তখন আরিফ সবে বাচ্চা ছেলে। বিছানায় জলঘটিত ব্যাপারটি প্রায়ই ঘটে যাওয়ার বয়স। মা সেই জলে চাল ভিজিয়ে খাইয়ে দিতেন ট্রিটমেন্ট হিসেবে। এতে নাকি শয়তান দূর হয় আর বিছানা ভেজানোর রোগটাও সেরে যায়।
আরিফের ঠিক সেই বয়সে বিটিভিতে সপ্তাহে এক দিন প্রচার হতো আলিফ লায়লা। আশপাশে শুধু লায়লাদের বাড়িতেই চৌদ্দ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভি থাকায় বাচ্চাকাচ্চারা ভিড় জমাত সেখানে। আরিফ ছিল সেই বাচ্চাদেরই একজন। তবে বয়সের তুলনায় সামান্য পাকা। বাচ্চাদের বসার জন্য মাটিতে বিছিয়ে দেওয়া হতো বাঁশের তৈরি মাদুর। চেয়ারে বসে ঠ্যাং দুলিয়ে টিভি দেখা ছিল অনেকটা স্বপ্ন। আর বিছানায় শুয়ে টিভি দেখা তো কল্পনাতীত ব্যাপার।
এক দিন অনেকটা জাদুর মতোই ঠ্যাং দুলিয়ে টিভি দেখার স্বপ্ন পূরণ হয়ে যায় আরিফের। সে দিন আরিফকে বসার জন্য চেয়ার এগিয়ে দেয় লায়লা। লায়লার এই করুণায় মন ভরে ওঠে আরিফের। মনে হয়েছিল, সে যেন পেয়ে গেছে আলাদিনের চেরাগ। এর পর থেকেই ধীরে ধীরে তাদের মাঝে মন দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারটিও ঘটে যায়। দুজনে আনমনে স্বপ্ন দেখে, একজন আরেকজনের হাতে ধরে জাদুর মাদুরে চড়ে উড়বে রঙিন আকাশে। একেকটা পর্ব যেমন নানা বাধা পেরিয়ে একেকটি সফল ঘটনার দিকে এগিয়ে যায়, তেমনি তাদের প্রেমপর্বও গভীরতা লাভ করতে থাকে। বাড়তে থাকে বয়সও। লায়লার করুণায় আরিফের মাটিতে বসে টিভি দেখার প্রমোশন হয়ে কাঠের চেয়ারে, অতঃপর তা সোফা পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু সিরিয়ালটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সিরিয়াল বন্ধ হলেও তাদের প্রেমের সিরিয়াল চলতেই থাকে।
সময়ের পরিক্রমায় আরিফ তখন একাদশে আর লায়লা এসএসসি পরীক্ষার্থী। ফোনে কথা আর লুকিয়ে দেখা হয়। লায়লাদের পুকুরঘাটে দেখা করতে এসে মাঝে মধ্যে লায়লার বাপের দাবড়ানি আর বড় ভাইয়ের থাবড়ানির মতো নির্মম নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। তবু কখনো পিছপা হয়নি সে। একপর্যায়ে লায়লাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবার উঠেপড়ে লাগে। বরও মিলে যায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবারের চাপে বিয়েতে রাজি হয় লায়লা।
কিছুদিন পর তার সংসার সুখের হাওয়ায় চলতে শুরু করে। কারণ তার স্বামী বিমানের পাইলট। তার নামও আরিফ হোসেন। অরিজিনাল আরিফকে ভুলে গিয়ে ডুপ্লিকেট আরিফকে নিয়ে সে মনের সুখে দিব্যি আকাশে ওড়ে। জাদুর পাটিতে নয়, পাইলট স্বামীর সঙ্গে বিমানে চড়ে শতভাগ বাস্তবে।
এদিকে অরিজিনাল আরিফ প্রিয়তমা লায়লাকে হারিয়ে দিশাহারা। তার সঙ্গে না হোক অন্তত তার নামের সঙ্গে মিল আছে, এমন কারও সঙ্গে লায়লার বিয়ে হয়েছে- এই ভেবে নিজেকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেয়। যদিও এক মুহূর্তের জন্যও সে লায়লাকে ভুলতে পারেনি। সে জানে, লায়লাকে আর পাওয়া যাবে না, আবার লায়লাকে সে ভুলতেও পারবে না। তবে তাকেও তো খুঁজে বের করতে হবে নতুন কোনো পথ। কিন্তু লায়লা নামের কাউকে না পেলে তো তার এই আশা পূরণ হবে না।
ওদিকে বিটিভি ছেড়ে জিটিভিতে ফিরে এসেছে আলিফ লায়লা, অনেকটা তাকে ছেড়ে লায়লা যেভাবে গিয়েছে আরেক আরিফের ঘরে। যেভাবেই হোক মনমতো একজন লায়লাকে পেতে হবে তার জীবনে। সেই ভাবনা থেকেই আজ অবধি সে একজন সুন্দরী লায়লাকে খোঁজার জন্য বখাটে তকমা গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে স্কুল-কলেজের গেটের সামনে।