ঢাকা ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০, শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪
Khaborer Kagoj

সুদানের নারীদের নিপীড়ন উপেক্ষা করা যাবে না

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:৪৫ এএম
সুদানের নারীদের নিপীড়ন উপেক্ষা করা যাবে না
এলেন জনসন সারল

২০১৯ সালে সুদানের জনগণ যখন রাষ্ট্রপতি ওমর হাসান আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানিয়ে  রাস্তায় নেমেছিল, তখন গণতন্ত্র ও পরিবর্তনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে মহিলারা এগিয়ে এসেছিলেন। যে মহিলারা সুদানে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন, হয়রানি এবং যৌন সহিংসতায় ভুগছিলেন তারাই এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বিক্ষোভে আলা সালাহ নামে এক যুবক গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে শাসকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের যুবকটির কথা কেউ ভুলে যায়নি। বিক্ষোভের ঠিক চার মাস পর প্রেসিডেন্ট আল-বশিরের শাসনের অবসান হয়।

বর্তমানে সুদানের নারীরা সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) এবং আধা-সামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে শুরু হওয়া ভয়ংকর যুদ্ধের কবলে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সুদানে গর্ভবতী নারীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার বেড়েছে এবং ৬ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১ দশমিক ২ মিলিয়নের বেশি মানুষ প্রতিবেশী দেশে পালিয়ে গেছে। তবে পালিয়ে যাওয়া ১০ জনের মধ্যে নয়জনই নারী ও শিশু। সুদানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা একদম ভেঙে পড়েছে। সুদানের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হাসপাতালই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মায়েদের চিকিৎসার জরুরি কোনো ওষুধ নেই বললেই চলে।

সুদানে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মহামারি আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, সুদানে ৪ মিলিয়নেরও বেশি নারী ও মেয়ে যৌন সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আরএসএফ কর্তৃক ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতিগত এবং বর্ণগত বিদ্বেষের কারণেই ধর্ষণ করা হয়েছে।  

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালে পশ্চিম দারফুরের রাজধানী এল-জেনিনায় হামলার সময় আরএসএফ নৃশংস ধর্ষণ এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধ করে। হর্ন অব আফ্রিকার নারীরা আরএসএফ দ্বারা শত শত ঘটনার শিকার হয়েছেন। আরএসএফের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টার সময় অনেক নারী নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়েছে। এমনকি যৌনদাসী হিসেবে তাদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। ২১ বছর বয়সী একজন নারী বলেছিলেন, ‘আমি চার মাসের গর্ভবতী, আমি কতবার ধর্ষিত হয়েছি তা নিজে গণনাও করতে পারব না’।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে, দারফুরের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ) কীভাবে নারীদের অপহরণ করেছে। তাদের অমানবিক, অবমাননাকর ও দাসী অবস্থায় রাখা হয়েছে। মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হয়েছে এবং তাদের জোরপূর্বক বিয়ে করেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ট্রাক এবং গাড়িতে করে নারীদের শিকল বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।  

সুদানের নারীদের শোচনীয় পরিস্থিতি জন্য আঞ্চলিক শক্তির অভিপ্রায়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমি বিচলিত হয়েছি যখন শুনেছি; সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। সুদান সংকটের একজন বিশিষ্ট বিশ্লেষক বলেছেন, আরএসএফের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে। জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, আমরা সুদান যুদ্ধে জড়িত সব দেশকে অপচেষ্টা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছি। সংযুক্ত আরব আমিরাত অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

সুদানে শান্তির জন্য আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক নেতাদের গঠনমূলক ভূমিকা পালন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে এই মুহূর্তে যখন বিশ্বের মনোযোগ অন্যান্য সংকটের দিকে। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তাদের অবশ্যই উপেক্ষা করা উচিত নয়। 

যখন আমাকে লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি যুদ্ধ ও লুণ্ঠনের কারণে প্রায় ধ্বংস হওয়া একটি জাতিকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আমি উপলব্ধি করেছি, একটি দেশকে সমঝোতা ও উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নারীর ক্ষমতায়ন অপরিহার্য। তাই সুদানেও নারীর ক্ষমতায়ন করতে হবে। আমরা সবাই মিলে সেই প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে পারি।

লেখক: সাবেক প্রেসিডেন্ট, লাইবেরিয়া
আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সানজিদ সকাল

ভারতের নির্বাচন, নরেন্দ্র মোদি ও গণমাধ্যম

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ১১:০৫ এএম
ভারতের নির্বাচন, নরেন্দ্র মোদি ও গণমাধ্যম
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

বছরের শুরুতেই উপমহাদেশের তিনটি দেশের নির্বাচন। প্রথম নির্বাচন হয় বাংলাদেশে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ। সেখানে নতুন সরকারও গঠিত হয়েছে। পাকিস্তানের নির্বাচনও শেষ। ভারতবর্ষের নির্বাচন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। এর আগে, অর্থাৎ গত বছর বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে ২৬টি দল একত্রিত হয়েছিল। আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর দুর্নীতির চাপ সৃষ্টি করে ইন্ডিয়া জোটটি একটু একটু করে ভেঙে দেওয়ার কাজ শুরু হয়ে গেছে। 

বিজেপি-আরএসএসের যৌথ উদ্যোগে জোটে বড় মাপের জট পাকিয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী এই জট পাকানোর কাজে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। কারণ তার পক্ষে আরএসএসের কথা না শুনে ভোটে যাওয়া সম্ভব নয় বলে বিজেপিই দাবি করেছে। মোদির সঙ্গে সুর মিলিয়ে মমতাও বলতে শুরু করেছেন, বিরোধীশূন্য করে একাই লড়বেন। কারণ বিজেপি ও আরএসএসের কাছে তার দায়বদ্ধতা প্রচুর। যা থেকে মমতার পক্ষে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

সারা ভারতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিরোধী শরিকদের মত বদল হচ্ছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে মোদিকে শুধু হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে কঠোর সমালোচনাই করছেন না। তিনি মনে করেন, হিটলারের যে দশা হয়েছিল, মোদির সেই একই দশা হবে। হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে খাড়গে আঞ্চলিক দলগুলোকে বলছেন, মনে রাখবেন এই আরএসএস জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল। আর মোদি এবং আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগবত মিলে ভারতের সংবিধান ধ্বংস করে একনায়কতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে গোটা দেশ এখন প্রচণ্ড রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে। 

