গবেষণা ও প্রবন্ধ সাহিত্যের বিষয় যেমন বিচিত্র হতে পারে, তেমনি বিশ্লেষণ ও ভাষাশৈলী বহুমুখী হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। গবেষণা-প্রবন্ধ সাহিত্যের বিষয় বহুমুখী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণগত মান বাড়লেও সাধারণত গল্প-উপন্যাস-কবিতার মতো এই শাখার পরিমাণ বাড়ে না। এর কারণও সুস্পষ্ট। যে কল্পনাশক্তি, মননশীলতায় গল্প-উপন্যাস-কবিতা সৃষ্টি সম্ভব, তা সবসময় গবেষণাকর্ম কিংবা প্রবন্ধ রচনার জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে। গল্প-উপন্যাস-কবিতার স্রষ্টার জন্য মৌলিক কল্পনাশক্তি ও মননশীলতাই যথেষ্ট। এজন্য তাকে প্রচুর পড়াশোনা ও গবেষণা না করলেও চলে। কিন্তু গবেষক ও প্রাবন্ধিকের যতই কল্পনার প্রাখর্য, চিন্তার গভীরতা ও বিশ্লেষণের দক্ষতা থাকুক, পঠন-পাঠন ব্যতিত তার পক্ষে গবেষণাকর্ম কিংবা প্রবন্ধ রচনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এ ছাড়া কবি-কথাশিল্পী সমাজে যে পরিমাণ ভালোবাসা-মূল্যায়ন পান, সে পরিমাণে গবেষক-প্রাবন্ধিককে লোকে চেনে না। এ কারণেই প্রতিটি ভাষার সাহিত্যেই গল্প-উপন্যাস-কবিতার তুলনায় গবেষণাকর্ম ও প্রবন্ধের সংখ্যা বেশি নয়। তাই প্রতিটি ভাষায় কবি-কথাশিল্পীর চেয়ে প্রাবন্ধিক-গবেষকের সংখ্যা কম। এই সংখ্যালঘুদেরই একজন রকিবুল হাসান (১৯৬৮)। যদিও তিনি কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাসও রচনা করেছেন। তবে এই নিবন্ধের বিষয় তার প্রবন্ধ সাহিত্য।
রকিবুল হাসানের প্রবন্ধ মূলত দুই ধরনের। প্রথমত, গবেষণাধর্মী, দ্বিতীয়ত বিশ্লেষণধর্মী। রকিবুল হাসানের গবেষণা-প্রবন্ধের প্রধান বিষয় সাহিত্য। আবার সাহিত্যবিষয়ক গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধের প্রধান বিষয় কথাসাহিত্য, বিশেষত উপন্যাস। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো বাংলা জনপ্রিয় উপন্যাসের ধারা: মীর মশাররফ হোসেন থেকে আকবর হোসেন; আকবর হোসেনের কথাসাহিত্য: রূপলোক ও শিল্পসিদ্ধি; পঞ্চাশের সাহিত্যে জনপ্রিয় যুবরাজ ও প্রবন্ধ প্রমূর্ত: ভিতর বাহির।
‘প্রবন্ধ প্রমূর্ত: ভিতর বাহির’ প্রবন্ধ গ্রন্থে রকিবুল হাসান আলোচনা করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন ও ওমর আলী প্রমুখের সাহিত্যকর্ম নিয়ে। এই গ্রন্থে তার কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ‘মধুসূদন-নজরুল: বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়প্রতিভা’, ‘বনলতা সেন: কবিতা ও কবিতার নারী’, ‘জসীমউদ্দীনের কাহিনিকাব্য: চারিত্র্যসন্ধান’ ও ‘ওমর আলীর কবিতা: ঐতিহ্যের প্রলুব্ধতা ও আধুনিকতার সম্বিৎ’। এসব প্রবন্ধে তিনি কবিতার বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন।
প্রবন্ধের বিষয় কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি রকিবুল হাসান। সংখ্যায় অত্যল্প হলেও সংস্কৃতি ও রাজনীতিও তার প্রবন্ধের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। সংস্কৃতি বিশেষত লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে গিয়েও রকিবুল হাসান মূলত সাহিত্যকেই তার গবেষণাক্ষেত্র হিসিবে বেছে নিয়েছেন। লোকসংস্কৃতির অনুসন্ধান করার জন্য নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস নির্বাচন করেছেন।
