ঢাকা ৬ বৈশাখ ১৪৩১, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

সড়ক চলাচলে শিশুর নিরাপত্তা

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:৩০ এএম
সড়ক চলাচলে শিশুর নিরাপত্তা
জেরিন আফরোজ

বিশ্বজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনা মৃত্যুর একটি অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার প্রকাশিত ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩’-এর তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ নিহত হয় সড়ক দুর্ঘটনায় এবং ৫-২৯ বছর বয়সের মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশেও এই চিত্র ভিন্ন নয়। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানীর শিকার হচ্ছে বিভিন্ন পেশাজীবী ও বয়সের মানুষ। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও কম নয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত বছর (২০২৩) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার ৫২৪, যেখানে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১২৮, যা মোট নিহতের ১৭ শতাংশের বেশি। 

গবেষণায় দেখা যায়, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নির্মাণ, অসতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পারাপার, অনিয়ন্ত্রতি গতিতে গাড়ি চালনা, ফুটপাথ ও ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা এবং বেশির ভাগ যানবাহনে শিশুদের জন্য নির্ধারিত ও উপযুক্ত বসার স্থান না থাকায় শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেকোনো দুর্ঘটনায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর অনেক শিশুই চিকিৎসার সুযোগ পায় না। ফলে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা বাড়ছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুমৃত্যুর হার কমাতে চাই শিশুদের জন্য উপোযোগী আসন। শিশু আসনটি এমন একটি আসন যা দুর্ঘটনার সময় বিশেষভাবে শিশুদের সুরক্ষা করে। 

বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা ২০১০ সাল থেকে ৫ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সড়কে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য সরকারের অন্যান্য অনেক পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২’। এই আইন প্রণয়ন করা হলেও এখনো পর্যন্ত সড়কে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান আইনে পরিবহন ব্যাবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে যেমন- সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য পাঁচটি আচরণগত ঝুঁকি যথা: ১. গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ না করা, ২. সিট বেল্ট ব্যবহার না করা, ৩. মানসম্মত হেলমেট পরিধান না করা, ৪. মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং ৫. শিশুবান্ধব বিশেষায়িত আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থাগুলো উল্লেখ না থাকায় আইনটি কার্যকর ফলাফল আনতে পারছে না। সুতরাং, সড়কে মৃত্যুহার কমাতে উপরোক্ত আচরণগত ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে একটি সম্পূর্ণ পৃথক আইন প্রয়োজন। 

বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা জনসাধারণের ভিতরে এমন আতঙ্ক তৈরি করেছে যে, কোনো দরকারি কাজে ঘরের বাইরে বের হয়ে নিরাপদে পৌঁছানো একটি উদ্বেগের বিষয়। দুর্ঘটনার সময় বাবা কিংবা মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে অনেক শিশু আহত এবং নিহত হয়। তাই পরিবারের সঙ্গে শিশুর ভ্রমণকালে শিশু নিরাপত্তা একটি জরুরি বিষয়। ভ্রমণকালে শিশু যদি একটি নিরাপদ শিশু আসন ব্যবহারের মাধ্যমে অবস্থান করে তাহলে দুর্ঘটনায় ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পেতে পারে। তাই যানবাহনে শিশু আসন খুবই জরুরি। শিশু আসনের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের করলে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ২৭ ডিসেম্বর, ২০২২ গেজেট আকারে প্রকাশিত বিধিমালায় শিশুদের জন্য যানবাহনে সিটবেল্ট বাঁধার নির্দেশনা থাকলেও শিশু আসনের বিষয়টি বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই সড়কে দর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন একটি সম্পূর্ণ পৃথক আইন যেখানে জাতিসংঘ ঘোষিত সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ অন্তর্ভুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি।

সড়কে পথচারীদের নিরাপত্তায় একটি সম্পূর্ণ পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণোয়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার ও নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। একটি সুন্দর, স্বাভাবিক, নিরাপদ পরিবেশ শিশুর বিকাশকে করে তরান্বিত এবং তাকে দেশের কল্যাণকর হয়ে উঠতে সাহায্য করে। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনায় শিশুর প্রাণনাশ হলে, তার ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে তাদের চলাচল হওয়া উচিত নিরাপদ। এই নিরাপত্তার জন্যই যানবাহনে শিশু আসন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দরকার গাড়িচালক ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা। তাই সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু প্রাণনাশ রক্ষায় নতুন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। 

লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (পলিসি), রোড সেইফটি প্রকল্প, স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন
[email protected]

