ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনোখুনিতে আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে খুন, ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা। দিন কিংবা রাত নয়, প্রায় সব সময়েই একধরনের আতঙ্ক নিয়ে রাজপথ ও অলিগলিতে চলাচল করছেন নগরবাসী। ফাঁকা এলাকা বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ পেলেই আর কোনো কিছুর যেন তোয়াক্কা করছে না ছিনতাইকারী-ডাকাত চক্র। পেশাদার অপরাধীদের এমন বেপোরয়া তৎপরতার নেপথ্যের কারণ ও প্রতিকার নিয়েও বেশ নড়াচড়া শুরু করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে মূলত চারটি কারণকে তারা চিহ্নিত করেছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখা থেকে খবরের কাগজকে জানানো হয়েছে, গত তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রাজধানী ঢাকায় বিভিন্নভাবে ১৫৮ জন খুন হয়েছেন। ওই তিন মাসে ডাকাতির মামলা হয়েছে ১৭টি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১২২টি মামলা হয়েছে। তবে ঘটনার তুলনায় তিন মাসে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের সংখ্যা অনেক বেশি। এই সময়ে ৮০৩ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। এ ছাড়া গত ১ থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত ২২ দিনেই ৪৮৯ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিট। এই ২২ দিনের ছিনতাইয়ের ঘটনার সুস্পষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। তবে আগের তুলনায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটেছে বলে জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে পেশাদার অপরাধীদের বেপোরয়া তৎপরতার নেপথ্যের কারণ নিয়ে। ৫ আগস্টের পর পুলিশের বিপর্যয় কি একমাত্র কারণ, নাকি আরও কারণ আছে? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা অন্তত চারজন পদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন ঢাকার অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এবং বেপরোয়া তৎপরতার নেপথ্যের প্রধান কয়েকটি কারণ সম্পর্কে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে ছিনতাই-ডাকাতিসহ পেশাদার অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে মূলত চারটি কারণ উল্লেখযোগ্য। সেগুলোর মধ্যে প্রথমত হচ্ছে, পেশাদার অপরাধীদের মনে পুলিশভীতি প্রায় চলেই গেছে। এতে করে তাদের বেপরোয়াভাব প্রকাশ পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে সাধারণ অভিযান বা ডিউটির সময় যেসব অস্ত্র পুলিশ সঙ্গে রাখছে, সেগুলোর অধিকাংশতেই রাবার বুলেট ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে না। এর ফলে অপরাধীদের মনে একধরনের স্বস্তি বিরাজ করছে এবং তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না। তৃতীয়ত, অপরাধীরা চক্রভিত্তিক বা সংঘবদ্ধভাবে বেশি তৎপরতা চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক বড় সন্ত্রাসী বা গ্যাং লিডারের অধীনে সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে তারা। এই চক্রের কেউ গ্রেপ্তার হলে দ্রুত তাকে ছাড়ানোসহ অপরাধ ঘটানোর ক্ষেত্রেও যৌথ সহযোগিতা পাচ্ছে তারা। চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, আদালত থেকে খুব সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে পেশাদার অপরাধীরা। অনেকের আট-দশটি মামলা থাকলেও আইনের নানা ‘মারপ্যাঁচে’ জামিনের সুবিধা নিচ্ছে অপরাধীরা। যার ফলে বারবার গ্রেপ্তার বা জেলে যাওয়ার বিষয়কে তুচ্ছ মনে করছে অপরাধীরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা ঘটলেও ছিনতাইয়ের ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। একেবারে অপরাধশূন্য অবস্থায় আনা সম্ভব নয়, আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যেই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে কয়েক শ পেশাদার ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই অভিযান চলমান আছে।’
