পুণ্য (ছদ্মনাম) রাজধানীর একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গতকাল বুধবার তার বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়। মঙ্গলবার তার মা তাকে পড়াতে বসেন। প্রথম দিন গণিত পরীক্ষা। পরীক্ষার জন্য ছেলে কেমন প্রস্তুত তা বোঝার চেষ্টা করেন মা। তিনি পুণ্যকে অঙ্ক করতে দেন। কিন্তু পুণ্য কয়েকটি অঙ্ক ভুল করে। এ জন্য মা তাকে মারেন। বাবা ছেলের কান্নার শব্দ পেয়ে ছেলের পড়ার টেবিলে গিয়ে দেখেন, ছেলে কাঁদছে আর অঙ্ক করার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। আর মা তাকে ধমক দিচ্ছেন। ধমকে পুণ্য আঁতকে উঠছে। শুধু তা-ই নয়, মা একটু নড়েচড়ে বসলেও শিশুটি ভয় পাচ্ছে। ভাবছে এই বুঝি মা তাকে মার দিল।
শুধু পড়া নিয়ে নয়; একটু দুষ্টুমি করলেও মায়ের হাতে মার খেতে হয় পুণ্যকে। মায়ের হাতে মার খেতে খেতে তার মনে ভয় ঢুকে গেছে। কখনো কোনো ভুল করলে মায়ের ভয়ে এখানে-সেখানে লুকিয়ে পড়ে। মায়ের সঙ্গে কিছুই শেয়ার করতে চায় না। মায়ের হাতে মার খেলেও তা ভয়ে খুব একটা বাবাকে বলে না। মুখে নখের আঁচড়ের চিহ্ন কিংবা মাথার কোথায় ফোলা দেখে বাবা বুঝতে পারেন যে পুণ্যকে তার মা মারধর করেছেন। এ বিষয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করলে শিশুটি বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে মায়ের ভুল ছিল না, সে দোষ করেছিল, তাই মা তাকে মেরেছেন।
পুণ্যর ঘটনায় বোঝা যায় ঘরেও নিরাপদ নয় শিশুরা। অধিকাংশই শিকার হচ্ছে সহিংস শাসনের। বুঝে কিংবা না বুঝে ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে শিশুদের। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশুশ্রম। জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।
এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে সর্বজনীন বিশ্ব শিশু দিবস। প্রতিবছর ২০ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো শিশুদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং বিভিন্ন দেশে শিশুদের প্রতি নির্যাতন বন্ধে জোর দেওয়া।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ সম্প্রতি এক জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। যেখানে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সুরক্ষা ও বিকাশে বিদ্যমান অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, দেশে উদ্বেগজনক হারে শিশুশ্রম বেড়েছে। অনেক শিশুর রক্তে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে। ওজন কম হওয়া শিশু বেশি, মায়েদের রক্তস্বল্পতা এখনো উচ্চপর্যায়ে, শিশুবিয়ে এখনো দেশের প্রায় অর্ধেক মেয়ের জীবন প্রভাবিত করছে। বাড়িতে সহিংস শাসনের শিকার হচ্ছে ৮৬ শতাংশ শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়িতে সহিংস শাসনের শিকার এসব শিশু মানসিক বিপর্যয়ে পড়ছে। তাদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তারা বলছেন, না বুঝেই অভিভাবক সন্তানের ভালোর চিন্তা করে ক্ষতি করে ফেলছেন। অভিভাবক নিজের সন্তানের ভালোর চিন্তা করে শাসন করেন। কিন্তু তা যখন সহিংস হয়, তা যখন ভয়ের সৃষ্টি করে, তখন ক্ষতির কারণ হয়। মনে রাখতে হবে, শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে। সে যেমন আচরণ পায়, সে রকম আচরণ শেখে। সে জন্য শিশুদের সঙ্গে সব সময় ভালো আচরণ করতে হবে। যাতে তারা ভালো কিছু শেখে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, শিশুর সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই করা যাবে না। এটা শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। মনোযোগ হারিয়ে ফেলতে পারে। হতাশায় ভুগতে পারে। একসময়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। লেখাপড়ার প্রতি অনীহা চলে আসতে পারে। সে জন্য শিশুর সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। পড়তে না চাইলে বোঝাতে হবে। অভিভাবককে কৌশলী হতে হবে। এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যাতে সে ভয় পায়। এই ভয় সারা জীবন তার অন্তরে থেকে যেতে পারে। পরে যেকোনো কাজ করতে তার মনে ভয় কাজ করতে পারে। ভবিষ্যতে সবকিছুতে তার পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি বলেন, শিশু স্বভাবতই ভুল করবে। অন্যদের সামনে তাকে হেয় করে, কারও সঙ্গে তুলনা করে নেতিবাচক সমালোচনা করা ঠিক না। শিশুদেরও আত্মমর্যাদা বোধ রয়েছে। সে বোধে আঘাত লাগলে সে-ও প্রতিক্রিয়া দেখায়। রূঢ় আচরণ না করে তাকে প্রত্যাশিত আচরণের জন্য বুঝিয়ে বলতে হবে, আচরণ পরিবর্তনের সুযোগ দিতে হবে। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে পুরস্কৃত করা উচিত। তাকে বোঝান যে আপনি তার আচরণে খুশি হয়েছেন। কটূক্তি, বকাঝকা বা শারীরিক শাস্তি দেওয়াটা কাম্য নয়।
