ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণে বাংলাদেশ সব সময়ই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি কারণে সম্প্রতি এই ঝুঁকির মাত্রা বহু গুণ বেড়েছে। ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা- এই তিন সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান বাংলাদেশের। ভৌগোলিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ রাজধানী ঢাকাও। কয়েকটি ফল্টের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থান ঢাকার। এ ছাড়া রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে যাওয়ায় এই ঝুঁকির মাত্রা বহু গুণ বেড়েছে।
রাজধানীর কাছেই রয়েছে মধুপুর ফল্ট। বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্টের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের আওতায় পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। বৃহত্তর সিলেটে রয়েছে সক্রিয় ডাউকি ফল্ট। টেকটোনিক ফল্ট লাইনের কারণে ঝুঁকিতে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বৃহত্তর ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা; কুমিল্লা-চাঁদপুর-মুন্সীগঞ্জ-নরসিংদী-গাজীপুর অঞ্চলে মেঘনা-শীতলক্ষ্যা অববাহিকায় রয়েছে বেঙ্গল ফোরডিপ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতীয় ও বার্মা প্লেটের নিমজ্জন অঞ্চলে (টেকটোনিক প্লেট অন্য একটি প্লেটের নিচে ঢুকে যায়)। বিপুল পরিমাণ শক্তি আটকে আছে। এই জমে থাকা শক্তি যেকোনো সময় রিখটার স্কেলে ৭ বা ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে।
এ ধরনের ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এতে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, এটি আশঙ্কার কারণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে (বিশেষ করে আশুলিয়া) ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এতে ভূ-অভ্যন্তরে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। পানির স্তর নেমে যাওয়া গ্যাস ওপর দিকে চাপ দিচ্ছে। এটিও ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের একটি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ভূমিকম্পের তরঙ্গ ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে দুটি প্রভাব ফেলে। একটি দোলন, অন্যটি স্থায়ী পরিবর্তন। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে দূরের এলাকায় কাদা-মাটি মেশানো ঘোলা পানি দেখা যায়। এটি সাধারণত দোলন প্রক্রিয়ার প্রভাব। ভূমিকম্পের পরে ভূগর্ভের শিলাস্তরের পানি চলাচলের ক্ষমতা বাড়তে পারে। ভূকম্পের কেন্দ্রস্থলের পানির সঙ্গে ভিন্ন রাসায়নিক গঠনের পানি এসে মিশতে পারে। তবে তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক নয়।
আলোচনায় ‘বেঙ্গল ফোরডিপ’
শীতলক্ষ্যা অববাহিকায় রিখটার স্কেলে সাড়ে ৫ মাত্রার বেশি ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় ভূতত্ত্ববিদরা আলোচনায় নিয়ে এসেছেন ‘বেঙ্গল ফোরডিপ’ ইস্যু। ফোরডিপ এমন একটি এলাকা, যেখানে প্লেটের সংঘর্ষের কারণে তৈরি হওয়া কাদা ও পলি সমুদ্র-স্থলভাগে এসে জমেছে।
ভূতত্ত্ববিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার খুব কাছে প্রবাহিত শীতলক্ষ্যা নদীর তলদেশে রয়েছে বেঙ্গল ফোরডিপ নামে পূর্বমুখী অববাহিকা। ফোরডিপটির পূর্ব প্রান্তে রয়েছে ইন্দো-বার্মা সাব-ডাকশন জোন, যেখানে ভারতীয় প্লেট বার্মা মাইক্রোপ্লেটের নিচে রয়েছে। আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়াই মূলত এই অঞ্চলের টেকটোনিক কার্যকলাপের উৎস। এটি টেকটোনিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয়। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর অববাহিকা থেকে শুরু করে উত্তরে আবার ব্রহ্মপুত্র নদ এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই ফোরডিপ।
ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ফোরডিপের ওপর পলির গভীরতা মাত্র ১৬ কিলোমিটার, যার নিচে রয়েছে মেসোজয়িক যুগের পাথরের স্তর। ফলে ভূমিকম্পের কেন্দ্র কখনো গভীর হবে না। ভূমিকম্পের কেন্দ্র কম গভীর হলে ভূমিকম্পের কম্পন বেশি হয়। এই অঞ্চলের মাটি ধীরে ধীরে উত্থান এবং অবনমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গত শুক্রবার ৫ দশমিক ৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে সারা দেশে, তার উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল। গতকাল শনিবার সকালে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর পলাশ। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর বাড্ডা ও নরসিংদীতে ৪ দশমিক ৩ এবং ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। গতকালের এই তিনটি ভূমিকম্পের কেন্দ্রও ছিল ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুদ্দোজা মিয়া এবং অধ্যাপক মো. সাইফুল বলেন, ফোরডিপ এলাকায় যেসব অপরিকল্পিত উন্নয়ন হচ্ছে; তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এসব এলাকায় নগরায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তারা।
অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “ভূমিকম্প হওয়ার মতো সব উপাদান বেঙ্গল বেসিনে আছে। আমাদের নদীগুলো একেকটা ফল্টকে অনুসরণ করে। বেঙ্গল বেসিনে ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত পুরো পলি-মাটির স্তর আছে। এটাকে ‘গ্রোথ ফল্ট’ বা ‘ডিসটিনক্ট ফল্ট’ বলা হয়। গ্রোথ ফল্ট হলো এমন একটি ভাঙন যেখানে মাটি জমার সঙ্গে সঙ্গে ফল্ট ধীরে ধীরে সরতে থাকে। ডিসটিনক্ট ফল্টের কারণে মাটিতে বিশেষ স্তর বা ফাটল তৈরি হয়।”
ভূ-অভ্যন্তরে শক্তি জমছে, হতে পারে ভয়াবহ ভূমিকম্প
অধ্যাপক ড. বদরুদ্দোজা মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, গত ১০০ বছরের মধ্যে সাড়ে ৫ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হয়নি বাংলাদেশে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত প্রতি ১০০-১২৫ বছরে একবার ঘটে। এই সময়সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। তার মানে হলো, ভূ-অভ্যন্তরে অনেক শক্তি জমা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটাতে পারে।
৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। এটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। ভূপৃষ্ঠের এত কাছে ভূমিকম্প হওয়ায় তা বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা অনেক বেশি।’
আফটার শক নাকি ফোরশক
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ মো. রুবাঈয়্যাৎ কবীর বলেন, ‘একটা বড় ভূমিকম্প হওয়ার পরে আফটার শক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর শনিবার তিনটি মৃদু ভূকম্প অনুভূত হয়েছে। এই ভূমিকম্পকে আফটার শক বলতে পারি। আফটার শক প্রথম ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বের এলাকায়ও হতে পারে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ অবস্থানগত কারণে ঝুঁকিতে আছে। উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট, পূর্বে মায়ানমার সাব-প্লেট, উত্তরে ডাউকি ফল্ট, রংপুর-নরসিংদীতে আছে সেগাই ফল্ট, ঢাকা-টাঙ্গাইলে আছে মধুপুর ফল্ট। বাংলাদেশে যেসব ভূমিকম্প হয়েছে, সেগুলো এর আশপাশের অঞ্চলে হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই ভূমিকম্প ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বলছি, বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আবহাওয়া অধিদপ্তরের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, এটা আফটার শক নাকি ফোরশক; সেটা এখনই বলে দেওয়া যাবে না। আরও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে হবে। তবে ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমিয়ে দেবে। এতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরের গ্যাস বেরিয়ে যাবে। মাটির অভ্যন্তরে চাপ কমবে।