খাড়গে অভিযোগ করছেন, ১৩ মার্চের আগে নির্বাচনি দিনক্ষণ নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করবে না। কারণ ১৩ মার্চ পর্যন্ত মোদি সারা দেশ ঘুরে নির্বাচনি প্রচার চালাবেন। তার বর্তমান জনসভাগুলোতে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন রামমন্দিরকে। ১৩ তারিখে মোদি ও মোহন ভাগবতের প্রথম দফার প্রচার শেষ হওয়ার পরই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। লোক দেখানো সেই বাধ্যবাধকতার জন্যই নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনকে আগাম সতর্ক করে রেখেছে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র দপ্তর। খাড়গে এবং অন্য বিরোধী নেতারা মনে করেন, এটা মোদির রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদ। সন্ত্রাসবাদকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য বিজেপিবিরোধী ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কংগ্রেসসহ ১৯টি দল। এদিকে কংগ্রেস দিল্লির আঞ্চলিক দল আম-আদমি পার্টি ইতোমধ্যে জোট করেছে সাতটি আসনের গোয়ার দুটি এবং হরিয়ানার একটি আসনে। মমতা গোড়া থেকেই দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে কংগ্রেস জোটে যাওয়া থেকে আটকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। জোট হয়ে গেছে উত্তরপ্রদেশে সাম্যবাদী পার্টির সঙ্গেও। মহারাষ্ট্রে তিনটি আঞ্চলিক দলের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট প্রায় পাকা বলে কংগ্রেস সূত্রে বলা হয়েছে। 

বিজেপি তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় আসবে কি আসবে না, তা জানা যাবে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে। ইতোমধ্যে আরএসএসের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের একটি দ্বীপ সন্দেশখালীর  ঘটনা নিয়ে বিজেপিকে সুর নরম করার নির্দেশ এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন বিজেপিকে এবার ক্ষমতায় আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে  হচ্ছে। ১০ বছর আগে বছরে ২ কোটি লোকের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদি। তা তো রাখেনইনি, উল্টো দিকে ভারতবর্ষের নানা জাতপাতের বিভেদ সৃষ্টির বাতাবরণ এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন, সেটা গোটা দেশের লোক হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের একটি দ্বীপ সন্দেশখালীতে যে ঘটনা চলছে গত ৫০-৫৫ দিন ধরে তা থেকে মমতার বেরিয়ে আসা খুবই কঠিন। তার খুবই ঘনিষ্ঠ শাজাহান শেখ এই এলাকা পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার অপকর্মের শেষ নেই। গ্রামের মেয়েরা বেরিয়ে এসে বলেছেন, রাত ১২টায় ৩০-৩৫ জন মেয়েকে দলের বৈঠকের কথা বলে ডেকে আনা হতো। সেখানে চলত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। গ্রামবাসীর প্রায় সবার জমি কেড়ে নিয়েছিলেন এই শেখ শাহাজান। তার অপকর্মের তালিকা কত বড় তা লিখে শেষ করা যায় না। 

ভারতে সংবিধানের চতুর্থ স্তম্ভ হলো মিডিয়া। মোদি ক্ষমতায় এসে এই চতুর্থ স্তম্ভের ক্ষমতা একেবারে খর্ব করে দিয়েছেন। মমতাও পিছিয়ে নেই। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষায় প্রায় ১১-১২টি টিভি চ্যানেল আছে। বেনামে মমতা নিজেই অন্তত ১০টির মালিক। দুটি বিজেপির হাতে। বামফ্রন্ট বা কংগ্রেসের কোনো নিজস্ব চ্যানেল নেই।  

সারা ভারতে যেসব রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আছে, সেখানেও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বিজেপির দাসানুদাস। ভারতে কীভাবে প্রচার শুরু হয়েছে তা সঠিক জানতে হলে বিবিসি, সিএনএন/বিদেশি টিভি দেখতে হয়। তাই খাগড়ের দল চাইছে, মমতা জোটে ফিরে আসুক। যদি তিনি সত্যি আরএসএস-বিজেপির নীতির বিরোধী হন, তাহলে কালবিলম্ব না করে জোটে ফিরে আসুন। ইন্ডিয়া জোটের শরিক ঝাড়খন্ডের মুখ্যন্ত্রীকে বিডি/সিবিক্স গ্রেপ্তার করেছে। মমতার ভয় সেখানেই। ইতোমধ্যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে সাতবার বিডি তলব করেছে। দিল্লির আম-পার্টির সরকারের মন্ত্রী অতনী শুক্রবারই টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালকে মাদক দুর্নীতির দায়ে দুই দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে। অতনীর আরও দাবি, মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল যদি কংগ্রেস জোট ছেড়ে আসেন, তাহলে তার সব মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। না হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। 

ইন্ডিয়া জোট ভাঙার প্রথম সলতে পাকানো শুরু হয় বিহারে। সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার আসাম জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিজেপির সঙ্গে হাত মেলান। তার বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ আছে। সব মিলিয়ে বিজেপি-আরএসএস আঞ্চলিক দলগুলোকে ব্ল্যাকমেইল করে চলেছে। এই ব্ল্যাকমেইলের ভয় দেখিয়ে বিজেপি বিরোধীদের জোটে আনতে চাইছে। 

এক মাস ধরে দেখা যাচ্ছে মোদি যেখানে যাচ্ছেন তার বক্তৃতায় বলছেন, কংগ্রেসমুক্ত ভারত চাই। ইতোমধ্যে কংগ্রেসের তহবিল সিজ করার জন্য আয়কর বিভাগ কংগ্রেসকে নোটিশ দিয়েছে। মোদির কড়া সমালোচনা করেছিলেন তারই দলের শীর্ষ নেতা সত্যপাল মালিক। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তার বাড়িসহ আটটি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। 

জবাবে সত্যপাল এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, আমি কৃষকের ছেলে। আমি কৃষকদের পক্ষে। আমি মোদি-অমিত শাহের পক্ষে নই। সুতরাং এসব এজেন্সির তল্লাশিকে আমি গুরুত্বই দিচ্ছি না। আমি এখন হাসপাতালে অসুস্থ হয়ে ভর্তি আছি। আগামী তিন-চার মাস ভারতের পক্ষে খুবই কঠিন বলে মনে করছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল। 

লেখক: কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক

মায়ানমার পরিস্থিতি এবং বিএনপির নীতি

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ১১:০২ এএম
মায়ানমার পরিস্থিতি এবং বিএনপির নীতি
মো. সাখাওয়াত হোসেন

যেকোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সঠিকভাবে অনুধাবন করে বক্তব্য দেওয়া উচিত। কেননা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জনগণ রাজনৈতিক বিষয়ে অধিক খোঁজখবর রাখে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে খণ্ডিত করে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। কাজেই কোনো বিষয় সম্পর্কে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা যদি দায়সারা বক্তব্য দেন, তাহলে বক্তব্যের হেতু জনসাধারণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং দলটির জনসমর্থন একটি নির্দিষ্ট সময় পরে তলানিতে নেমে আসে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির জনসমর্থন কমে আসার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে- বিভিন্ন সময়ে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য। বিএনপির বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল হয়, ভাইরাল হয় কেবল বক্তব্যের বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করার ব্যর্থতার জন্যই। সে জন্যই রাজনীতিতে বিএনপির আহ্বানে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সমর্থকরাই কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিটি দলের বিবৃতিদানের আগে যাচাই-বাছাই করে প্রেস রিলিজ দেওয়া উচিত। 

উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত অপরাধের প্ল্যাটফর্ম নির্ধারিত হয়ে থাকে। যেহেতু মায়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘর্ষ চলমান, সে পরিপ্রেক্ষিতে মায়ানমার সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য প্রাণ রক্ষার্থে বাংলাদেশে চলে এসেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নিয়ম মেনে আশ্রয় দিয়েছে এবং সেনাদের ফেরত পাঠাতে যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করছে। উল্লেখ্য, মায়ানমারের অভ্যন্তরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী জনগণ ভয়ে-আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, তথা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে এবং মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরেছে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার বাংলাদেশকে উদ্দেশ করে কিংবা বাংলাদেশকে টার্গেট করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের অবতারণা ঘটেনি, এটি নিরপেক্ষভাবেই বলা যায়। বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে যে বিষয়টি উঠে এসেছে সেটিকে কোনোভাবেই দায়িত্বশীল বক্তব্য বলা যায় না। তাদের উগ্র বক্তব্যে মনে হয়েছে, বাংলাদেশ মায়ানমারের বিরুদ্ধে সরাসরি অ্যাকশনে গিয়ে প্রতিবাদ জানাক। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বশীলরা অত্যন্ত সতকর্তার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ পরিশীলিত উপায়ে কূটনৈতিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে এবং এটিই যুক্তিযুক্ত। 

মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে সীমান্তের ওপার থেকে আসা মর্টার শেলের আঘাতে দুজনের মৃত্যু এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনায় দেশটির রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক পারঙ্গমে যেভাবে প্রতিবাদ জানাতে হয়, বাংলাদেশ সেভাবেই প্রতিবাদ জানিয়েছে। যেকোনো বিষয়ের একটি প্রক্রিয়া থাকে, প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সামনের দিকে পথ চলতে হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম এ বিষয়টিকে সমর্থন করে; উদাহরণস্বরূপ অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো দেশের আকাশসীমা অতিক্রম করার কোনো সুযোগ নেই। কোনো রাষ্ট্র যদি এমনটি করে, তাহলে সেটির বিরুদ্ধে নিয়মমাফিক প্রতিবাদ করতে হয়, পরবর্তী সময়ে আবার নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। বাংলাদেশও ঠিক এমনটিই করেছে, কূটনৈতিক ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সুরাহা না হলে তখন বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং সেটি যৌক্তিকভাবেই হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘মায়ানমারের মতো দেশ আমাদের দেশে গুলি করে হতাহত করে। এসব কিসের আলামত?’ এই বক্তব্যে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট তা হলো- মায়ানমারের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি করে এ দেশের মানুষকে হতাহত করার কৌশল হাতে নিয়েছে। আদতে কি বিষয়টি তাই? মূলত গয়েশ্বর জনতাকে উসকে দেওয়ার মানসেই এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন অপরিপক্ব বক্তব্য মূলত দলটির দৈন্যদশাকে তুলে ধরেছে। বিএনপির এই নেতা বক্তব্যে আরও বলেন, ‘চীনের সঙ্গে এত বন্ধুত্ব, মায়ানমার চীনের লালিত দেশ। সেই দেশ থেকে গুলি আসে- এটা নতুন কোনো খেলা কি না জানি না, আমি বুঝতেছি না। আজকে রাখাইন থেকে সৈনিক পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, এটা কিসের লক্ষণ? আপনারা কি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলবেন? আবার কি বলবেন দেশ বাঁচাতে হবে? আর আপনার কাজ আপনি করবেন?’

আপনারা কি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলবেন? এ ধরনের বক্তব্যের নানা অর্থ রয়েছে। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনোভাবেই যোগসূত্র থাকতে পারে না। এটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে। সে জায়গায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাদের এমন উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ জনগণ সহজভাবে গ্রহণ করেনি। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগ দলটির স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক করে।  

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মায়ানমার যে আমাদের প্রতিবেশী এটা আমাদের ‘চয়েজ’ না। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ রকম একটি রাষ্ট্র আমাদের সীমান্তে রয়েছে, যেখানে বছরের পর বছর সহিংসতা বলবৎ আছে। এটা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করার সুযোগ থাকার কথা নয়। এখন মায়ানমারে যা ঘটছে তা মূলত তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘাত। তার শিকার হচ্ছে কক্সবাজার, বান্দরবান সীমান্ত এলাকার মানুষ। তা ছাড়া মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট দীর্ঘদিনের, জাতিগত দ্বন্দ্ব, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও অন্যান্য কারণে দেশটিতে সংকট লেগেই আছে। বিএনপি এমনভাবে বলছে, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণও বাংলাদেশের বর্তমান সরকার। ব্যাপারটি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো না কোনোভাবে সরকারের বিরোধিতা করতে হবে, কিন্তু এই বিরোধিতা করতে গিয়ে দলটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বিএনপির এ ধরনের হীনম্মন্যতাকে সহজভাবে দেখছেন না। নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির সঙ্গে বিভিন্ন দূতাবাসের একটি যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে সেটিতে ফাটল ধরেছে, অর্থাৎ মহলটি বিএনপিকে ছেড়ে দিয়েছে। কেননা বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে সাংগঠনিকভাবে দাঁড়াতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদেশি রাষ্ট্রের কোনো ইস্যুতে এ ধরনের মন্তব্য করে বিএনপি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। তারা বলছেন, মায়ানমারে যা ঘটছে তা তাদের নিজেদের মধ্যে ঘটছে। সে বিষয়ে বাংলাদেশকে জড়িয়ে যে মন্তব্য বিএনপি করেছে, সেটা তাদের অপরিপক্ব কূটনৈতিক জ্ঞানের পরিচয়। এখানে খামোখা সরকারকে দোষারোপ করার কোনো মানে হয় না। সরকার তার জায়গা থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে, ব্যবস্থা গ্রহণ করছে নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে। বিজিবির মহাপরিচালক জানিয়েছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ধৈর্য ধারণ করে, মানবিক থেকে এবং আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বিজিবি। তিনি তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, অবৈধভাবে আর একজনকেও বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয়রতদের বিষয়ে বিজিবি-প্রধান জানান, তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মায়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি সেই পরিস্থিতিতে বাকি পৃথিবী বাংলাদেশের কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করে। র্যাবের মহাপরিচালকের বক্তব্যের পরবর্তী সময়ে এটাই মনে হয়েছে, অনেকটা আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে মায়ানমার সেনাবাহিনী। বাংলাদেশের ইতিবাচক ও ধীরস্থির পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে এবং বিএনপির বক্তব্যের হেতুও বেরিয়ে এসেছে। বিএনপির উচিত হবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার প্রকৃত উপাখ্যান জেনে পরিপক্ব রাজনীতিবিদের মতো ভূমিকা পালন করা। দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকার আর জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দেয়াল তৈরির কোনো মানে হয় না। কেননা, জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয়, তাদের কোনোভাবেই ভুলভাবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, এ-সংক্রান্তে বিএনপি নেতাদের বোধোদয় যত দ্রুত হবে, তাদের দলের জন্য সেটি ততই মঙ্গল বয়ে আনবে। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বর্তমান প্রেক্ষাপট, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ০৩:০০ পিএম
বর্তমান প্রেক্ষাপট, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
নূর মোহাম্মদ ভূইয়া

