বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ৬টি ডিপোকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। ভুয়া লিজ পার্টি সৃষ্টি, ভুয়া ঠিকানায় আবেদন এবং অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ বকেয়া রাখার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ডিপোর ইউনিট প্রধানদের একটি অংশ সরাসরি লিজ পার্টি নির্ধারণে জড়িত থাকায় এই অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
বিআরটিসির এই ডিপোগুলো হলো– বগুড়া, জোয়ারসাহারা, খুলনা, মতিঝিল, রংপুর ও কল্যাণপুর বাস ডিপো। এই ডিপোর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিআরটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে আরও অনেক অনিয়মের কথা।
ডিপোপ্রধানরা পাইয়ে দিচ্ছেন ‘বিশেষ সুবিধা’
বিআরটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ইউনিট প্রধানদের দায়িত্বকালেই ইজারাদারদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। বরং ইউনিটপ্রধানদের যোগসাজশেই লিজ পার্টি গঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য মামলা করতে গেলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায় না।
খুলনা ডিপো থেকে পরিচালিত একটি লিজ বাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ মিলেছে। কাগজে গোপালগঞ্জের ঠিকানা দেওয়া থাকলেও সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া যায়নি। বকেয়া টাকা আদায়ে বারবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব মেলেনি।
বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানান, যেকোনো ডিপোতে নতুন বাস সংযোজনের পর নিয়ম অনুযায়ী হেড অফিসে আবেদন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা আলাদা। অনেক ক্ষেত্রে ডিপো ব্যবস্থাপক বা ইউনিটপ্রধান নিজে লিজ পার্টি ঠিক করে দেন। পরে কাগজপত্র পূরণের জন্য হেড অফিসে আবেদন পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় ডিপোপ্রধানদের পক্ষ থেকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, একাধিক ম্যানেজার ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বাসের লিজ পেতে আবেদন করেছেন। পরে বিআরটিসির পক্ষ থেকে অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়, ওই নাম বা ঠিকানায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ইউনিটপ্রধানদের কেউ কেউ নিজেই ভুয়া লিজ পার্টির নাম ব্যবহার করে এসব আবেদন সম্পন্ন করেছেন বলে জানা গেছে।
খবরের কাগজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, লিজ গ্রহণকারী ইজারাদারদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে জামানত নেওয়া হলেও বাস্তবে বকেয়া টাকার পরিমাণ জামানতের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। অভিযোগ আছে, কিছু ক্ষেত্রে ম্যানেজাররা বকেয়া থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ বিআরটিসির প্রশাসন ও অপারেশন বিভাগের ব্যবস্থাপক নূর-ই-আলম, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ওয়ার্কস) মো. মনিরুজ্জামান এবং ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (এস্টেট) মো. গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে। যখনই বিআরটিসির মাসিক সমন্বয় সভায় লিজের টাকা পুনরুদ্ধারের প্রসঙ্গ ওঠে, তখন এ প্রসঙ্গ ধামাচাপা দেন এই কর্মকর্তারা।
মো. গোলাম ফারুক ও নূর-ই-আলম বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে কীভাবে অনিয়মের রাজত্ব বিস্তার করেছেন তা নিয়ে খবরের কাগজ ‘৬ কোটি টাকা লুট করে তারা এখন শীর্ষ পদে’ শিরোনামে গত বছরের ১১ এপ্রিল বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর এক বছর কেটে গেলেও অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিআরটিসি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
সার্টিফিকেট মামলা দায়ের, তবুও রাজস্ব বকেয়া
