এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য হচ্ছে সাজেক ভ্যালি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ ফিট উচ্চতায় এর অবস্থান। সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও খাগড়াছড়ি হয়ে যেতে হয়। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব ৭৩ কিমি আর দীঘিনালা থেকে ৪০ কিমির মতো। ভ্রমণপিপাসুরা সাজেক ভ্যালিকে বাংলার ভূস্বর্গ নামে অভিহিত করেন। চারপাশে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বিস্তীর্ণ পাহাড় সারি, তুলার মতো মেঘ, এর মধ্যেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাজেক ভ্যালি। প্রকৃতি এখানে সকাল-বিকেল রং বদলায়। দিনের প্রতিটি মুহূর্তে সাজেকের আলাদা রূপ দেখতে পাওয়া যায়।
কী কী দেখবেন সাজেক ভ্যালিতে
প্রকৃতিপ্রেমী হলে আপনার কাছে পুরো সাজেক ভ্যালিটাই দর্শনীয় মনে হবে। তার পরও বলতে হয় পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান কংলাকপাড়া। এ ছাড়া রুইলুইপাড়া, রক গার্ডেন, লুসাই ভিলেজ উল্লেখযোগ্য।
কংলাক হলো সাজেকের সবচেয়ে উঁচু স্থান। এটি লুসাই অধ্যুষিত পাড়া। কংলাকের চূড়া থেকে পুরো সাজেক ভ্যালি একনজরে দেখা যায়। ভাগ্য ভালো হলে দিগন্তে দেখা পাওয়া যায় রংধনুর। এই অপার সৌন্দর্য অবলোকনের জন্য কংলাকের চূড়া পর্যন্ত উঠতে ৪০ মিনিটের মতো ট্রেকিং করতে হবে। বিকেল বেলা কংলাক ভ্রমণের আদর্শ সময়। চাইলে কংলাকের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে পারবেন।
সাজেকের নিচে একটি ঝরনা আছে। প্রচলিত ভাষায় এটি কমলক ঝরনা নামে পরিচিত। এর মূল নাম পিদাম তৈসা বা সিকাম তৈসা। রুইলুইপাড়া থেকে এখানে ট্রেকিং করে যেতে চাইলে আসা যাওয়ায় চার ঘণ্টার মতো সময় লাগবে।
সূর্যাস্তের পরও সাজেক তার রূপবদল থামাবে না। সন্ধ্যার পরপরই আকাশ ভরা নক্ষত্রের দেখা মিলবে। রাত যত বাড়বে তার রূপও তত গাঢ় হবে। দূষণমুক্ত পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে প্রতিদিনই রাতের আকাশে তারার মেলা বসে। জ্যোৎস্না রাতে প্রকৃতি হয়ে ওঠে আরও স্বর্গীয়! খোলা মাঠে বাতাসে গা এলিয়ে দিয়ে রাতের আকাশ দেখতে চাইলে হ্যালিপ্যাড সবচেয়ে চমৎকার জায়গা।
সাজেকে মেঘ দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ভোরবেলা। সারা রাত জেগে থেকে যদি আপনি ভোর মিস করেন, তাহলে আপনি অনেক কিছুই মিস করবেন। ভোর ৫টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সবচেয়ে ফ্রেশ মেঘ দেখা যায়। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। মেঘের গায়ে যখন সূর্যের আলো পড়তে শুরু করে তখন অবর্ণনীয় এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। এ সময় প্রতি ১০ মিনিটে একবার করে প্রকৃতির রং বদলে যেতে থাকে। তাই খেয়াল রাখতে হবে সূর্যোদয় দেখা যেন কোনোভাবেই মিস না হয়। শুধু মেঘের গায়ে সূর্যোদয় দেখার জন্যই সাজেক ভ্যালি আসা যায়।

সাজেক ভ্যালি ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
সত্যি বলতে প্রতিটি মৌসুমে সাজেকের আলাদা আলাদা সৌন্দর্য চোখে পড়ে। শীতের সাজেক এক রকম তো বর্ষায় সম্পূর্ণ অন্যরকম। তাই ভ্রমণপিপাসুরা বছরজুড়ে সাজেকে ছুটে যান। তবে বর্ষার শুরু থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত অর্থাৎ মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রকৃতি সবচেয়ে সতেজ থাকে বলে এ সময় সাজেক বেশি সুন্দর। তখন সারা দিন মেঘ ভেসে বেড়ায় এখানে-সেখানে। মেঘ এসে আপনাকে ঢেকে দিতে পারে যখন তখন।