বিমা একটি বিশেষায়িত আর্থিক খাত। ১৯৭১ সালের আগে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এ অঞ্চলের বিমা খাত খুবই সমৃদ্ধ ছিল। ফলে ২৩টি বিদেশি বিমা কোম্পানি এ অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনা করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিদেশি কোম্পানি হিসেবে একমাত্র আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে (বর্তমানে মেটলাইফ) ব্যবসা পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার অনুমোদন দেয়।

বিমা খাতকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে সে সময় ব্যবসার প্রকৃতি বিবেচনায় ৪৯টি কোম্পানিকে পরিচালনার জন্য জীবন বিমা করপোরেশন এবং সাধারণ বিমা করপোরেশনের মধ্যে বণ্টন করে দেন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দেশের জীবন বিমা খাতে বিদেশি কোম্পানি হিসেবে আমেরিকান লাইফ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জীবন বিমা করপোরেশন ও সাধারণ বিমা করপোরেশন ব্যবসা পরিচালনা করেছে। ১৯৮৪ সালে বেসরকারি খাতকে অনুমোদন দেওয়ার পর এ পর্যন্ত মোট ৩৪টি লাইফ এবং ৪৫টি নন-লাইফ কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।

২০০৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জীবন বিমার অবস্থা

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জীবন বিমার গ্রস প্রিমিয়ামের (প্রথম বর্ষ + নবায়ন) হিসাবমতে খাতটি ক্রমবর্ধমান বাজার হিসেবে গণ্য ছিল। ২০০৭ সালের ৪ হাজার ৯২৮ থেকে ২০১৯ সালে ৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল বার্ষিক টার্নওভার। ২০২০ বিশ্ববাসী কোভিড-১৯ মহামারিতে আক্রান্ত হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে এবং এই সময়ে বিমাকর্মীরা গ্রাহকের কাছে যেতে না পারায় ২০২০ সালে প্রিমিয়াম সংগ্রহ হয় ৯ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, যা তার আগের বছরের চেয়েও ১২৯ কোটি টাকা কম। তবে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে আবারও টার্নওভার বাড়তে শুরু করে। এর মধ্যে ২০২১ সালে প্রিমিয়াম সংগ্রহ হয় ১০ হাজার ২৩৯ কোটি এবং ২০২২ সালে ১১ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। একইভাবে ২০২৩ সালেও বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে হচ্ছে। 

দেশে জীবন বিমার বাজার

এই খাতে ১৮ বছরের নিচে ও ৫৫ বছরের বেশি বয়সের লোকদের বিমা করা হয় না। তাই ১৮ বছরের নিচে জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ এবং ৫৫ বছরের বেশি বয়সের ১৫ শতাংশ হলে মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ লোক বিমার আওতার বাইরে থাকছে। অন্যদিকে ৫১ শতাংশ লোক বিমা করার যোগ্য। অর্থাৎ প্রায় ১৬ কোটি ৯৮ লাখ জনসংখ্যার ৮ কোটি ৬৬ লাখের জীবন বিমা করার যোগ্যতা রয়েছে। যদি ৮ কোটি ৬৬ লাখ লোকের ১ লাখ টাকার একটি করে বিমা করে বার্ষিক প্রিমিয়াম যদি ৮ হাজার ৩০০ টাকা করে দেয়, তবে জীবন বিমার বাজার দাঁড়াবে ৭১ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকায়। আমাদের বর্তমান জীবন বিমার বাজার হলো ১১ হাজার ৪০১ কোটি টাকার। একাধিক বিতরণ চ্যানেল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, আস্থা ও ভালো মুনাফার অভাবে আমরা ব্যবসায় ভালো করতে পারছি না। এর বিপরীতে সিঙ্গাপুরে মোট জনসংখ্যা ৫৬ লাখ। কিন্তু তাদের বার্ষিক টার্নওভার ৫ লাখ ৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। আমাদের জীবন বিমা বাজারের সমস্যাগুলোর সমাধান করলে ভবিষ্যতে বিমা অনুপ্রবেশ হার বাড়াতে সক্ষম হব।
 
জীবন বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে জীবন বিমায় অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলে খাতটিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। এই চ্যালেঞ্জগুলো হলো পলিসির উচ্চ তামাদি হার; দিনে দিনে দায়ের পরিমাণ বৃদ্ধি কিন্তু নগদ তহবিলের স্বল্পতা; বিমা দাবি পরিশোধে বিলম্ব; ডিজিটালাইজেশনের অভাব; বিমা সচেতনতা; আস্থা এবং যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এবং কম পলিসি বোনাস।

পলিসির উচ্চ তামাদি হার

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২২ সালে দেশে তামাদির পরিমাণ ছিল ৭৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ, প্রায় ৭৫ শতাংশ পলিসি তামাদি হয় দ্বিতীয় বর্ষে। শ্রীলঙ্কায় ৪৫ শতাংশ নিয়ে এই তালিকায় দ্বিতীয় এবং অন্যান্য দেশে এই হার ১০ শতাংশের নিচে। আপনার বাগানে যদি ১০০টি চারা রোপণ করেন, প্রতিটি চারার দাম যদি ১ টাকা হয়, তবে ৭৫টি চারা মরে গেলে ১০০ টাকা থেকে কমে মূলধন দাঁড়াবে ২৫ টাকা। তাহলে বেঁচে থাকা প্রতিটি চারার বর্তমান দাম ১ + ওভারকস্ট ৩ টাকা = ৪ টাকা। প্রতি ১ টাকায় খরচ বাড়ে ৩ টাকা। এভাবে যে যে কোম্পানির তামাদি বেশি, তার ওভারকস্ট দিনের পর দিন বাড়ছে। এই অবস্থার প্রতিকারের জন্য কর্তৃপক্ষ প্রথম বর্ষ কমিশন ১০ শতাংশ কেটে রেখে দ্বিতীয় বর্ষ প্রিমিয়াম এলে দ্বিতীয় বর্ষের কমিশনের সঙ্গে ১০ শতাংশ যোগ করে তামাদির পরিমাণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। 

