নির্বাচনের মৌসুম এলেই দেশটা যেন আলাদা এক জ্বরে পড়ে। বাতাসে তখন শুধু একটাই শব্দ, ভোট। রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান এমনকি অফিস-আদালতেও মানুষ আলোচনা করে কে জিতবে, কে হারবে। প্রার্থীরা তখন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। কেউ বলছে উন্নয়ন হবে, কেউ বলছে পরিবর্তন আসবে, আবার কেউ বলছে আগের সব ভুল শুধরে দেবেন। আর কর্মীরা? তারা তো ভোট আদায়ের যুদ্ধে নেমেছে সর্বশক্তি নিয়ে।
এমনই এক নির্বাচনে বদনা মার্কার প্রার্থী ছিল বেশ নামকরা। তার কর্মীরা দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছে ভোট ভিক্ষায়। ভাই একটা ভোট দিয়েন, চাচা বদনা মার্কায় সিল মারবেন, এই সংলাপ মুখস্থ হয়ে গেছে তাদের। ঠিক এমন সময় একদিন তারা হাজির হলো রফিক চাচার বাড়িতে। রফিক চাচা খুব সাদাসিধা মানুষ। রাজনীতির প্যাঁচগোছ তার মাথায় ঢোকে না। কারও সঙ্গে তর্ক করতে পারেন না, আবার কাউকে কষ্ট দিতেও চান না। কর্মীরা তাকে ডেকে বলল, চাচা, বদনা মার্কায় ভোটটা দিয়েন।
রফিক চাচা সহজ গলায় বললেন, আচ্ছা বাবা, দেখা যাবে।
এতেই তারা খুশি। একজন পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে রফিক চাচার হাতে গুঁজে দিল।
রফিক চাচা আঁতকে উঠে বললেন, এইটা কেন?
— চা-সিগারেট খাওয়ার জন্য।
রফিক চাচা টাকা ফেরত দিতে চাইলেন। এসব লাগবে না বাবা। কিন্তু কর্মীরা কানাকানি করে আরও কিছু টাকা তার হাতে ধরিয়ে দিল। শেষমেশ প্রার্থী নিজেই এগিয়ে এসে গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, নেন চাচা নেন। আমাকে ভোটটা দিয়েন। আর ভোট যে দিলেন তার প্রমাণ নিয়ে আসবেন।
প্রমাণ কথাটা রফিক চাচার কানে ঢুকলেও মাথায় ঢুকল অন্যভাবে। তিনি ভাবলেন, ভোট দিলে প্রমাণ দেখাতে হয় বুঝি! যাক, শহরের নিয়ম শহরের মতোই। নির্বাচনের দিন রফিক চাচা খুব ভোরে বের হলেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যালট পেলেন, বুড়া আঙুলে কালি লাগল, তারপর ঢুকলেন বুথে। ভেতরে ঢুকে তিনি একদম নিশ্চিত হয়ে বদনা মার্কায় সিল মারলেন। ব্যালট ভাঁজ করলেন ঠিকই, কিন্তু প্রমাণের কথা মনে করে আবার খুলে দেখলেন, ঠিক আছে, সিল স্পষ্ট। বুথ থেকে বেরিয়ে আসার সময় ব্যালট বাক্সের পাশে দাঁড়ানো লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই রফিক চাচা ব্যালট পকেটে ভরে ফেললেন। ভাবলেন, প্রমাণ তো সঙ্গে না রাখলে চলবে কেন!
বাইরে বেরিয়ে দেখেন বদনা মার্কার কর্মীরা অপেক্ষা করছে। তারা জিজ্ঞেস করল, চাচা, ভোট দিয়েছেন?
রফিক চাচা গম্ভীর গলায় বললেন, হ্যাঁ, দিয়েছি। প্রমাণও এনেছি।
— কী প্রমাণ, দেখি।
রফিক চাচা পকেট থেকে ব্যালট বের করে গর্বের সঙ্গে দেখালেন, এই দেখো, তোমাদের বদনা মার্কায় সিল মারা ব্যালট!