সাজেক ভ্যালি যাওয়ার উপায়
সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলায় হলেও খাগড়াছড়ি থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেক সহজ। তাই দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে খাগড়াছড়ি আসতে হবে। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির প্রধান বাস শান্তি পরিবহন। এ ছাড়া সৌদিয়া, শ্যামলী, ঈগল, হানিফ, ডলফিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস আছে। নন-এসি বাসে ভাড়া ৫২০ টাকা। এসি বাসের মধ্যে রয়েছে শান্তি, হানিফ, ঈগল ও সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাস। এসি বাস ভাড়া ৯৫০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকার গাবতলী, কলাবাগান, ফকিরাপুল ও আরামবাগ থেকে এসব বাস ছাড়ে। লাস্ট বাস রাত ১১টার মধ্যে ছেড়ে যায়। সরকারি ছুটির দিন বা বৃহস্পতিবার-শুক্রবার যেতে চাইলে অগ্রিম টিকিট কেটে রাখলে ঝামেলা এড়ানো যায়। সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ খরচ বাস থেকে শুরু হবে।
খাগড়াছড়ি থেকে জিপে সাজেক ভ্যালি
খাগড়াছড়ির থেকে সাজেক ভ্যালি যাওয়ার জন্য কোনো লোকাল গাড়ি বা শেয়ার্ড জিপ নেই। গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে। এক্ষেত্রে চান্দের গাড়ি অথবা মাহেন্দ্র জিপ প্রধান বাহন। আপ-ডাউন রিজার্ভ জিপ ভাড়া পড়বে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। এক গাড়িতে সর্বোচ্চ ১২ জন বসার অনুমতি আছে। যদি একা বা দুই থেকে তিনজন হন, তাহলে চেষ্টা করবেন অন্য কোনো গ্রুপের সঙ্গে যোগদান করতে। নিজে কোনো গ্রুপ ম্যানেজ করতে না পারলে জিপ সমিতির অফিসে গিয়ে বললেও হবে। তারাই আপনাকে কোনো গ্রুপের সঙ্গে যোগদান করিয়ে দিতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে।
খাগড়াছড়ি থেকে মোটরসাইকেল রিজার্ভ নিয়েও সাজেক ভ্যালি যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আগে থেকে দরদাম করে নিলে ভালো। এ ছাড়া যদি ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি দীঘিনালার বাসে ওঠেন, তাহলে দীঘিনালা থেকেও সাজেকের জিপ পাবেন। খাগড়াছড়ি থেকে জিপে উঠলে সেটাও দীঘিনালা হয়েই যায়। খাগড়াছড়ি থেকে জিপে সাজেক যেতে তিন ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
দীঘিনালার পরের আর্মি ক্যাম্প থেকে আর্মি স্কর্ট দিয়ে প্রত্যেকটা গাড়ি সাজেকে নিয়ে যায়। স্কর্ট ছাড়ে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট এবং দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে। অর্থাৎ সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে ওখানে উপস্থিত থাকতে না পারলে দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের স্কর্টে সাজেক যেতে হবে। দুপুরের স্কর্টেও যদি আর্মি ক্যাম্পে উপস্থিত না থাকতে পারেন, তাহলে ওই দিন আর সাজেক যেতে পারবেন না। পরদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর্মি স্কর্ট বাদে একা কোনো গাড়ির সাজেক যাওয়ার অনুমতি নেই।
রাঙামাটি থেকে সাজেক ভ্রমণ
