আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যকার জটিল সম্পর্ককে নতুন দিশা দিতে সোমবার (৫ জানুয়ারি) বেইজিংয়ে গত দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষ বৈঠকে বসেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং।
এর আগে গত নভেম্বরে গিয়ংজুতে অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (APEC) সম্মেলনের সাইডলাইনে লি শির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। গত রবিবার লি তার চার দিনের সফরে বেইজিং পৌঁছান; ২০১৯ সালের পর কোনো দক্ষিণ কোরীয় প্রেসিডেন্টের এটিই প্রথম চীন সফর।
দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে একটি জটিল অবস্থানে রয়েছে। তাদের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার চীনের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক প্রয়োজন, কিন্তু সিউলের দুই প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ খারাপ হয়েছে। এছাড়া তাইওয়ান ইস্যু, বাণিজ্য উত্তেজনা এবং সামুদ্রিক মালিকানা নিয়ে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব মতভেদ তো রয়েছেই।
দক্ষিণ কোরিয়ার কেন চীনকে প্রয়োজন?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফরের সময়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, লি চলতি মাসের শেষের দিকে জাপান সফর করবেন, কিন্তু তিনি আগে চীন ভ্রমণ বেছে নিয়েছেন।
এখানে অর্থের বিষয়টি স্পষ্টতই গুরুত্বপূর্ণ। চীন দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদার, তাদের রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্য এবং আমদানির প্রাথমিক উৎস। কিন্তু সিউলের কাছে বেইজিংয়ের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়। উত্তর কোরিয়া এবং তার নেতা কিম জং উনের ওপর চীনের যে প্রভাব রয়েছে, তার জন্যও বেইজিং সিউলের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লির চীন যাত্রার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তর কোরিয়া তাদের পূর্ব উপকূল লক্ষ্য করে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সেই জরুরি অবস্থাকেই মনে করিয়ে দিয়েছে।
শি-লি শীর্ষ সম্মেলনে কী আলোচনা হলো?
গতকাল সোমবারের শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয় দুই নেতার উষ্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে। শি জোর দিয়ে বলেন যে, উভয় দেশই ‘‘দক্ষিণ কোরিয়া-চীন সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।’’
শি বলেন, ‘‘প্রতিটি সাক্ষাতে বন্ধুত্ব গভীর হয় এবং প্রতিটি সফরে প্রতিবেশীরা আরও কাছে আসে।’’ ২০১৪ সালের পর শির গত নভেম্বরের দক্ষিণ কোরিয়া সফরটিই ছিল কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর। তিনি আরও বলেন, ‘‘বন্ধু এবং প্রতিবেশী হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনকে আরও ঘন ঘন যোগাযোগ করতে হবে।’’
লি-ও শির সুরেই কথা বলেন। সিউলের হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক ম্যাসন রিচি বলেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম সাত মাস লির মনোযোগ ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। সেই তুলনায় লির এই চীন সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চীনের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সূক্ষ্ম সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটিই তার ক্ষমতার প্রথম প্রকৃত পরীক্ষা।’’
তবে রিচি সতর্ক করে বলেন, বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ হলেও বেশ কিছু অমীমাংসিত এবং সংবেদনশীল ইস্যু গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। বিশেষ করে পীত সাগরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে চীনের ‘হাইব্রিড থ্রেট’ বা ছদ্মবেশী হুমকি এবং তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের ওপর চীনের চাপের বিষয়টি অনুচ্চারিত থেকেছে।
আসসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের গবেষক লি ডং-গিউ বলেন, ‘‘উভয় পক্ষই সম্পর্ক পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে একমত। তবে কূটনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অভিন্ন অবস্থানে আসা সহজ হবে না।’’
উত্তর কোরিয়া ইস্যু
৯০ মিনিটের সম্মেলনে লি উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্য চীনের সহযোগিতার ওপর জোর দেন। পিয়ংইয়ং বর্তমানে কোনো কূটনৈতিক সংলাপে বসার আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
চীন উত্তর কোরিয়ার প্রধান মিত্র এবং অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি। শি উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং গত বছর বেইজিংয়ে বিজয় দিবসের প্যারেডে কিমকে শির পাশে দেখা গিয়েছিল। এদিকে, উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাকে ‘ভণ্ড’ এবং ‘সংঘাত সৃষ্টিকারী উন্মাদ’ বলে অভিহিত করেছে।
বৈঠকে লি বলেন, ‘‘(আমি) কোরীয় উপদ্বীপে শান্তির কার্যকর বিকল্প অনুসন্ধানে চীনের সঙ্গে কাজ করব যাতে উভয় দেশ সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যৌথ অবদান রাখতে পারে।’’ পারমাণু নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ না করলেও শি বলেন, দুই দেশের ওপর আঞ্চলিক শান্তি ও বৈশ্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সুং-লাক জানান, দুই নেতা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপ শুরুর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে প্রতিরক্ষা পর্যায়ে যোগাযোগ ও বার্ষিক বৈঠক আয়োজনে সম্মত হয়েছেন।