দাবি পরিশোধে বিলম্ব

২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সব ব্যবসায় আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছে। বিমার খাতও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২০ সালের আগে যদি কোম্পানির নতুন পলিসি সংগ্রহ হয় ১৫ হাজার এবং ম্যাচুরিটি হতো এক হাজার পলিসি। বর্তমানে বাজারের চিত্র বিপরীত হয়েছে। অর্থাৎ এখন ইনকামিং হয় এক হাজারটি এবং আউটগোয়িং হয় ১৫ হাজারটি। এ জন্য আউটগোয়িংয়ের সংখ্যা বাড়ায় বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ২০২০ সাল থেকে বাজারে বিমা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ রিটার্ন শতকরা ১২ টাকা থেকে ৬ টাকায় নিয়ে এসেছে সরকার। এতে সব বিমা কোম্পানির বিনিয়োগ আয় আগের চেয়ে অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিমার ভলিয়ম কমায় বিনিয়োগ আয় অর্ধেক হওয়ায় তামাদির ওপর লোডিং হওয়ায় ডোনেশন ও বিভিন্ন চাঁদা দেওয়ায় বিমা কোম্পানির নগদ তহবিল প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব এবং বিনিয়োগ আয় হ্রাসের ফলে নির্ধারিত সময়ে বিমা পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। প্রকৃতপক্ষে বিমা কোম্পানির পরিচালনা কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার প্রতারণা করছে না। বিশ্বাসভঙ্গেরও কোনো কারণ নেই। কারণ পলিসি গ্রাহকের টাকা নিতে হলে গ্রাহকদের মূল দলিল, আইডি কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন। কোম্পানি গ্রাহকদের চেকে অথবা বিএফটিএনের মাধ্যমে তার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠায়। কোনো গ্রাহক প্রমাণ করতে পারবেন না কোন বিমা কোম্পানির চেয়ারম্যান, পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিমার টাকা উঠিয়ে আত্মসাৎ করছে। একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আয়-ব্যয়ের হ্রাস-বৃদ্ধি থাকতেই পারে। আবার বিলম্বে দাবি নিষ্পত্তি করার বিধান বিমা আইনে স্পষ্ট আছে। আবার কোনো গ্রাহক দাবি পেতে কোনো প্রকার অসুবিধা হলে বা কোনো বিরোধ দেখা দিলে আইডিআরএর কাছে অভিযোগ করলে কর্তৃপক্ষ এর প্রতিকার করে। আবার ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের অধীনে বিমা একটা চুক্তি এবং এ বিমায় চুক্তির সব উপাদান বিদ্যমান। বিমা আইনের ১৪০ ধারার বিধান অনুযায়ী, আইডিআরএর লিখিত প্রতিবেদন ব্যতীত কোনো মামলা করা যায় না। অথচ কিছুসংখ্যক গ্রাহক চুক্তি আইনের অধীনে চুক্তিভঙ্গের উপাদানগুলোকে বিবেচনায় না নিয়ে বা বিমা আইনের তোয়াক্কা না করে কোম্পানির বিরুদ্ধে ৪২০/৪০৬ ধারায় ফৌজদারি মামলা করে। বিমা গ্রাহক যেন অন্যের প্ররোচনায় কিংবা নেতিবাচক অভিপ্রায় নিয়ে চুক্তির বিষয় গোপন করে ব্যক্তিগতভাবে কারও নামে প্রতারণার মামলা না করতে পারে, সে বিষয়ে অনুশাসন দেওয়ার জন্য আইডিআরএর মাধ্যমে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাই।

বর্তমানে আইডিআরএর করণীয় কী

পলিসি হোল্ডার ফান্ড ও শেয়ারহোল্ডার ফান্ডকে পৃথক করার জন্য বিধি প্রণয়ন করা; ইসলামি তাকাফুল বিমার বিধি প্রণয়ন করা; গ্রাহকের জমা টাকার নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করা; আইডিআরএর থেকে সব অ্যাকচুরিয়াল সার্ভিস প্রোভাইড করা; দিনের পর দিন পলিসি বোনাস কমে যাওয়ায় গ্রান্টেড বোনাস পলিসি, ব্যাংক অ্যাস্যুরেন্স প্রোডাক্ট ডিজাইন করে প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়ার ব্যবস্থা করা; আইডিআরএর মাধ্যমে কোর প্রিন্সিপাল অনুশীলনের ব্যবস্থা করা; দ্রুত বিমা দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করা; সব কোম্পানি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের পরিমাণ অনুমোদিত সীমার মধ্যে রেখে কোম্পানি পরিচালনা করার ব্যবস্থা নেওয়া; ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বিমা গ্রাহকদের মোট দায়ের সঙ্গে বিনিয়োগের পরিমাণ আছে কি না, তা নিবিড়ভাবে তদারকির ব্যবস্থা করা এবং বিমা কোম্পানিগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

ব্যাংকাস্যুরেন্স

বিমা কোম্পানি তাদের পণ্য বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের বিতরণ চ্যানেল ব্যবহার করে। এর মধ্যে ব্যাংকাস্যুরেন্স ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল উল্লেখযোগ্য। ব্যাংকের একজন নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা থাকবেন। তিনি বিমা কোম্পানির একজন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে বিমা পণ্যগুলো ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছে বা যেকোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করবেন। বিমার পলিসি বিক্রির জন্য কোম্পানি ব্যাংকে আইডিআরএ কর্তৃক নির্ধারিত কমিশন দেবে। এতে ব্যাংক ও বিমা কোম্পানি উভয়ই লাভবান হবে। ব্যাংক শুধু সেবা দিয়ে অধিক আয় করতে পারবে এবং তাদের গ্রাহকদের কাছে বিমার সুবিধা দিয়ে তাদের ব্যাংকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। ব্যাংক গ্রাহকের মৃত্যুতে মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত টাকা দিতে পারত না, কিন্তু বিমার মাধ্যমে তা পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে মোট ব্যবসায় সিঙ্গাপুরের অবদান ৩৫ শতাংশ। 

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৩-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে কর্মরত ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫০৬ জন কর্মকর্তা। যদি তাদের প্রত্যেককে ১৫ বছর মেয়াদে মাত্র ২ লাখ টাকার একটা জীবন বিমা দেওয়া হয়, তাহলে বার্ষিক প্রিমিয়াম আসবে প্রায় ৩৩১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

ব্যানবেইসের তথ্যমতে, দেশে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫৫ জন শিক্ষক আছেন। বর্তমানে শিক্ষকদের সরকার শতভাগ বেতন দেয়। প্রত্যেক শিক্ষককে যদি গড়ে ৩ লাখ টাকার একটা বিমা দেওয়া হয়, তাহলে ১৫ বছর মেয়াদে বার্ষিক প্রিমিয়াম দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। 

পকেট ডায়েরির তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালে আমাদের দেশে প্রতি হাজারে ১৮ শতাংশ পুরুষ ও নারী বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এতে বার্ষিক জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ লাখ ৫৬ হাজার জনে। আমাদের দেশে মুসলিম নীতি অনুযায়ী বিয়ের মোহরানা দিতে হয়। যদি কোনো ছেলে বিয়ে করে ছেলের পক্ষের জন্য মেয়ের বাবা ঘড়ি, টিভি, ফ্রিজ, আংটি, খাবারসহ অন্যান্য সব খরচ নগদে বহন করে। যখন বিয়ে পড়াতে যায়, তখন দেনমোহর ধার্য করে কিছু টাকা অলংকারের সঙ্গে উশুল করে অবিশষ্ট টাকা বাকি রাখা হয়। এই মোহরানার অর্থ আদায় করতে প্রত্যেকটি সংশ্লিষ্ট আদালতে অসংখ্য মা-বোনকে বছরের পর বছর আদালতের আঙিনায় দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। যদি মোহরানা টাকা মোহরানা বিমায় বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়, তবে মা জাতিও বাকির হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং সরকার অনেক টাকার রাজস্ব পাবে ও দেশের নগদপ্রবাহ ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

সিইও, পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স লি.