ছিনতাই-ডাকাতির মতো অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে অনেকগুলো সামাজিক বিষয় জড়িত মন্তব্য করে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে গ্রুপভিত্তিক অপরাধীদের তৎপরতা বেড়েছে। আমরা তাদের নজরদারি করাসহ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করছি। এ ক্ষেত্রে পেশাদার অপরাধীরা যাতে সহজেই জামিন না পায়, সে বিষয়েও ডিএমপির পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জামিনের এখতিয়ার সম্পূর্ণ আদালতের, তাই আমরা পেশাদার অপরাধীর অপরাধের তথ্য-উপাত্তসংবলিত প্রোফাইল আকারে আদালতে জমা দিয়ে জামিন ঠেকানো বা বাতিলের জন্য কাজ শুরু করেছি।’
এ বিষয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতের পাবিলক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে বর্তমানে রাজধানীতে অপরাধের মাত্রা বেড়ে গেছে। একইভাবে জামিন পাওয়ার হারও বেড়েছে। তবে জামিনের বিষয়ে যাতে আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হয় এবং বিষয়গুলো শক্তভাবে দেখা হয়, সে লক্ষ্যে গত শনিবার (২৫ জানুয়ারি) সিএমএম (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতের সভাকক্ষে গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা, সরকারি আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই অংশ নেন। আমি নিজেও সেখানে অন্তত তিনটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি। বিষয়গুলো হলো- ছিনতাই, জবরদখল এবং চাঁদাবাজি।’
ডিআইজি পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, ‘৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেটারও একটি বড় প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলায়। আগে যেসব পেশাদার অপরাধী কারাবন্দি ছিলেন, তাদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে গেছেন। জামিনে বেরিয়ে তারা প্রায় প্রত্যেকে আলাদা করে ছোট-বড় গ্রুপ তৈরি করে ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ শুরু করেন। অন্যদিকে ঢাকার ক্ষেত্রে- এই মহানগরে বস্তিবাসী থেকে শুরু করে বিলিনিয়ারের বসবাস রয়েছে। বিশেষ করে বস্তিকেন্দ্রিক বা অতি দরিদ্র যারা তাদের আয়-রোজগার অনেকাংশে কমে গেছে। অনেকে কর্মহীন হয়েছেন। পরিবার বা নিজের আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করায় কেউ কেউ চুরি-ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। পুলিশ বাহিনীর একার পক্ষে এজাতীয় সংকট দূর করা সম্ভব নয়।’
এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘অপরাধের ধরন ও অপরাধীদের বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সে অনুসারে পুলিশের পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও পুলিশ নিজেই নিরাপত্তাঝুঁকিতে আছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশে যে বিপর্যয় ঘটেছে, সেখান থেকে তারা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তার মাঝে আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এখনো সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাংভিত্তিক বড় বড় সন্ত্রাসী-অপরাধী জামিনে বেরিয়ে গিয়ে তারাও নিজের গ্রুপ বা দল বড় করছে, প্রভাব বাড়াচ্ছে। এসব গ্যাং লিডারদের গ্রুপে উঠতি সন্ত্রাসী বা ছিনতাইকারী-ডাকাতরাও যুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়গুলোতে ঊর্ধ্বতনদের বা সরকারকে বাড়তি নজর দিতে হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডার আফতাবনগর চায়না প্রোজেক্ট এলাকায় আব্দুস সালাম (৬৫) নামে একজন অটোরিকশা চালককে হত্যা করে তার গাড়িটি ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এতেই ক্ষান্ত হয়নি দুর্বৃত্তরা, তারা সালামের মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে খুন করে। গত ২১ জানুয়ারি রাতে গুলশান-২ নম্বর ডিএনসিসি মার্কেটের সামনে সিটি মানি এক্সচেঞ্জের কর্ণধার কাদের শিকদার (৩৫) ও তার শ্যালক আমির হামজা (২৫) বাসায় ফেরার পথে ছুরিকাঘাতের শিকার হন। এ সময় তাদের কাছে থাকা বিদেশি মুদ্রাসহ প্রায় দেড় কোটি টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গত ২৩ জানুয়ারি রাতে বাসায় ফেরার পথে কামরাঙ্গীরচরের ইতি জুয়েলার্সের মালিক সজল রাজবংশীকে পায়ে গুলি করে ৫০ ভরি স্বর্ণালংকার ও সাড়ে ৩ লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। গত এক সপ্তাহে শুধু এই একটি-দুটি নয়, এমন অনেক ছোট-বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। চুরি-ছিনতাই করতে গিয়ে খুনও করছে অনেকে। ছিনতাইয়ের কারণে রাজধানীতে রাতে ও ভোরে চলাচল করতে মানুষ ব্যাপক ভয় পাচ্ছে।