পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তো বটেই ভারতের রাজনীতিতেও বাবরি মসজিদ একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাবক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের এক বিধায়ক কিছুদিন আগে, মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় নতুন করে বাবরি মসজিদ গড়ে তোলার ঘোষণা দিলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাবরি মসজিদ। আর এই আলোচনা–বিতর্কে ঢুকে গেছে বাংলাদেশের নামও।
এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি নেতা গিরিরাজ সিং অভিযোগ করেন, টিএমসি মসজিদ নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গে ‘বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর’ স্থাপন করতে চাইছে।
তার এই বক্তব্যের জবাবে বিজেপির এক মন্ত্রী বলেছেন, তৃণমূল বাবরি মসজিদের নয়, বরং পশ্চিম বঙ্গে বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
গিরিরাজ সিংয়ের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের সমর্থনেই’ টিকে আছে এবং ‘হিন্দুদের মৃতদেহের রাজনীতি’ বেশি দিন চলবে না। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস বাবরি মসজিদের নয়, বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। বাংলার হিন্দুরা ভুলবে না যে, এই সরকার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের সমর্থনে চলে।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআই–এর খবরে বলা হয়েছে, কয়েক দিন আগে তৃণমূলের বিধায়ক হুমায়ুন কবির দাবি করেছিলেন, আগামী ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ৩৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই ঘোষণা দেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। কাজ শেষ হতে তিন বছর লাগবে। বিভিন্ন মুসলিম নেতা এতে অংশ নেবেন।’
যেখানে ১৯৯৩ সালে মুম্বাই বোমা হামলা এবং পরবর্তী সময়কালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠনের ক্ষেত্রে বিরাট ভুমিকা রেখেছিল এই অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা।
ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তাদের সন্ত্রাসী হামলাগুলোর কারণ হিসেবে বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে উল্লেখ করেছিল।
তবে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক নির্মল ঘোষ জানান, হুমায়ুন কবির সাম্প্রতিক মন্তব্যে দলীয় সীমা ছাড়িয়ে গেছেন এবং তার বক্তব্য দলের অবস্থান নয়।
গত মঙ্গলবার এএনআইকে তিনি বলেন, ‘তিনি (হুমায়ুন কবির) এখন দলের সঙ্গে যোগাযোগে নেই। তার বক্তব্যের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো তার নিজের কথা, দল একদমই একমত নয়। তিনি সীমা অতিক্রম করেছেন।’
বিজেপি নেতা অশ্বিনী কুমার চৌবে বলেন, সমাজে অশান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে কিছু মানুষ ‘ধ্বংসাত্মক মানসিকতা’ নিয়ে এগোচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘বাবরের নামে এই দেশে কোনো মন্দির বা মসজিদ কখনো নির্মিত হবে না। এ ধরনের চেষ্টা সমাজকে দূষিত করার চেষ্টা মাত্র, আর সনাতন সমাজ তা কখনো মেনে নেবে না।’
বিষয়টি নিয়ে বিজেপির আরেক মুখপাত্র শেখজাদ পুনাওয়ালাও তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি অভিযোগ করেন, হুমায়ুন কবিরের এই ঘোষণা তৃণমূলের ‘ভোটব্যাংক তোষণের রাজনীতি।’
পুনাওয়ালা বলেন, ‘এটাই তৃণমূলের মুসলিম তোষণের রাজনীতি। হিন্দুদের গালি দাও, আর ভোটব্যাংকের তালি পাও। এরা জয় শ্রীরাম, রাম মন্দির, মা সীতা, মা দুর্গা, মা কালীকে অপমান করেছে। সিএএ, এসআইআর, ওয়াকফসহ যেকোনো ইস্যুর নামে তারা মানুষকে উসকে দেয়।’
তবে কংগ্রেস নেতা উদিত রাজ হুমায়ুন কবিরকে আংশিক সমর্থন দিয়ে বলেন, মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে আপত্তি তোলা হচ্ছে ‘অর্থহীন সন্দেহ’ সৃষ্টি করার জন্য।
তিনি বলেন, ‘যদি মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা যায়, তাহলে মসজিদের কেন সমস্যা হবে? যারা বিরোধিতা করছে, তারা অযথা জট পাকাচ্ছে। আমাদের দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর করসেবকদের হাতে অযোধ্যার রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদের বিতর্কিত স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়, যা পরবর্তী তিন দশকেও ভারতের রাজনীতিতে অগ্নিগর্ভ ইস্যু হয়ে রয়েছে।
সুলতানা দিনা/