রাঙামাটি থেকে সাজেক ভ্রমণ করার জন্য সড়ক ও নৌপথে আলাদা রুট আছে। রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে বাঘাইছড়ির লঞ্চ ছাড়ে। যেতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। এ ছাড়া রাঙামাটি বাস টার্মিনাল থেকে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বাস ছাড়ে। ২০০ টাকা ভাড়া ও পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। বাঘাইছড়ি থেকে মোটরসাইকেলে সাজেক যাওয়া যায়। আসা-যাওয়া জনপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তবে সাজেক যেতে চাইলে রাঙামাটি হয়ে না যাওয়াই ভালো। এই পথে গেলে আপনার সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ খরচ বেশি হবে, সময়ও বেশি লাগবে।
সাজেকে থাকার রিসোর্ট
সাজেকে ছোট-বড় মিলিয়ে বিভিন্ন কোয়ালিটির ১০০টির মতো রিসোর্ট রয়েছে। এসব রিসোর্টে সর্বনিম্ন জনপ্রতি ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা ভাড়া পড়বে। শুক্রবার বা সরকারি ছুটিতে যেতে চাইলে কমপক্ষে ১৫-২০ দিন আগে রুম বুকিং করে রাখা ভালো। নইলে ভালো রিসোর্টে রুম পাওয়া যায় না। রিসোর্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রিসোর্টের কোয়ালিটি ও অবস্থানকে প্রাধান্য দিতে হবে। ভিউ খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ সব রিসোর্ট থেকেই কমবেশি ভিউ পাওয়া যায়। রিসোর্ট থেকে বের হলে ভিউ তো আছেই।
রিসোর্টের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিছু রিসোর্ট আছে সাজেকের বাইরে। আবার কিছু রিসোর্ট এমন একটা অবস্থানে যেখান থেকে মূল পয়েন্টে আসতে অনেক বেশি সময় নষ্ট হবে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় রিসোর্টের ভিউ তুলনামূলক ভালো, কিন্তু ইন্টেরিয়র ও ওয়াশরুম বেশ জরাজীর্ণ। তাই রিসোর্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইন্টেরিয়র কোয়ালিটি ও লোকেশনকে প্রাধান্য দিন। সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ খরচ কিছুটা বাড়লেও রিসোর্টের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ না করাই ভালো।
সাজেকে খাওয়ার ব্যবস্থা
সাজেকে খাওয়ার জন্য অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট আছে। এ ছাড়া অনেক রিসোর্টের নিজস্ব খাবার ব্যবস্থা রযেছে। জনপ্রতি প্রতি বেলা খাবার খরচ পড়বে ১২০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। খাবারের মেনু হিসেবে পাবেন ভাত, মুরগি, আলু ভর্তা, সবজি ইত্যাদি। রাতে বারকিউয়ের ব্যবস্থা রয়েছে অনেকগুলো রেস্টুরেন্টে। এ ছাড়া ভালো মানের রিসোর্টগুলোয় নিজস্ব চুলায় বারবিকিউর ব্যবস্থা আছে।
সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ টিপস
শুধু রবি ও এয়ারটেলের নেটওয়ার্ক রয়েছে সাজেক ভ্যালিতে। তাই রবি বা এয়ারটেল সঙ্গে রাখার চেষ্টা করুন।
সাজেকে বিদ্যুৎ নেই। সোলার ও জেনারেটরে পাওয়ার সাপ্লাই করে রিসোর্টগুলো। তাই পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখুন।
সাজেকের যাত্রাপথে জিপের ছাদে উঠবেন না। এটি করতে আর্মির পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আছে। তাছাড়া পাহাড়ি পথে জিপের ছাদে ওঠা বিপজ্জনক।
আদিবাসীদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে অনুমতি নিতে ভুলবেন না। এটা বেসিক ম্যানার।
পাহাড়িদের কালচারের প্রতি সম্মান দেখান। এমন কিছু বলবেন না, যেটি অন্য কেউ আপনাকে বললে আপনারও খারাপ লাগত।
মেহেদী আল মাহমুদ