স্বাস্থ্য বীমা হোক বাধ্যতামূলক

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ১২:৫৪ পিএম
স্বাস্থ্য বীমা হোক বাধ্যতামূলক
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (সাবেক- আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতাল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী। দেশের চিকিৎসা সংকট, ডাক্তার রোগীর সম্পর্কের বিষয়, চিকিৎসা ব্যবস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনার নানা দিক নিয়ে কথা বলে গণমাধ্যমে বেশ প্রশংসা পেয়েছেন ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী। সমাজে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্যও খ্যাতি রয়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার জন্য অনেক কারণ রয়েছে। এর একটা হচ্ছে মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচার। যখন কোনো একটা ঘটনা ঘটে, সারা পৃথিবীতেই কিন্তু এমন ঘটনা ঘটছে। কোনো রোগী যখন মারা যায়, হতে পারে সড়ক দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে নিতে নিতে বা হাসপাতালে নেওয়ার পর রোগী মারা গেল। কিন্তু মিডিয়া যদি তখন নিউজ করে ‘ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু’ তখন খুব নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে এদেশের স্বাস্থ্য খাত পিছিয়ে যায়।

কোনো গ্রামের হাসপাতালেও যদি কোনো ঘটনা ঘটে- অনেক ক্ষেত্রে সেটা দিয়েই গণমাধ্যম দেশের সব হাসপাতালগুলোকে এমনকি পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তুলনা করে থাকে। যা কাম্য নয়। ফলে সাধারণ জনগণের এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়।

আপনারা বিষয়টির খুব গভীরে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রকৃত সত্যটি তুলে আনার চেষ্টা করুন। এতে যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

এদেশে স্বাস্থ্য খাতে মানুষের কোনো বাজেট নাই। আমরা ঈদে- পূজায় বাজেট রাখি। রমজানে বাজেট রাখি। পোশাক কেনার জন্য বাজেট রাখি। কিন্তু চিকিৎসার জন্য কোনো বাজেট নাই। যখনই কেউ ডায়াবেটিস, প্রেসার বা কিডনি ফেইলিওর হয়ে যায় বা আইসিইউতে ভর্তি হয় তখন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কারণ চিকিৎসার টাকা নাই। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা একদম ফাঁকা জায়গায় আছে। প্রচলিত যে বীমা সচরাচর সব জায়গায় দেখা যায় সেটা হলো লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতসহ সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য বীমা চালু আছে। সেখানে এলআইসি চালু করেছে কার্ডিয়াক প্রিমিয়াম। বছরে একবার ৩ হাজার ৯শ নিরানব্বই রুপী দেবে। বিনিময়ে যদি তার বুকে ব্যথা হয়, হার্টে রিং পরানো হয়, হার্ট সার্জারি লাগে সবকিছু ফ্রি দেওয়া হয়। কেন? কারণ, অনেক মানুষ এটি করছে। ফলে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন রোগী।

এদেশে ষোলো কোটির অধিক মানুষ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যদি কাজে লাগানো যায় অল্প প্রিমিয়াম দিয়ে বিশাল ফান্ড করা সম্ভব। কোনো রোগী যদি জানে আড়াই লাখ টাকার বাইপাস সার্জারিতে তিনি শুধু ওষুধ খরচ ৫০ হাজার টাকা দিলেই হবে এবং বার্ষিক ৫ হাজার টাকার প্রিমিয়াম দিলে হবে তাহলে সবাই এ বীমা করতে উৎসাহী হবে।

রোগী আর চিকিৎসকের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে সেটির অন্যতম কারণ পকেট থেকে নগদ টাকা খরচ করে চিকিৎসা করা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কিন্তু মেডিকেল বীমার মাধ্যমে চিকিৎসা খরচ পরিশোধ করা যায়। আমাদের দেশেও এটিকে বাধ্যতামূলক করা হোক। খুব উপকার পাবে সাধারণ মানুষ। ভারতের পিছিয়ে থাকা রাজ্য ত্রিপুরাতেও মানুষ এই স্বাস্থ্য বীমার সুফল ভোগ করছে। আরেকটি বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তার যত মেগা প্রজেক্ট আছে, তারা পিপিপির আওতায় হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দেশের ১০০টি বেসরকারি হাসপাতালকেও যদি পিপিপির আওতায় আনা যায় তাহলে পিপিপি আমাদের ফান্ডিং করে বলে দেবে, চিকিৎসার খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে। এতে সরকারি হাতপাতালের ওপর চাপ কমবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও নিরাপদ হয়ে যাবে। অর্থাৎ পিপিপি স্বাস্থ্যখাতের অস্থিরতা দূর করতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। 

ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল

কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ১১:২০ এএম
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি
মো. সাহাবুদ্দিন

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষের যে ঐক্য, সাহস এবং ধৈর্য দেখেছি, তা যেন এখন ইতিহাস হয়েই থাকছে। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। লাখো শহিদের আত্মত্যাগ, কোটি মানুষের সম্পদ এবং মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা বিশ্বে বাঙালিদের মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।

উনসত্তরের (১৯৬৯ খ্রি.) গণ-আন্দোলন দেখেছি। তখন আমি কলেজের ছাত্র, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি। গণ-আন্দোলনের মুখে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো পাকিস্তানের সামরিক শাসক। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি ফুঁসে উঠল। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ হয়ে আন্দোলনের ঢেউ লাগে স্কুল পর্যায়ে। পাকিস্তানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আমরা মিছিলে যেতাম বড় ভাইদের আহ্বানে।

পাকিস্তান জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের প্রচারে আমরা ছাত্ররা অংশ নিই। বক্তৃতা ভালোই দিতে পারতাম। এ কারণে অগ্রজ নেতারা বিভিন্ন স্থানে আমাদের নিয়ে যেতেন জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। জনসভার শুরুতে বক্তৃতা দিয়ে আমি আসর গরম করতাম। সমগ্র জেলা চষে বেড়াতাম আহমেদ রফিক, আমি, আব্দুস সাত্তার লালু, রফিকুল ইসলাম বকুল, ফজলুল হক মন্টু, পাকনসহ কয়েকজন। ছাত্র-যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে দিন-রাত কাজ করতাম। নাওয়া-খাওয়া অনেক দিন হতোই না। চিড়া-গুড়-মুড়িতেই সারা দিন চলে যেত। এখনকার মতো তখন যোগাযোগব্যবস্থা ভালো ছিল না। কখনো হেঁটে, ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বা নৌকায় যাতায়াত করতে হতো। নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছিল গভীর সখ্য এবং আন্তরিকতা। অগ্রজদের সম্মান করত অনুজরা। আমরা বড়দের আদেশ-নির্দেশ বিনা বাক্যে মাথা পেতে নিতাম।

১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সব প্রার্থী জয়লাভ করলেন। বৃহত্তর পাবনা জেলার (পাবনা ও সিরাজগঞ্জ) সব জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের ২৮৮টিতে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। আমরা ছাত্র-জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলাম রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ বসবে। কিন্তু ক্রমশই আমাদের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। বুঝলাম, পাকিস্তানিরা সহজে বাঙালির হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করতে লাগল পাকিস্তানের নেতারা। ওরা ঢাকা-চট্টগ্রামে সৈন্য সমাবেশ করাসহ সারা দেশে সৈন্য প্রেরণ করে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে লাগল। অবস্থা দেখে মনে হলো পাকিস্তানিরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অধীর আগ্রহ এবং শঙ্কায় অপেক্ষা করতে হলো সবাইকে।  