স্কুলে শিক্ষকদেরও এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত উল্লেখ করে ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, কোনো শিশুর আচরণগত সমস্যা দেখা দিলে তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে এর পেছনের কারণটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে হবে। সঠিক আচরণে উদ্বুদ্ধ করতে গঠনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। শাস্তি কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজনে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
বেড়েছে শিশুশ্রম
সম্প্রতি ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০২৫ (এমআইসিএস ২০২৫)-এর প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেছে। এতে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে দেশে (৫-১৭ বছর) শিশুশ্রমের হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ; ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে আরও ১২ লাখ শিশু।
জরিপে দেখা গেছে, বাল্যবিবাহের হার ২০১৯ সালের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, তবে এখনো প্রায় অর্ধেক মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। এ ছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশের জন্মনিবন্ধন হয়েছে।
নতুন জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ শতাংশের এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় ৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। ঢাকা (৬৫ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকা। সিসাদূষণ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে হুমকি সৃষ্টি করে এবং এর প্রভাব সব আর্থসামাজিক শ্রেণির ওপরই পড়ছে; আক্রান্ত শিশুদের অর্ধেকের বেশি ধনী এবং ৩০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। কম ওজনের শিশুর হার ২০১৯ সালে যেখানে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল, তা বেড়ে ২০২৫ সালে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির উচ্চহার (৮০ শতাংশ) বজায় থাকলেও উচ্চতর স্তরে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার তীব্রভাবে কমেছে। অনেক শিশু মৌলিক দক্ষতা অর্জন ছাড়াই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করছে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী বয়সী শিশুদের প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ স্কুলের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
জলবায়ু সংকটের কারণে দুর্যোগের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের শিশুদের শিক্ষার ওপর। ২০২৪ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ দেশের জন্য বিশেষভাবে বিধ্বংসী ছিল, যার ফলে ৩ দশমিক ৫ কোটিরও বেশি শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে।
বাংলাদেশে নবজাতকের মৃত্যুহার এখনো উদ্বেগজনক
প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে ২২ জন মারা যায়। এই হার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সিজারিয়ান সেকশনের উচ্চহার (৭৫%) স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া মাত্র ৪৬ শতাংশ নারী গর্ভাবস্থার প্রথম চার মাসে প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করেন। মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নের মাধ্যমে নবজাতকের স্বাস্থ্যকর জীবন নিশ্চিত করা জরুরি। গর্ভধারণের শুরু থেকে মায়েদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘এমআইসিএস ২০২৫-এর ফলাফল বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছে এবং এটি অগ্রগতি ও চলমান চ্যালেঞ্জ দুটিই তুলে ধরে। ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করবে, যাতে এই তথ্যকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত করা যায় এবং কোনো শিশু পিছিয়ে না থাকে।’