সম্প্রতি বিআরটিসির একটি নথিতে লিজ গ্রহণকারী ইজারাদারদের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। বিআরটিসির হিসাবে ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। সবচেয়ে বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে রাজধানীর কল্যাণপুর বাস ডিপোতে। এই ডিপোতে সর্বোচ্চ ১ কোটি ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬৭ টাকা জমা বকেয়া রেখেছেন ইজারাদাররা। তাদের মধ্যে ৩ লাখ টাকা বকেয়ার দায়ে লিটু এন্টারপ্রাইজ, ৮ লাখ টাকা বকেয়ার দায়ে মেসার্স গোলাম এন্টারপ্রাইজ, ১২ লাখ টাকা বকেয়ার দায়ে প্রাপ্তি এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করা হয়েছে ২০১৯ সালে। তবে এসব মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। বাকি ৮ জন ইজারাদার হলেন– রবিউল ট্রেডার্স, সুনীল চন্দ্র দাস, মেসার্স এম এ কুদ্দুস, মেসার্স জয় ট্রেডার্স, মো. জামাল আহম্মেদ, আমির হোসেন, মো. হাফিজুর রহমান খান, মো. জয়নাল আবেদীন, মো. চান মিয়া। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ বকেয়া মো. চান মিয়ার, টাকার অঙ্কে ১৬ লাখ ২৬ হাজার। অথচ এই আট ইজারাদারের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। কল্যাণপুর বাস ডিপোর সাবেক ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে উঠেছে অভিযোগের তির। এখন মো. শাহরিয়ার বুলবুল এই ডিপোর দায়িত্ব নেওয়ার পর পার পেয়ে যাওয়া সেই ইজারাদারদের চিঠি দিয়েছেন।
বগুড়া ডিপোর ইজারাদার শেখ নাছিম আলী ১৫ লাখ টাকা, সাইদ রাশেদুল ইসলাম ৯ লাখ, হানিফ খান ২ লাখ, কামরুল হাসান ৪ লাখ, হাসান আলী মণ্ডল ৪৫ লাখ টাকা জমা বকেয়া রেখেছেন। তাদের মধ্যে হাসান আলী মণ্ডলের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছিল। বাকি ইজারাদারদের জামানত থেকে রাজস্ব কেটে নেওয়া হচ্ছে।
জোয়ারসাহারা বাস ডিপোতে মো. তৌহিদুর রহমান খান ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার, মো. জামাল ২ লাখ ৬৫ হাজার, মো. বাদল খন্দকার ২০ লাখ ১২ হাজার, শ্রী নন্দপাল ৮৬ হাজার টাকা জমা বকেয়া রেখেছেন। তাদের মধ্যে তৌহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে সার্টিফিকেট মামলা করা হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সর্বশেষ শুনানি হওয়ার পরে সেই মামলার কার্যক্রম থমকে গেছে। নন্দপালের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করা হয় ২০২২ সালে। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুনানির পরে তার মামলার কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে। মো. জামালের বকেয়া রাজস্ব আদায়ের কোনো তথ্য বিআরটিসির সদর দপ্তরকে জানাতে পারেনি জোয়ারসাহারা বাস ডিপো। বাদল খন্দকার তার রাজস্ব থেকে বকেয়ার টাকা কেটে নিতে চিঠি দিয়েছেন।
রাজধানীর মতিঝিল বাস ডিপোতে ৬১ লাখ ৮১ হাজার ৯৪৫ টাকা রাজস্ব জমা দেননি ইজারাদাররা। ১০ জন ইজারাদারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রেখেছেন নন্দনাল মণ্ডল, টাকার অঙ্কে তা ৩১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। ৮ লাখ টাকা জমা বকেয়ার দায়ে মো. আতহারুল ইসলাম নামে এক ইজারাদারের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করা হয়েছে। কিন্তু বাকিদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের কোনো চেষ্টা নেই।
রংপুর বাস ডিপোতে ৯ জন ইজারাদার ৪৬ লাখ ২২ হাজার ৯৮৭ টাকা জমা বকেয়া রেখেছেন। ওমর খান সর্বোচ্চ ৯ লাখ টাকা, এ কে এম আবদুর রউফ বকুল সাড়ে ৭ লাখ টাকা জমা বকেয়া রেখেছেন। মো. মোখলেছুর রহমান মিঠু বাদে বাকিদের কারও জমা বকেয়ার পরিমাণ সাড়ে ৩ লাখ টাকার নিচে না। অথচ তাদের কারও বিরুদ্ধে ডিপোর ব্যবস্থাপকরা এখনো কোনো ব্যবস্থা নেননি।
খুলনা বাস ডিপোতে ৩ লাখ ২২ হাজার টাকা জমা বকেয়া রয়েছে। গত বছর দুই ইজারাদারকে রাজস্ব জমা দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে এই ডিপো থেকে। তবে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া যায়নি পুরোটা।
যা বলছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান
ইজারাদারদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট ও ফৌজদারি মামলা করা হলেও মামলার কার্যক্রমে ধীর গতিতে রাজস্ব আদায় থমকে গেছে। এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লা খবরের কাগজকে বলেন, ‘একটি মামলার আগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান, প্রতিবেদন, শুনানি কার্যক্রমে তো সময় লাগে। তবে লিজের বাস নিয়ে যত অনিয়ম হয়েছে, যে ডিপোতেই হোক না কেন, সেই ডিপোর তৎকালীন ব্যবস্থাপককে জবাবদিহি করতে হবে। তাকে সব হিসাবনিকাশ বুঝিয়ে দিতে হবে।’ বিআরটিসি কেউ রাজস্ব জমা বকেয়া রেখে চাকরি থেকে অবসরে গেলে তার প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাস লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়াতে যে গলদ ছিল, তা মেনে নেন আবদুল লতিফ মোল্লা। পাশাপাশি এটিও স্বীকার করে নিয়েছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে বাস লিজের অপকর্মে জড়িত ছিলেন তারা এখন রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রমে নানা আপত্তি তুলছেন।