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিলেন। তখন আমি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। আহ্বান জানালেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার। ওই দিন আমরা কয়েক বন্ধু বসে ছিলাম রেডিওতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শোনার জন্য। কিন্তু ভাষণের পরিবর্তে রেডিওতে গান বাজানো হচ্ছিল। পরে জানা গেল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো হবে না। পরদিন সকালে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর রেকর্ডকৃত ভাষণ রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বান মোতাবেক আমরা প্রস্তুত হতে শুরু করি। প্রতিদিন শহরে মিছিল হতো, আমরা কজন থাকতাম মিছিলের অগ্রভাগে। আমাদের স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’ ইত্যাদি। পুরোনো পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে ছাত্র-যুবক-কৃষক-জনতা ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে জড়ো হলো। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর আমজাদ হোসেন, আমিনুল ইসলাম বাদশা, প্রসাদ রায়, মাহবুবুল হক ওরফে ফেরু দেওয়ান, রণেশ মৈত্র, আব্দুর রব বগা মিয়ার তত্ত্বাবধানে পাবনা জেলা স্কুলের হেড মাওলানা কসিম উদ্দিন শরীরিক এবং মানসিক প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন। আমি যেহেতু রাইফেলস ক্লাবের সদস্য ছিলাম, আমরা রাইফেলস ক্লাবের কয়েক সদস্য মাওলানা কসিম উদ্দিনের সহকারীর দায়িত্ব পালন করতাম। জাতীয় পরিষদের নবনির্বাচিত সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেন নাটোর থেকে পাবনা ফেরার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা একজন বিজ্ঞ দেশদরদি নেতাকে হারালাম। 

২৫ মার্চের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী পাবনায় অবস্থান নেয়। হানাদার বাহিনী শহরের পুরোনো টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবন এবং বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থান নেয়। আমরাও প্রস্তুতি নিই। জেলা প্রশাসক নূরুল কাদির খানের সঙ্গে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। পুলিশের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার থেকে আমাদের অস্ত্র সরবরাহ করা হলো। এ সময় নকশালপন্থিরাও অস্ত্রের দাবি করলে তাদের সঙ্গে বিরোধ হয়। এখানে উল্লেখ্য, নকশালপন্থিদের সঙ্গে ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই পাবনায় দ্বন্দ্ব ছিল আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের। মার্চের শেষ সপ্তাহের দিকে পাবনায় অবস্থান নেওয়া প্রায় ৫০ জন পাকিস্তানি সৈন্য আমাদের হাতে নিহত হয়। দিনভর যুদ্ধ হয় পুরোনো টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবন এলাকায়। হাজার হাজার জনতা দেশীয় অস্ত্রসহ পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘিরে রাখে এবং মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আকাশ-পাতাল প্রকম্পিত করে রাখে। হানাদার সৈন্যদের মনোবল ভেঙে যায়। 

এভাবে ১০ দিন পাবনা শত্রুমুক্ত থাকে। এরপর শহরে বিমান থেকে পাকিস্তানি বাহিনী গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আমরা নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিই। ছাত্র-জনতা, কয়েকজন ইপিআর সদস্য পুলিশের সঙ্গে নগরবাড়ী ঘাটে অবস্থান নেয়। ৯ এপ্রিল হানাদার বাহিনী জল, স্থল এবং আকাশপথে আমাদের অবস্থান বা বাঙ্কারের ওপর গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করে। আমাদের কাছে ছিল হালকা অস্ত্র। পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী মেশিনগানের গুলি, শেল নিক্ষেপ এবং ওপর থেকে বিমানের গুলিবর্ষণে আমরা টিকে থাকতে পারছিলাম না। আমরা আমাদের কমান্ডারের নির্দেশে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিই। হানাদার পাকসেনারা আরিচা ঘাট থেকে গোলাবর্ষণ করতে করতে ফেরি, লঞ্চ এবং নৌকায় যমুনা নদী পার হয়ে পাবনার খাঁপুর হাইস্কুলের মাঠে জড়ো হয়। সেখান থেকে তারা বিমানবাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় অগ্রসর হয়। অগ্রসর হওয়ার সময় হানাদাররা সড়কপথের দুই ধারের বাড়িঘর, দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করে। নগরবাড়ী থেকে কাশিনাথপুর হয়ে আহম্মদপুর, বনগ্রাম, চিনাখড়া, আতাইকুলা, পুষ্পপাড়া বাজারসহ সড়কের উভয় পাশের বাড়িঘর পুড়িয়ে পাবনা শহরে প্রবেশ করে বিকেল বেলা। হানাদার সৈন্যরা এ সময় গানপাউডার ব্যবহার করে। যেখানে যে অবস্থায় যাকে পেয়েছে গুলি করে হত্যা করেছে। দৃষ্টির মধ্যে পড়া কৃষককে গুলি করে হত্যা করেছে। অনেক কৃষক খেতে কাজ করা অবস্থায় গুলিতে নিহত হন। অনেক গবাদিপশু মারা যায় পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে। 

আমরা পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হই। আমাদের দলে ছিলেন ভাষাসৈনিক আমিনুল ইসলাম বাদশা, রবিউল ইসলাম রবি, রফিকুল ইসলাম বকুল, ইকবাল হোসেন, শিরিন বানু মিতিল, আবুল কালাম আজাদ বাবুসহ ১০ জন। নৌকায় পদ্মা এবং গড়াই নদী অতিক্রম করে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-মিরপুর হয়ে শিকারপুর-প্রাগপুর হয়ে ১১ এপ্রিল কেচুয়াডাঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যোগ দিই। ১৬ এপ্রিল রাতে আমরা জানতে পারি ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (পরে নামকরণ হয় মুজিবনগর) অস্থায়ী সরকার গঠন করা হবে। পাবনার জেলা প্রশাসক নূরুল কাদির খান, রফিকুল ইসলাম বকুল, মোহাম্মদ ইকবাল এবং আমি মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমরা শ্রদ্ধেয় এম মনসুর আলীর সঙ্গে ছিলাম সার্বক্ষণিক। মুজিবনগরের আম্রকাননে আমাদের সঙ্গে নূরুল কাদির খান সাহেব পরিচয় করিয়ে দেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম এবং ড. আহসাবুল হক এমপির সঙ্গে। শপথ গ্রহণ শেষে ভারতীয় এবং বিদেশি সাংবাদিকদের যানবাহনের বহরে একটি জিপে আমরা কজন কলকাতায় ফিরে যাই। সেখান থেকে পরদিন আমরা চলে যাই কেচুয়াডাঙ্গা ক্যাম্পে।  

