গাজার মোট চাষাবাদযোগ্য শস্যভূমির মধ্যে মাত্র এক দশমিক পাঁচ শতাংশ এখন ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের হাতে রয়েছে। গত এপ্রিলেও গাজার চাষাবাদযোগ্য চার শতাংশ ছিল ফিলিস্তিনিদের হাতে। বাদবাকি যা ছিল, তা নষ্ট করে দিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও) প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে এসব।
প্রকাশিত তথ্যের বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েল গত মার্চ থেকে গাজায় পুরোপুরি অবরোধের পাশাপাশি কৃষিভূমি লক্ষ্য করেও আগ্রাসন চালিয়েছে। বর্তমানে গাজায় ২০ লাখ ক্ষুধার্ত গাজাবাসীর কাছে যথেষ্ট পরিমাণে খাবার পৌঁছাচ্ছে না।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, সংঘাত শুরু হওয়ার আগে গাজা কৃষি কেন্দ্র ছিল। সেখানে কৃষক ও সাধারণ ফিলিস্তিনিরা বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, বাদাম ও শস্য চাষ করতেন। সেগুলোর স্থানীয় চাহিদা ছিল।
এফএও বলছে, গাজা উপত্যকার মোট অর্থনীতির প্রায় দশভাগ জুড়ে ছিল এই কৃষি খাত। পাঁচ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ কৃষি ও মাছ ধরার ওপর আংশিকভাবে হলেও নির্ভরশীল ছিলেন।
ইসরায়েল ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় অবরোধ শুরু করার পর থেকে খাদ্যের উৎসে হামলা চালিয়েছে। বাগান, গ্রিনহাউস, কৃষিজমি ও ফিশারিজের ক্ষতিসাধান করেছে। ২০২৫ সালে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ইসরায়েল প্রায় ৮৬ শতাংশ কৃষিজমির ক্ষতিসাধণ করে, যা প্রায় ৩২ হাজার একরের সমপরিমাণ। বর্তমানে মাত্র ২৩২ হেক্টর গাজাবাসীর হাতে রয়েছে।
এফএও-এর মহাপরিচালক কু ডঙউ বলেন, ‘গাজা এখন পরিপূর্ণ মাত্রার দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে। মানুষ সেখানে এ জন্য ভুগছে না যে খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। তারা ভুগছেন কারণ প্রবেশাধিকার বন্ধ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। পরিবারগুলো এখন আর মৌলিক জীবিকাও চালিয়া যেতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এ মুহূর্তে নিরাপদ ও টেকসই মানবিক প্রবেশাধিকার এবং স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকা ফিরিয়ে আনতে হবে। আরও প্রাণহানি ঠেকানোর এটিই একমাত্র পথ। খাবারের অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস গাজায় ইসরায়েল সামরিক প্রক্রিয়ায় যেভাবে খাবার বিতরণ করছে তা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, ইসরায়েল গাজায় পদ্ধতিগতভাবে ক্ষুধা বৃদ্ধি করছে এবং বিষয়টিকে অমানবিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার তারা ‘দিস ইজ নট এইড। দিস ইজ অর্কাস্ট্রেটেড কিলিং’ নামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর বিতরণ কেন্দ্রে পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা, ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে প্রাণহানি- ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেছে।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস বলছে, জিএইচএফের বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে মানবিক সহায়তা বিতরণের মানদণ্ডগুলোকে মানা হয় না। সংস্থাটি আরও বলেছে, বিশ্বের আর যেসব স্থানে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস পরিচালিত হয়, এমনকি সবচেয়ে সহিংস এলাকাগুলোতেও সহায়তা বিতরণকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সহিসংতা সহ্য করা হয় না। এটি এখনই বন্ধ করতে হবে।
এদিকে, ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট তেরেসা রিবেরা বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ ‘গণহত্যার সঙ্গে মিলে যায়’। এবারই প্রথম ইউরোপীয় কমিশনের নির্বাহী অংশের কেউ এ ধরনের মন্তব্য করলেন। তিনি বলেন, ‘যদি এটি গণহত্যা না-ও হয়, তারপরও এটি গণহত্যার সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। আমরা যা দেখছি, তা হলো- একটি জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে এবং ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
যা বললেন ইসরায়েলের সেনাপ্রধান
গাজার দখল নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ লেফট্যানেন্ট জেনারেল ইয়াল জামিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ে গুঞ্জন বেড়েই চলেছে। জামির বলেছেন, মতপার্থক্য থাকা সামরিক বাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইসরায়েলিদের ইতিহাসেরও একটি অংশ এটি। জামির উল্লেখ করেন, আমরা এখানে কোনো তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছি না। এটি জীবন ও মৃত্যুর বিষয়। এই রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার বিষয়।’ ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা কাজ করা অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান।
সূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, টাইমস অব ইসরায়েল।