তাইওয়ান নিয়ে নীরবতা
গত সপ্তাহে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লি বলেছিলেন যে দক্ষিণ কোরিয়া ‘এক চীন নীতিতে’ বিশ্বাসী। তবে আগে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে, তাইওয়ান প্রণালীতে সামরিক দ্বন্দ্বে দক্ষিণ কোরিয়ার সরাসরি জড়িত হওয়া উচিত নয়।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাইওয়ানে চীনা আক্রমণের ক্ষেত্রে সামরিক পদক্ষেপের যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তাতে চীন-জাপান উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। সোমবারের বৈঠকে শি সরাসরি তাইওয়ান ইস্যু না তুলে বরং লি-কে ‘‘ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দাঁড়াতে’’ এবং ‘‘সঠিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে’’ বলেন।
পরিবর্তে, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সামরিকবাদের বিরুদ্ধে চীন ও কোরিয়ার যৌথ লড়াইয়ের ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন। লি-ও হাজার বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে পরোক্ষভাবে জাপানি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইকে স্মরণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপ
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াকে একটি কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। দক্ষিণ কোরিয়াতেই এশিয়ার বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত।
অধ্যাপক রিচি মনে করেন, লি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্ককে বেশি প্রাধান্য দেবেন, কারণ ঘরোয়াভাবে চীনে জনপ্রিয়তা অনেক কম এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় তার কোনো বিকল্প নেই।
গত নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন তৈরির বিষয়ে একমত হয়েছে। চীনের আধিপত্য রুখতে জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও তারা একে অপরকে সহযোগিতা করছে। যদিও শীর্ষ সম্মেলনে সাবমেরিন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়নি।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রশাসনের আমলে যখন যুক্তরাষ্ট্র তার এশীয় মিত্রদের ওপর আরও বেশি দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে পারে, তখন চীন সেই সুযোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে মার্কিন প্রভাব কমানোর চেষ্টা করতে পারে।
দক্ষিণ চীন সাগরের নাটকীয়তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
পীত সাগরের একটি যৌথভাবে পরিচালিত প্রোভিশনাল মেরিটাইম জোনে (PMZ) চীনের কিছু ইস্পাত কাঠামো নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বেগ রয়েছে। চীন একে মাছ চাষের সরঞ্জাম বললেও সিউল একে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখে। দুই দেশই এই সমুদ্রকে ‘‘শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ’’ করতে সম্মত হয়েছে এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারণে চলতি বছরেই উপ-মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সফরে লির সঙ্গে স্যামসাং, এসকে গ্রুপ এবং এলজি’র মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা ছিলেন। দুই দেশ বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং পরিবেশের ওপর ১৪টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ এবং চিপ রপ্তানির জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে হুয়াওয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় তাদের এআই চিপ চালু করার পরিকল্পনা করছে।
সাংস্কৃতিক বিনিময় ও অমীমাংসিত সমস্যা
অভিসংশিত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়লের সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ায় চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কথা মাথায় রেখে সিউল এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে চাইছে।
লি বলেন, ‘‘দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন একই সমুদ্রে একই দিকে অগ্রসরমান দুটি জাহাজের মতো।’’
সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়ে আলোচনা হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির চিফ অব স্টাফ কাং হুন-সিক মনে করেন, কে-পপ বা কে-ড্রামার ওপর থেকে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বেইজিং খুব দ্রুত তুলে নেবে না। এমনকি জনমত জরিপগুলোও দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একে অপরের প্রতি বিরূপ মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।
তা সত্ত্বেও, শীর্ষ সম্মেলন শেষে শি জিনপিংয়ের দেওয়া শাওমি ফোনে দুই নেতার হাসিখুশি সেলফি এবং লির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোস্ট ‘‘অসাধারণ ছবি হয়েছে’’ অন্তত বাহ্যিকভাবে দুই দেশের সম্পর্কের একটি ইতিবাচক রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। সূত্র: আল জাজিরা