যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার রাতে ইতিহাসের দীর্ঘতম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ দিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, অপরাধ, বাণিজ্য, অভিবাসন, পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার নীতির কথা তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, এগুলো দেশকে ‘যুগান্তকারী প্রত্যাবর্তনের’ পথে নিয়ে গেছে। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং দেশের ‘স্বর্ণযুগ’ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এদিকে ইরানের সঙ্গে সমস্যা নিরসনে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে বলেও জানান।
তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম এ ভাষণটি স্থায়ী হয় ১ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট, যা ২০০০ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের দেওয়া ১ ঘণ্টা ২৮ মিনিটের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়।
ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ক্যাপিটল ভবনের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস চেম্বার থেকে স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণ দেন। এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ। প্রথা অনুযায়ী, মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের যৌথ অধিবেশনে তিনি এ ভাষণ দেন।
ভাষণে ট্রাম্প ‘যুগান্তকারী প্রত্যাবর্তন’ দাবি করলেও বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, অনেক মার্কিনি দেশটির বর্তমান অবস্থা এবং ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তুষ্ট।
কিন্তু ট্রাম্প নিজ ভাষণে তার অবস্থান বা নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেননি। বরং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে তিনি জাতির উদ্দেশে একধরনের রাজনৈতিক প্রচারমূলক বার্তা, সমর্থকদের জন্য দেশপ্রেমের আহ্বান এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে কটাক্ষ ছুড়ে দেন।
ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্প পরিচিত সুরে বলেন, ‘আমাদের দেশ ফিরে এসেছে।’ তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের ‘সবচেয়ে উত্তপ্ত’ দেশ। ডেমোক্র্যাটদের ‘ক্রয়ক্ষমতার সংকট’ তৈরির জন্য দায়ী করে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব ভালো করছি।’ তিনি বাড়তে থাকা আয়, শেয়ারবাজারের উত্থান, পেট্রলের কম দাম, দক্ষিণ সীমান্তে অবৈধ অভিবাসী পারাপার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতির কথা তুলে ধরেন। শেষে বলেন, ‘আমাদের দেশ আবার জিতছে।’
তবে চ্যালেঞ্জ হলো, ট্রাম্পের জনসমর্থন এখন প্রায় ৪০ শতাংশের ঘরে ঘোরাফেরা করছে এবং অনেক মার্কিনি চান তিনি যেন তাদের উদ্বেগের বিষয়ে আরও কার্যকরী পদক্ষেপ নেন। গত মাসেও হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক ভাষণে তিনি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন, কিন্তু তা জনমত বদলাতে পারেনি। এবার কয়েক কোটি টেলিভিশন দর্শক তার পক্ষে বদলাবে বলে তিনি ও তার উপদেষ্টারা আশা করছেন। তবে এই ভাষণে নতুন নীতির ঘোষণা ছিল খুবই সীমিত। প্রায় ২ ঘণ্টার বক্তব্যে তিনি কয়েকটি প্রস্তাব দেন, যেমন কর্মজীবী মার্কিনিদের জন্য নতুন অবসর সঞ্চয় হিসাব এবং এআই কোম্পানিগুলোর জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চুক্তি, যাতে ভোক্তাদের বাড়তি বিল গুনতে না হয়।
এ ছাড়া তিনি পুরোনো কিছু প্রস্তাব আবারও সামনে আনেন, যেমন স্বাস্থ্যবিমা প্রিমিয়াম পরিশোধে সরাসরি আর্থিক সহায়তা, ভোটারদের নাগরিকত্ব প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা এবং অবৈধ অভিবাসীদের বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া নিষিদ্ধ করা।
গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট তার আরোপ করা বহু শুল্ক বাতিল করলেও তিনি তার বিস্তৃত শুল্কনীতি এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। আদালতের রায়ে তার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া তিন বিচারপতি সামনের সারিতে বসে নির্লিপ্ত ছিলেন। ভাষণের আগে ট্রাম্প ও প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংক্ষিপ্তভাবে করমর্দন করলেও কেউই হাসেননি।
শুল্ক নিয়ে আলোচনা চলাকালে রিপাবলিকানদের উচ্ছ্বাসের মাঝে ডেমোক্র্যাটদের গুঞ্জন এবং কিছু রিপাবলিকানের অস্বস্তিকর নীরবতা লক্ষ করা যায়। অনেক রিপাবলিকানই শুল্কের অর্থনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অভিবাসন প্রসঙ্গ আসতেই কক্ষের উত্তেজনা বেড়ে যায়। ‘অবৈধ বিদেশি’ হুমকি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে রিপাবলিকানদের বজ্রধ্বনি করতালি শোনা যায় আর ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে আসে তীব্র প্রতিবাদ ও কটাক্ষপূর্ণ দৃষ্টি।
অভিবাসন ইস্যু ছিল ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তির জায়গা। কিন্তু মিনিয়াপোলিসে কঠোর অভিযান চলাকালে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় তার অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তিনি ভাষণে ওই ঘটনার উল্লেখ করেননি কিংবা পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হতে পারে বলে যে ‘নরম পন্থা’র কথা বলেছিলেন, তাও তোলেননি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইঙ্গিতও ছিল, যা ঠিক করবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের গঠন। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের ভাষণে পররাষ্ট্রনীতি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। ইরানের কাছে ব্যাপক মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার তেমন চেষ্টা করেননি।
তিনি বলেন, ‘আমার পছন্দ কূটনীতির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাস পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রকে আমি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেব না।’ এরপর তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক হাওয়া তার প্রতিকূলে বইছে। তবে ট্রাম্প হয়তো বিশ্বাস করেন, জনমতের পরিবর্তন আসন্ন। হয়তো তিনি মনে করেন, তার নীতির অর্থনৈতিক সুফল আমেরিকানরা শিগগিরই অনুভব করতে শুরু করবেন। অথবা দেশের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপন দেশপ্রেমের নতুন আবহ তৈরি করবে। সূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা