ইউরোপ থেকে কয়েক মাস বা বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সিংহভাগ সেনা প্রত্যাহার করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। ট্রাম্পের আমল শেষ হতে হতে ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি থাকবে নাম মাত্র।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ইউরোপীয় বাহিনীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা দায়িত্ব হস্তান্তর শুরু করেছেন, যাতে আকস্মিক সেনা প্রত্যাহারে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা না দেয়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ও সমাধান নিয়ে বৈঠকে বসে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। যদিও আলোচনায় ইউক্রেনকে রাখা হয় নি। আলোচনায় যুদ্ধ বন্ধ করে ইউরোপে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ইউরোপ থেকে বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা ও ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার শর্ত দেয় রাশিয়া।
কেন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত?
ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চাপ: যুক্তরাষ্ট্র চায় ন্যাটো সদস্যরা প্রতিরক্ষায় আরও বেশি ব্যয় করুক এবং নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করুক। ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্র একাই মোট সামরিক বাজেটের ১৬ শতাংশ খরচ বহন করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোকে পরামর্শ দিয়েছেন তারা যেন তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ খরচ করে প্রতিরক্ষা খাতে। কিন্তু পোল্যান্ড ছাড়া কেউ এ প্রস্তাবে রাজি হয় নি। বরং জার্মানির কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এ প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন তাদের পক্ষে এত বেশি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের জিডিপির মোট ২ শতাংশ তাদের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে।
চীনের বিরুদ্ধে কৌশলগত পরিবর্তন: ইউরোপ থেকে মনোযোগ সরিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে চায় ওয়াশিংটন। এজন্য রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ বন্ধে মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন। তাইওয়ান নিয়ে চীনের মনোভাব এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমাগত উপস্থিতি ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাই ট্রাম্প চাচ্ছেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিকে মোকাবেলা করতে এবং ওই অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে।
অর্থনৈতিক ব্যয় হ্রাস: যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট কমানোর কৌশলের অংশ হিসেবেও সেনা প্রত্যাহার বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে গত তিন বছরের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র একাই ২০০ বিলিয়ন ডলার ইউক্রেনকে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি ইউরোপে থাকা মার্কিন সেনাদের ব্যয়ভার কমাতেই ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহার করতে চাচ্ছেন।
ন্যাটো গঠিত হওয়ার পর থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও সামরিক আগ্রাসন মোকাবেলা করতে ইউরোপে সেনা মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নি। বরং রাশিয়ার সীমান্তের দেশগুলোতে সেনা মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন সূত্র মতে, বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ৬০ হাজার থেকে এক লাখ মার্কিন সেনা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৩ হাজার সেনা রয়েছে জার্মানিতে। ইতালিতে প্রায় ১২ হাজার, পোল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার করে রয়েছে। শুধু ফ্রান্সেই কোনো মার্কিন সেনা নেই।
মার্কিন সেনা সরিয়ে নিলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে ইউরোপ। তাই রাশিয়ার সামরিক প্রভাব মোকাবেলায় কথা বলতে শুরু করেছে ইউরোপের নেতারা। কিন্তু সহজ কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না আপাতত। বিশেষ করে ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ-মার্কিন ঐক্যে ফাটল দেখা দিয়েছে।
নতুন এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। তবে একইসঙ্গে রাশিয়ার জন্য এটি একটি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা, দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস
মাহফুজ/সিফাত/