রাশিয়ার তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সু-৫৭ (Su-57) ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদনের জন্য ভারতকে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে রাশিয়া, রাশিয়ান সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ (TASS) মস্কোর সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ব্যবস্থার একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে।
সূত্রটি আরও বলেছে যে রাশিয়া ২০২৬ সালের মধ্যে ভারতকে পাঁচ ব্যাটারি S-400 "ট্রায়ামফ" আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ সম্পন্ন করবে। এই মাসের শুরুতে রাশিয়ান গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, অতিরিক্ত S-400 ব্যবস্থার জন্য আলোচনা ইতোমধ্যেই চলছে।
বর্তমানে ভারতীয় বিমান বাহিনী তাদের পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের জন্য রাশিয়ার তৈরি সুখোই-৫৭ যুদ্ধবিমান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান যাচাই-বাছাই করছে। তবে এক্ষেত্রে ভারতের অগ্রাধিকার যৌথ উৎপাদনে। সেদিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে যৌথ উৎপাদনের কোনো প্রস্তাব দেয় নি। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার পর কোন ধরনের জটিলতা বা শর্ত দিতে পারে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ভারতীয় বিমান বাহিনীর মধ্যে।
অন্যদিকে রাশিয়া ভারতকে যৌথভাবে সুখোই-৫৭ উৎপাদনের প্রস্তাব দিলেও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এ প্রকল্প কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে দ্বিধায় ভারত। কারণ যুদ্ধে রাশিয়ার প্রচুর রিসোর্স দরকার এবং তা উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বেশি। ফলে S-400 সরবরাহ করতেও রাশিয়ার অনেক দেরি হচ্ছে।
এমন অবস্থায় ভারত তাদের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি ফ্রান্সের কাছ থেকে ৪.৫ প্রজন্মের রাফাল স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে আলোচনা চালাচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ১১৪টি রাফাল ভারতে উৎপাদিত হতে পারে।
রাশিয়ার সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতার জন্য ফেডারেল সার্ভিসের প্রধান দিমিত্রি শুগায়েভের বরাত দিয়ে তাস বলেছে, ভারতের কাছে ইতোমধ্যেই আমাদের S-400 ব্যবস্থা আছে। এই ক্ষেত্রটিতে আমাদের সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। এর অর্থ নতুন সরবরাহ। আপাতত, আমরা আলোচনার পর্যায়ে আছি।
নয়াদিল্লি ২০১৮ সালে মস্কোর সঙ্গে পাঁচ সিস্টেম S-400 ব্যবস্থার জন্য ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা করা। তবে, চুক্তিটি বারবার বিলম্বের শিকার হয়েছে, এবং এখন শেষ দুটি ইউনিট ২০২৬ এবং ২০২৭ সালের জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
নয়াদিল্লি তার অস্ত্র কেনা বহুমুখী করা সত্ত্বেও রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা অংশীদার রয়ে গেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর মতে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে, ভারতের অস্ত্র আমদানির ৩৬ শতাংশ ছিল রাশিয়া থেকে, এরপরে ফ্রান্স ৩৩ শতাংশ এবং ইসরায়েল ১৩ শতাংশ।
দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে টি-৯০ (T-90) ট্যাঙ্ক এবং সু-৩০ এমকেআই (Su-30 MKI) যুদ্ধবিমানের লাইসেন্সকৃত উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং AK-203 রাইফেলের মতো যৌথ প্রকল্প।
ভারত রাশিয়ার সরবরাহ করা বিমানবাহী রণতরী INS বিক্রমাদিত্য-সহ মিগ-২৯ এবং কামোভ হেলিকপ্টারও পরিচালনা করে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, গত মে মাসে অপারেশন সিঁদুর-এর সময় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী সফলভাবে S-400 ব্যবস্থা ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করে, যা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার ভূমিকা তুলে ধরে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ উল্লেখ করেছেন যে ভারত রাশিয়ান সম্পদ কেনা বন্ধ করার জন্য পশ্চিমা চাপ প্রতিহত করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, মস্কো নয়াদিল্লির এই অবস্থানের ‘প্রশংসা’ করেছে।
এদিকে পাকিস্তান খুব শীঘ্রই চীনের কাছ থেকে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পাবে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম খবর ও আর্টিকেল প্রকাশ হয়েছে। ফলে ডিটারেন্ট পাওয়ার বজায় রাখার জন্য ভারতের এ ক্যাটাগরির বিমান অতি দ্রুত দরকার।
এই মাসের শুরুর দিকে চীনের সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। পুতিন যখন তাকে “প্রিয় বন্ধু” হিসেবে বর্ণনা করেন, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদি পুতিনকে বলেছিলেন যে ভারত এবং রাশিয়া কঠিন সময়েও একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
মাহফুজ/