ক্ষমতাবানদের অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতাহীনদের অসহায়ত্ব সমাজজুড়ে

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০৯ এএম
ক্ষমতাবানদের অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতাহীনদের অসহায়ত্ব সমাজজুড়ে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

পাকিস্তানি হানাদাররা যেসব জঘন্য অপরাধ করে গেছে, সেগুলোর অনেক সাক্ষীর একটি হচ্ছে যুদ্ধশিশুরা। এদের অনেকেরই স্থান হয়েছে এতিমখানায়, কেউ প্রাণ হারিয়েছে পথেঘাটে পরিত্যক্ত অবস্থায়; যাদের কপাল ভালো তারা আশ্রয় পেয়েছে বিদেশে, পালক পিতামাতার গৃহে। ১৫ জন এতিম গিয়েছিল কানাডায়, তাদের নিয়ে একটি বই লিখেছেন কানাডা অভিবাসী বাঙালি গবেষক ও সমাজকর্মী মোস্তাফা চৌধুরী। বইটির নাম দিয়েছেন ‘আনকনডিশনাল লাভ, এ স্টোরি অব এডপশন অব নাইনটিন সেভেনটিওয়ান ওয়ার বেবিজ’। বইতে ওই ১৫ জনের সবার কথাই আছে। এদের ভেতর পাঁচজন একবার বাংলাদেশে এসেছিল, নিজেদের মাতৃভূমির সন্ধানে।

পাঁচজন এতিম শিশুর একজন ছিল বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। হারিয়ে যাওয়া মায়ের কথা ভেবে সে সর্বদাই দুঃখভারাক্রান্ত থাকত। গোপনে কাঁদত। মেয়েটি আবার কবিতাও লিখত। বাংলাদেশে এসে বিশেষভাবে সে নদী দেখেছে, বুড়িগঙ্গায় নৌকায় বসে সে ভেবেছে এই দেশের কোথাও না কোথাও তার দুঃখিনী মা লুকিয়ে আছেন, যে নাকি তাকে তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই পরিত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কানাডায় ফিরে গিয়ে মেয়েটি ছোট্ট একটি কবিতা লিখেছিল। নাম দিয়েছিল ‘চাইল্ড অব দ্য রিভার্স’। বাংলাদেশকে সে নদীমাতৃক বলে জানে। সে কথাটি আছে তার কবিতায়। আছে তার নিজের মায়ের কথাও। বলেছে সে, ‘মা তুমি আমাকে তোমার বুকে রাখতে পারোনি, ছেড়ে দিয়েছিলে, যখন আমি ছোট্টটি ছিলাম। তোমার কথা ভেবে আমি খুব কেঁদেছি এবং আমার সে বেদনা শেষ হবে না যতক্ষণ না আমি তোমাকে খুঁজে পাই, তোমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরি নিজের বুকের ভেতরে।’

মেয়েটির বাংলা নাম রানি; পারিবারিক পদবি মোরাল। রানি মোরালের বিদেশি বাবা-মা অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ। মোরালদের নিজেদের একটি সন্তান আছে, তবু তারা আগ্রহের সঙ্গে পালক নিয়েছেন বাংলাদেশের এতিম একটি শিশুকে এবং তাকে আপন সন্তানের মতোই মমতা ও যত্নে লালন-পালন করেছেন। কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করেও রানিকে তারা বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না, শেষ পর্যন্ত। সঙ্গ দেওয়ার জন্য রানির সঙ্গে তারাও বাংলাদেশে এসেছিলেন। আশা করেছিলেন জন্মভূমি খুঁজে পেয়ে রানি তার বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু যা ঘটেছে তা ঠিক তার উল্টো। বাংলাদেশ দেখার পর ২৬ বছর বয়সী রানির যন্ত্রণা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সহ্য করতে পারেনি। অল্পদিন পরে সে নিজের হাতে নিজের জীবনের অবসান ঘটিয়েছে। অনুমান করি, বাংলাদেশের অবস্থা দেখে তার শেষ ভরসাটুকু তার জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। আঁকড়ে ধরার মতো আর কোনো অবলম্বনই তার জন্য অবশিষ্ট ছিল না।