লোকসংস্কৃতির পর বিপ্লবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবন-সংগ্রামকেই বেছে নিয়েছেন রকিবুল হাসান। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন বিপ্লবী বাঘা যতীন ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী বাঘা যতীনের অবদান ও আত্মত্যাগকে রকিবুল হাসান দেখেছেন অন্য যেকোনো বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি সম্মানের চোখে। এ কারণে বাঘা যতীন বিষয়ক প্রবন্ধে তাকে বেশি শ্রদ্ধাশীল ও আন্তরিক দেখা যায়। অবশ্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা রচনায়ও রকিবুল হাসান শ্রদ্ধাশীল ও আন্তরিক।
‘বাংলা জনপ্রিয় উপন্যাসের ধারা: মীর মশাররফ হোসেন’ থেকে আকবর হোসেন গ্রন্থটি পিএইচডি অভিসন্দর্ভ হওয়ায় এতে তথ্য-উপাত্তের পরিমাণ বেশি সত্য। কিন্তু সেই তথ্য-উপাত্ত তার বিশ্লেষণ-বিচারবোধকে ছাপিয়ে যায়নি। এই বইকে রকিবুল হাসান ছয়টি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। এসব অধ্যায়ে বাঙালি মুসলমান ঔপন্যাসিকদের সাহিত্যসাধনার সুলুকসন্ধানের পাশাপাশি নন্দনতত্ত্ব, সমাজচিত্রায়নের বিচার করেছেন। একই সঙ্গে এই ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসের চরিত্রবিচারের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পবিচার করেছেন।
রকিবুল হাসান দেখিয়েছেন মীর মশাররফ হোসেনের উপন্যাস রত্নবতী, উদাসীন পথিকের মনের কথা, গাজী মিয়ার বস্তানী, এসলামের জয়, রাজিয়া খাতুন, তাহমিনা, বাঁধাখাতা, নিয়তি কি অবনতি প্রভৃতি উপন্যাসকে ছাপিয়ে বিষাদ সিন্ধুই জনপ্রিয়তার তুঙ্গ স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছিল। আর উপন্যাসটির সেই তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা এখনো বহমান। এর কারণ, উপন্যাসটির বিষয়বস্তু। যদিও মীর মশাররফ হোসেন মোহররমের মূল ইতিহাস থেকে অনেক দূরে সরে এসে ইতিহাসকেই মিথে পরিণত করে তুলেছিলেন। উপন্যাসটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে হয়তো এর মিথলজিক্যাল ভূমিকাই অনেকটা নিয়ামক হয়ে উঠেছিল।
মীর মশাররফ হোসেনের প্রতি রকিবুল হাসানের পক্ষপাত যতটা, মোহাম্মদ নজিবর রহমানের প্রতি ততটা নয়। এই কারণে দেখা যায় মীরের উপন্যাস আলোচনায় তিনি যতটা দরদি মনের পরিচয় দিয়েছেন, নজিবর রহমানের উপন্যাস বিচারের ক্ষেত্রে ততটাই নির্মোহ থেকেছেন। ফলে এই ঔপন্যাসিকের উপন্যাসের সাফল্যের দিক যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি ব্যর্থতার দিক বলতেও ভুল করেননি। অর্থাৎ মীরের পক্ষে অধিকাংশ সময় রকিবুল হাসানকে উকিলের ভূমিকায় দেখা গেলেও নজিবর রহমানের ক্ষেত্রে তিনি হয়ে উঠেছেন অনেকটাই ফৌজদারি মামলার বিচারক।
কবর হোসেনের কথাসাহিত্যবিষয়ে রকিবুল হাসানের আগ্রহ-মনোযোগ বেশি হলেও তা মাত্রাতিরিক্ত হয়নি। এর প্রমাণ আকবর হোসেনে কথাসাহিত্যবিচারের ক্ষেত্রে লেখকের কাহিনি-চরিত্র-সংলাপ-ভাষার শিল্পরূপ বিশ্লেষণেই রয়েছে। আকবর হোসেনকে রকিবুল হাসান জীবনবাদী লেখক হিসেবেই দেখেছেন। তিনি মনে করেন আকবর হোসেন মানব জীবন-সমাজ-সংসার থেকে বাস্তবানুগ অনুষঙ্গ নিয়েই তার কথাসাহিত্যের সৌধ নির্মাণ করেছেন। সেখানে কষ্টকল্পিত কিংবা স্বকপোলকল্পিত বিষয়ের অবতারণার সুযোগ ঘটেনি।
