বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক মামলায় আদালত অঙ্গনে আসামিদের ওপর সম্প্রতি হামলা-হেনস্তার বিভিন্ন ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। আদালত কক্ষের ভেতরের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আদালত প্রশাসনও।
আদালত কক্ষে আসামিদের গায়ে হাত তোলা, ডিম নিক্ষেপের পাশাপাশি তাদের বা তাদের আইনজীবীদের আদালতে কথা বলতে না দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। এসব আসামির মধ্যে রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সদ্য সাবেক মন্ত্রী-এমপি, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি ও সাংবাদিক। এদের মধ্যে রয়েছেন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি ও নারী। আদালত অঙ্গনে এসব ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইন উপদেষ্টা, এমনকি প্রধান উপদেষ্টাও।
অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজীকে। যদিও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ উল্লেখ করে এই দায়িত্বে যোগ দেননি তিনি। এর আগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও পিপির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আইনজীবী সমাজে নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত এই আইনজীবীর নজরে দিলে আদালত অঙ্গনে আসামিদের হেনস্তা প্রসঙ্গে দৈনিক খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ফৌজদারি কোনো অপরাধ কোনো ব্যক্তির উপস্থিতিতে বা তার জ্ঞাতসারে সংঘটিত হলে ওই ব্যক্তি মামলা করতে পারেন। এটা ঐচ্ছিক বিষয়। আর পুলিশ বা আদালত অঙ্গনে ঘটনা সংঘটিত হলে যাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ঘটনা ঘটেছে, তারা মামলা করবে। আদালত অঙ্গনের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে পুলিশ, তাই মামলা হয়েছে কি না বা এই বিষয়ে কী ভাবনা- তা বলবে পুলিশ।
রাজধানীর কোতোয়ালি থানা এলাকায় অবস্থিত ঢাকার নিম্ন আদালত অঙ্গনে আসামিদের হেনস্তা করার সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনাগুলো ঘটেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হাসান জানান, এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।
এসব ঘটনায় মামলা করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানান এই কর্মকর্তা। এর বেশি কিছু জানার থাকলে ওপরে জিজ্ঞেস করার পরামর্শ দেন তিনি।
থানাটি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের (ডিভিশন) অন্তর্গত। বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা (পুলিশ প্রশাসন) বসেছি। আলোচনা করেছি। সিএমএমের (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) সঙ্গেও বসেছি। আমরা দেখছি, কী করা যায়।’
আদালত অঙ্গনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা এবং এজলাসের ভেতরে নিপীড়নের ঘটনা ঘটার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমএম আদালতের নাজির খন্দকার রেজওয়ান বলেন, ‘এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত আমাদের (সিএমএম প্রশাসন) পক্ষ থেকে কোনো মামলা দায়ের হয়নি। সিএমএম মামলা করলে তো নাজিরেরই বাদী হওয়ার কথা। তবে আমি বাদী হয়ে মামলা করার জন্য এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি।’
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ঢাকার আদালতে এমন ঘটনা প্রথম সামনে আসে গত ১৪ আগস্ট। ওই দিন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে লক্ষ্য করে সিএমএম আদালত অঙ্গনে ডিম নিক্ষেপ করা হয়। আসামিদের শরীরে ডিম নিক্ষেপকারীরা এ সময় পুলিশের প্রিজন ভ্যানের সামনে চড়ে স্লোগানও দেন।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে ছয় সমন্বয়ককে ডিবি অফিসে আটকে রাখায় আদালতে লড়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফসল অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সময়ে সময়ে দৃঢভাবে সমালোচনাও করছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘একাত্তরকে যে অস্বীকার করতে চায় তাহলে তো সে বাংলাদেশকেই অস্বীকার করে।’
আদালতে আসামিদের হেনস্তা করার প্রথম ঘটনার পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। সিএমএম প্রশাসনও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিষয়টি নজরে আনলে জেড আই খান পান্না বলেন, পুলিশের উচিত ছিল হামলাকারীদের সঙ্গে সঙ্গে অ্যারেস্ট করা, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। পুলিশ এবং আদালত প্রশাসনের এমন নিষ্ক্রিয়তা অন্যায় কাজে উৎসাহ জোগাতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ আগস্টের পর বিভিন্ন সময় আদালতে আসামিদের হেনস্তার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সর্বশেষ আলোচনায় আসে গত ৭ অক্টোবর সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণে সাবেক পরিবেশ ও বনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকে মারধরের চেষ্টা এবং তাকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা।
এর মধ্যে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিকে আদালত প্রাঙ্গণে হেনস্তা করা হয়। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ আরও কয়েকজন।
আক্রমণের শিকার হন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীও (মানিক)। সিলেট আদালতে ওই ঘটনায় মারাত্মক আহত হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন মামলার অনেক আসামির মতো গত ২২ আগস্ট সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপা আদালতে কথা বলতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন। সেদিন আদালত থেকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় এক আইনজীবী ফারজানা রুপাকে ঘুষিও মারেন।
বিশিষ্টজনের অভিমত পড়ুন