কেচুয়াডাঙ্গা ক্যাম্পে আমাদের প্রশিক্ষণ দেন পুলিশের আরআই আবুল খায়ের। উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য সহযোগীদের পাঠনো হলো ভারতের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে। আমাকে কেচুয়াডাঙ্গা যুব ক্যাম্পে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বন্ধু মুক্তার হোসেনকে দেওয়া হয় রেশন দ্রব্যাদি সংরক্ষণের দায়িত্ব। এ সময়ই আমরা কজন ছাত্রনেতা ভারতের নেতাদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য বিশেষ করে অস্ত্রের জন্য কলকাতায় যাই। কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে একদল ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবক আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে গেলেন। আমি আমার সহযাত্রীদের পক্ষে সাংবাদিকদের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার বর্ণনা দিলাম। তখন ভারতে লাখ লাখ শরণার্থী প্রবেশ করছে। বানের পানির মতো শরণার্থীর স্রোত। কলকাতায় সাক্ষাৎ হয় এম মনসুর আলীর ছেলে আমাদের অগ্রজ নেতা মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে। কয়েক দিন কলকাতায় থাকার পর মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে বিভিন্ন যুব ক্যাম্পের পরিস্থিতি দেখার জন্য রওনা হই। বিভিন্ন যুব কাম্পে আমরা যুবকদের মনোবল চাঙা রাখার জন্য কথা বলতাম। দেশের অভ্যন্তরের খবর অনেক যুবকই জানতেন না। তারা ভারতে গমন করেছেন মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে। কিন্তু তাদের মন ছিল ভারাক্রান্ত। কারণ তারা তাদের বাড়িঘর এবং স্বজনদের রেখে গেছেন। স্বজনরা কে কেমন আছে- এই ছিল তাদের চিন্তা। বাড়িঘর পাকিস্তানি হানাদাররা পুড়িয়ে দিয়েছে, অনেকের বাবা-মা, ভাইবোনকে হত্যা করেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণরত যুবকরা ছিলেন শোকাহত। কিন্তু তাদের ছিল দুরন্ত সাহস। মোহাম্মদ নাসিম এবং আমি তাদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দিতাম। যুবকদের তখন বেশ উজ্জীবিত হতে দেখেছি। দেশমাতৃকার জন্য তাদের কষ্ট এবং ত্যাগের কথা কখনো ভুলব না। প্রশিক্ষণরত যোদ্ধারা অস্বস্তিতে থাকলেও যুদ্ধের সময় চরম সাহসিকতা, ধৈর্য ও মনোবল স্বাধীনতাকামীদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মধ্য অক্টোবরে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যুদ্ধকালীন যুব কমান্ড নেতা তোফায়েল আহমেদের কাছ থেকে অস্ত্র গ্রহণ করার পর সেখানে আমাদের বিদায় দেন বেবী ইসলাম (কয়েক দিন পর তিনিও আমাদের দলে যোগ দেন)। মোহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে প্রাগপুর সীমান্ত অতিক্রম করে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা হয়ে পাবনা শহরের পশ্চিম দিকের পদ্মার আফতাবনগর চর এবং চরগড়গড়িতে অবস্থান নিই। সেখানে আমরা রফিকুল ইসলাম বকুলের নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিই। কিন্তু প্রথমেই আমরা বাধার সম্মুখীন হই। সেই পুরোনো শত্রু তখনো আমাদের পিছু ছাড়েনি। চরসানিরদিয়ারে অবস্থানরত নকশালরা মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি টের পেয়ে আমাদের ক্যাম্পের দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। আমরাও পাল্টা গুলি করতে থাকি। নকশালদের সঙ্গে যোগ দেয় পাকিস্তানি মিলিশিয়া বাহিনী। সারা রাত যুদ্ধ চলে। আমাদের অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধারা সামান্য গোলাবারুদ দিয়েই তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে। পরে পাকিস্তানি সৈন্যরা নকশালদের সঙ্গে যোগ দেয় ভারী অস্ত্র নিয়ে। তখন আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। আমরা নিরাপদ স্থানে ঈশ্বরদীর দাদাপুর চরে চলে যাই। এই যুদ্ধে শহিদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ। যুদ্ধে নকশালদের দুজন নিহত হন। তার মধ্যে একজন ছিলেন টিপু বিশ্বাসের ভাই। ওই যুদ্ধে রফিকুল ইসলাম বকুল, মোহাম্মদ ইকবাল ছাড়াও অংশ নেন ফজলুল হক মন্টু, বেবী ইসলাম, ইসমত হোসেন, আবুল কালাম আজাদ বাবু, মকবুল হোসেন সন্টু, হাবিবুর রহমান হাবিব, শাহাদত হোসেন সন্টু, জহুরুল ইসলাম বিশু, অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, সেলিম, মোহন, সোটকা, রুকু, জিন্নাহ, রাজ্জাক, পাকন, শরীফ, শহিদুল্লাহ প্রমুখ সাহসী যোদ্ধা।

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমাদের পাবনাবাসীকে তথা মুক্তিযোদ্ধাদের একাধারে তিন শত্রুকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রথমত, চীনপন্থি বা মাওবাদী নকশালদের, তারপর হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের এবং মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীদের। 

গেরিলা যুদ্ধের কৌশল হিসেবে আমরা আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করি। রফিকুল ইসলাম বকুল এবং জহুরুল ইসলাম বিশু একটি গ্রুপ নিয়ে সুজানগর এলাকায় অবস্থান নেন। এরপর আমি চলে যাই কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের কার্যালয়ে। থিয়েটার রোডের কার্যালয়ে আমরা আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতাম। কাজের মধ্যে অন্যতম ছিল অতিথিদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করা। বিশেষ করে বিদেশি সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরের পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং তাদের সঙ্গে শরণার্থীদের কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া। এর বাইরেও আমরা কজন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতাম। কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা।
 
ডিসেম্বরের ৩ তারিখ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কলকাতা শহরে ব্ল্যাক আউট। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী এবং বিবিসি রেডিওতে আমরা পাকিস্তানিদের পরাজয়ের খবর শুনে ক্যাম্পে বসে উল্লাস করি। ঢাকার দিকে মিত্র সেনাদের অগ্রযাত্রা। যশোর ক্যান্টনমেন্টের পতন। আমি কলকাতা থেকে ১৪ ডিসেম্বর কেচুয়াডাঙ্গা যাই। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে। ১৭ ডিসেম্বর আমরা প্রস্তুতি নিলাম এবং ১৮ ডিসেম্বর কেচুয়াডাঙ্গা ক্যাম্প গুটিয়ে একটি ট্রাক ভরে তাঁবু, তৈজসপত্র, কম্বল, মশারির স্ট্যান্ডসহ যাবতীয় দ্রব্য নিয়ে পাবনা ফিরলাম। ওই সব দ্রব্য পাবনা জেলা স্কুলের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে রফিকুল ইসলাম বকুল এবং মোহাম্মদ ইকবালের কাছে হস্তান্তর করি। পরে সেগুলো পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের (বর্তমান ক্যাডেট কলেজ) ভারতীয় সেনাদের ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়।   
 
লেখক
রাষ্ট্রপতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
(অনুলিখন: হাবিবুর রহমান স্বপন)
[email protected]