পাহাড়ি স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় উত্তেজনার মধ্যে খাগড়াছড়ির গুইমারায় ১৪৪ ধারা ভেঙে সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহতরা সবাই ‘পাহাড়ি’। তবে তাদের কারও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনায় জেলার মানুষ আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতেও ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এদিকে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে মারমা সম্প্রদায়ের দুই সংগঠন। খাগড়াছড়ি জেলা সদর ও গুইমারা উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি থাকবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) অবরোধ শুরুর দিকে জেলা সদরসহ কোথাও কোনো ধরনের সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা ছড়ায় গুইমারা উপজেলায়। মুখোমুখি অবস্থান নেন পাহাড়ি ও বাঙালিরা। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইট-পাটকেল, গুলতি নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে গুরুতর আহত হন অন্তত ১৫ সেনাসদস্য। পরে সেখানে পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনের একটি সশস্ত্র দল এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন।
৩ জনের মৃত্যুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুঃখ প্রকাশ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি নিহত এবং মেজরসহ ১৩ সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসি ও তিন পুলিশ সদস্য এবং আরও অনেক আহতের ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শিগগিরই তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধারণ ও শান্ত থাকার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে কাদের গুলিতে কীভাবে ওই তিনজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। তাদের পরিচয় সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
অস্থিরতার শুরু গত মঙ্গলবার রাতে। প্রাইভেট পড়া শেষে বাসায় ফেরার পথে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় মারমা সম্প্রদায়ের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ভিকটিমের বাবা পরদিন থানায় ধর্ষণের মামলা করলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত শয়ন শীল নামে এক তরুণকে আটক করে। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইলে বিচারক তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অবরোধের প্রথম দিন
ধর্ষণের প্রতিবাদে গত বুধবার সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন পাহাড়িরা। ব্যানারে নাম দেওয়া হয় ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’। সমাবেশ থেকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলায় অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষণা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই অবরোধের সমর্থনে জেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ অপরাপর উপজেলার মূল সড়কগুলোতে অবস্থান নিয়ে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে অবস্থান নেন অবরোধ সমর্থকরা। ওইদিন জেলার কোথাও বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ছাড়াই সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।
অবরোধের দ্বিতীয় দিন
গত শুক্রবার সকাল থেকে ফের উত্তেজনা শুরু হয় জেলার বিভিন্ন স্থানে। কোনোরকম ঘোষণা ছাড়াই অবরোধ শুরু করেন পাহাড়িরা। ওইদিন বিকেলে ফের ২৪ ঘণ্টা অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই অবরোধের সীমা ছিল শনিবার ভোর ৫টা থেকে রবিবার ভোর ৫টা পর্যন্ত। অবরোধ শুরুর প্রথম দিকে শহরের চেঙ্গী স্কোয়ার, জিরোমাইল, স্বনির্ভর এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়কে পিকেটিং করেন অবরোধকারীরা। তারা সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। পরে পুলিশ গিয়ে তা সরিয়ে নেয়। তবে পৌর শহরের ভেতরে সীমিত পরিসরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করে। দুপুরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে জেলা সদরের উপজেলা পরিষদ এলাকায়। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া অবরোধ চলাকালে সহিংস ঘটনাও ঘটেছে একাধিক স্থানে। সন্ধ্যায় জেলা সদরের স্বনির্ভর এলাকায় বেশকিছু বাঙালি ব্যবসায়ীদের দোকানে হামলা এবং লুটপাট করেছে পাহাড়িরা। অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ি সদর থেকে দীঘিনালা, পানছড়ি, রামগড়, মহালছড়ি, মাটিরাঙ্গাসহ ৯ উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল। সারা দিনের সংঘাত, সংঘর্ষ ও নাটকীয়তা শেষে রাত ১২টায় ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করে অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। কিন্তু ১ ঘণ্টা পর ফের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে আবারও অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ডাক দেওয়া হয়।
অবরোধ ও সহিংসতা বন্ধের আহ্বান মারমাদের
এদিকে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে মারমা সম্প্রদায়ের দুই সংগঠন, বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদ ও মারমা উন্নয়ন সংসদ। বিবৃতিতে মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। সাধারণ মানুষের জানমাল ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসকে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়।
নিরাপত্তা জোরদার
থমথমে খাগড়াছড়ি। দোকানপাট বন্ধ, রাস্তায় যানবাহন নেই। শহরের প্রবেশপথগুলোতে সেনা ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বিভিন্ন মোড়ে বসানো হয়েছে তল্লাশি চৌকি। বিজিবি, এপিবিএন ও সেনারা টহল দিচ্ছেন। খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিজিবির অতিরিক্ত প্লাটুন মোতায়েন করা হয়েছে। কেউ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে গ্রেপ্তার করা হবে।’
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধনের আশঙ্কা থাকায় পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলা সদর এবং গুইমারা উপজেলায় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ মোতাবেক ১৪৪ ধারা জারি থাকবে।’