মাতৃহারা যে পাঁচজন মাতৃভূমির খোঁজে বাংলাদেশে এসেছিল তাদের ভেতর রায়ান নামের ছেলেটি ছিল ভিন্ন ধরনের। টগবগ করত সে আশায়। এসেছিল সম্ভব হলে মায়ের দেশে থেকেই যাবে, এই রকমের একটা গোপন ইচ্ছা নিয়ে। এখানে ছিলও সে বছরখানেক। তার আসার খবরটা জানাজানি হয়ে যায়। মিডিয়া তাকে নিয়ে বেশ খানিকটা হইচই করে। যুদ্ধশিশুর প্রথম বাংলাদেশে আগমন! ব্যাপার সামান্য নয়। রায়ান দেখেছে, শুনেছে, ঘুরে বেড়িয়েছে। লোকের সঙ্গে মিশেছে। কিন্তু অচিরেই তার ভেতর একটা হতাশা দানা বেঁধে ওঠে। হতাশা নিয়েই ফিরেছে সে কানাডায়। তবে আত্মহত্যা করেনি।

বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় কানাডার আপনজনদের সঙ্গে রায়ান নিয়মিত পত্র যোগাযোগ করত, ই-মেইলে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাত। ঢাকার রাস্তায় একদিন শোনে বোমার আওয়াজ, দেখতে পায় আতঙ্কগ্রস্ত একটি মেয়ে প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে। পরে শুনেছে সে যে, নারী হয়রানি ও ধর্ষণ বাংলাদেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। খবরের কাগজে প্রতিনিয়ত আসে সেসব খবর।

কানাডার বাবা-মাকে সে একবার যা লিখেছিল বাংলায় অনুবাদ করলে সেটা এ রকম দাঁড়ায়- ‘বাংলাদেশ মনে হয় একটা সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে পড়েছে। সুড়ঙ্গটা অন্ধকার। এর শেষ মাথা দেখা যায় না। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ধরনটা পিরামিডের মতো। এর নিচের দিকে রয়েছে তরুণরা। এই তরুণরা অচিরেই বড় হবে; বড় হয়ে দেখবে যে তাদের স্থান সংকুলানের জন্য কোনো সামাজিক উদ্যোগ নেই। কাজ নেই, সুযোগ নেই, বাস্তবিক অর্থে কোনো অবকাশও নেই। বিশ্বায়িত এমন একটি বাংলাদেশে তারা বেড়ে উঠবে, যেখানে কেবল টিভি ও আমদানি করা অন্যান্য সামগ্রী খুবই ব্যস্ত থাকবে; শুধু ব্যস্ত নয়, থাকবে অত্যধিক পরিমাণে ব্যস্ত।’

রায়ান এটা লিখেছিল ১৯৯৮ সালে। আমরা ধারণা করি, বাংলাদেশে সে আর ফিরে আসেনি। একদিন তার মা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, অনতিক্রম্য এক বিপদে পড়ে। তা নিয়ে রায়ানের মনে দুঃখ ও গ্লানি থাকার কথা। কিন্তু এটা খুবই সম্ভব যে, বাংলাদেশে আসার পর সে নিজেই তার মাতৃভূমি থেকে পলায়ন করেছে, প্রাণভয়ে। নইলে হয়তো তার অবস্থাও তার সমবয়স্ক ও ভগ্নিসম রানির মতোই হতো। রায়ানের জন্য সুযোগ আছে। কানাডা আছে। সে পালাতে পারে। যাদের জন্য কোনো সুযোগ নেই, তাদের অনেকেই চেষ্টায় থাকে পালানোর সুযোগ তৈরি করার। সুযোগ তৈরি না করতে পারলে ভীষণ হতাশ হয়। বিত্তবান পিতা-মাতা বৈদেশিক আশ্রয়ের এক রকমের ব্যবস্থা করেই রাখেন। সন্তানদের জন্য, নিজেদের জন্যও।

হতাশ যুবক রায়ানের ১৯৯৮ সালের অভিজ্ঞতার পর একে একে ২৫ বছর কেটে গেছে। না, অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরঞ্চ অবনতিই ঘটেছে। আমাদের জন্য সমষ্টিগত সুড়ঙ্গবাসের অবসান ঘটেনি। অন্ধকার এখন আরও গাঢ়, ভবিষ্যৎ এখন অধিকতর অনিশ্চিত। ইতোমধ্যে যা বৃদ্ধি পেয়েছে তা হলো সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা।