আকবর হোসেনের উপন্যাসের জনপ্রিয়তার মূলসূত্র সহজেই শনাক্ত করতে পেরেছেন রকিবুল হাসান। তিনি মনে করেন, ‘আকবর হোসেনের উপন্যাস সমকালে অধ্যধিক জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে এর বিষয়ভাবনা যতটা কার্যকর, ঠিক ততটা কার্যকর এর শিল্পরূপ।’ অর্থাৎ রকিবুল হাসান তার গবেষণাকর্ম ও প্রবন্ধে আকবর হোসেনের উপন্যাসের জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে বিষয়ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পরূপকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।
সাহিত্য জনপ্রিয় হওয়ার সূত্রগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে জনগণের কথা বলা, জনগণের মনের ভাষায়। জনগণের মনের ভাষা-ভাবাবেগ যিনি যত বেশি আয়ত্ত করতে পারবেন, তার সাহিত্যকর্ম তত বেশি জনপ্রিয় হয়। সেই জনপ্রিয়তার কারণে সাহিত্যের গুণগত মান ক্ষুণ্নও হতে পারে।
লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যের পর রকিবুল হাসান বিপ্লবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবন-সংগ্রামকেই বেছে নিয়েছেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন বিপ্লবী বাঘা যতীন ও শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী বাঘা যতীনের অবদান ও আত্মত্যাগকে রকিবুল হাসান দেখেছেন অন্য যেকোনো বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি সম্মানের চোখে। এ কারণে ‘বাঘা যতীন’ বিষয়ক প্রবন্ধে তাকে বেশি শ্রদ্ধাশীল ও আন্তরিক দেখা যায়। অবশ্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা রচনায়ও রকিবুল হাসান শ্রদ্ধাশীল ও আন্তরিক।
বাঘা যতীনের জীবনের ট্র্যাজিক পরিণতির বর্ণনা দিতে গিয়ে রকিবুল হাসান ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসও টেনে এনেছেন। ফলে প্রবন্ধটি হয়ে উঠেছে ইতিহাস আশ্রিত রাজনৈতিক ব্যক্তির জীবনচিত্র।
বাঘা যতীনের পাশাপাশি রকিবুল হাসানের সর্বোচ্চ সম্মানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক বন্ধুবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, তার আত্মজীবনী, তার স্বপ্নের ‘বাঘা যতীন মিলিটারি একাডেমি’ নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।
রকিবুল হাসানের আরেকটি ব্যতিক্রমী গদ্যের বই পথের কথা। এই গ্রন্থে তিনি নিজের দেখা পথ-ঘাট-মানুষ-প্রকৃতি ছবি এঁকেছেন।
সাহিত্যের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাবন্ধিক-গবেষক হিসেবে রকিবুল হাসান মন ও মননে বিচারক, কিন্তু তার প্রবন্ধের ভাষা নিরস নয়। বরং কথাসাহিত্যের ভাষার কোমল রূপ তার গদ্যকে করে তুলেছে চিত্তাকর্ষক। ফলে নিছক গবেষণামূলক প্রবন্ধ কিংবা বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধও সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া প্রবন্ধে কথাসাহিত্যের গদ্যভঙ্গির প্রয়োগের পাশাপাশি তিনি কবিতার মতো চিত্রকল্প-উপমারও প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। এ কারণে তার প্রবন্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক চিত্রের পাশাপাশি রয়েছে চিত্তে আনন্দসঞ্চারী গদ্যভঙ্গিও। এ ছাড়া রয়েছে কথাসাহিত্যের মতো তার প্রবন্ধেও ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। সেখানে আগে মানবতাবাদী-দেশপ্রেমিক, পরে শিল্পের সাধক। সম্ভবত রকিবুল হাসানের প্রবন্ধের প্রকৃত সৌন্দর্য ও শক্তি এখানেই নিহিত।