহিত্যের গুরুত্ব অনেক। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পড়ার সৌন্দর্য হলো আপনি এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছে যাচ্ছেন যা আপনার নিজের নয় এবং আপনি নতুন কিছু জানতে পারছেন; অনূদিত সাহিত্য এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যখনই আমি এই ধরনের পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকার দিকে তাকাই, নিজের অজ্ঞতা অনুভব করি আর ভাবি–‘ওহ, আমি তো জানতামই না এরকম কোনো একনায়কতন্ত্র ছিল বা আমি সেই গণহত্যা, শাসনবদল কিংবা সেই উপভাষা এবং কীভাবে তাকে দমন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এভাবে শেখার কত কিছু যে আছে অনুবাদ থেকে!’
‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ শুধু তাইওয়ানের ইতিহাসের সঙ্গে অপরিচিত পাঠকদের সামনে এর দুয়ার খুলে দেয়নি, কিং আমাকে বলেন, এটি তরুণ তাইওয়ানি পাঠক এবং প্রবাসীদের মধ্যেও গভীরভাবে সাড়া ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই আমাকে বলেছেন, ইংরেজি ভাষার বইতে তাইওয়ানকে এভাবে চিত্রিত করা যায়, তারা সেটা প্রথমবার দেখছেন এবং এটি তাইওয়ান সম্পর্কে জানার জন্য তাদের আগ্রহকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। এটিই আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।’
সাক্ষাৎকার গ্রহণে: এমা লফহেগেন। সূত্র: গার্ডিয়ান