দেশের অর্থনীতিকে চাঙা রেখেছেন কৃষিজীবীরা। সেই কৃষক ভূমি থেকে উৎখাত হচ্ছে এবং বিকল্প কাজ পাচ্ছে না। রামপালে, বাঁশখালীতে তাদের ভূমি চলে গেছে। প্রতিরোধ সম্ভব হয়নি। প্রকৃতি ভয়ংকরভাবে বিপন্ন। সুন্দরবনকে তো মনে হয় শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হবে না। কারণ তার ওপর মুনাফালোভীদের চোখ পড়েছে। প্রাকৃতিক ওই বনটি আত্মহত্যা করবে না, সে শক্তি তার নেই; কিন্তু রানির হারানো মায়ের মতোই দুঃখ নিয়ে সে একদিন হারিয়ে যাবে। বুড়িগঙ্গা নদীকে দেখে রানি তার নিজের মায়ের কথা ভেবেছে, ভেবে কাতর হয়েছে। কেঁদেছে। রানি আজ বেঁচে নেই, যদি বেঁচে থাকত এবং বুড়িগঙ্গার খোঁজ করত, তবে দেখতে পেত নদীটি আর নেই, মরে গেছে। একটা নয়, অনেক নদীই এখন মরা। বড় বড় নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, উজানের ভারত পানি ছাড়ছে না বলে। মৃত্যুর আগে রানি দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছে, নদীর মরণদৃশ্য তার যন্ত্রণা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিত। সাভারে রানা প্লাজা ধ্বংস হওয়ায় একসঙ্গে ১ হাজার ১৩৫ জন শ্রমিক মারা গিয়েছিল এবং তাতে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কারখানার মালিকের কোনো দোষ দেখতে পাননি, ভবনটির পিলার ধরে অলৌকিক হস্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ঝাঁকুনি দেওয়াকে শনাক্ত করেছেন। বিশ্ব কাঁপানো ওই মাপের মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনার সংবাদ পেলে রানির যন্ত্রণা কতটা বাড়ত তা আমরা অনুমান করতে পারব না। রানি যদি ভাবত যে, নিহত শ্রমিকদের মধ্যে তার দুঃখিনী মা-ও আছেন, তাহলে তাকে সান্ত্বনা দিত কে? রানি সংবেদনশীল মানুষ, অন্যদের কষ্ট না দিয়ে নিজেই চলে গেছে, বক্ষভেদী দুঃখ বহন করে।

যুদ্ধশিশুরা বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনোপচনীয় গ্লানির ও দুঃসহ দুঃখের কারণ। বাংলাদেশ যে তার মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি, সে ব্যর্থতার ক্ষতিপূরণ কোথায়? আর অন্য সব শিশু? তাদের কী অবস্থা? কেমন আছে তারা? তাদের জন্য খেলার মাঠ কোথায়? চলাফেরার জায়গা কোনখানে? ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা জন্মের পরই উৎপাটিত হয় পরিবেশ, প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে। এমনকি মাতৃভাষা থেকেও। গরিব ঘরের শিশুরা শিকার হয় অপুষ্টির, পাচার হয়ে যায় বিদেশে, বাধ্য হয় অমানবিক শ্রমে। শিশু হত্যা বাড়ছে। শিশুর ওপর যৌন হয়রানি ঘটছে। ভাড়াটের শিশুটি কাঁদছে দেখে বিরক্ত হয়ে বাড়িওয়ালার গিন্নি তাকে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলছে; এমন ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে ধরে নিলে ভুল হবে। এটি হলো ক্ষমতাবানদের অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতাহীনদের অসহায়ত্ব এবং সমাজজুড়ে প্রবহমান হিংস্রতারই উন্মোচন।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

উপজেলা নির্বাচন: আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে অস্বস্তি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০৪ এএম
উপজেলা নির্বাচন: আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে অস্বস্তি
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

বিএনপি উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এখনো স্পষ্ট বিভ্রান্তি বিদ্যমান। দলীয় প্রতীকে যেহেতু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না, সেহেতু নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে বিএনপি অটল থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের অবস্থান কী হবে, এ বিষয়ে এখনো অস্পষ্টতায় রয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা। অন্যদিকে সাধারণ জনগণের মনেও একধরনের ধূম্রজাল রয়েছে। স্বতন্ত্রভাবে দলের কেউ নির্বাচন করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, নাকি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নেবে, তা নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। যে কারণে অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে দলের অভ্যন্তরে। দীর্ঘদিন থেকে আমরা লক্ষ করেছি, বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং নেতৃত্ব-সংকটে দলের সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে সব সময়ই প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে এই দলটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও অনেকটা হারিয়ে ফেলেছে বলে অনুমান করা যায়। 

উপজেলা নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিএনপির অনকেই মনে করেন, তারা যেহেতু কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে নেই, সেহেতু নেতা-কর্মীদের সক্রিয় এবং ঐক্যবদ্ধ রাখতে কৌশলে হলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া এ কথাও সত্য যে, অসংখ্য নেতা-কর্মীকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা এই মুহূর্তে বিএনপির জন্য কঠিন হবে।

গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের সিদ্ধান্তকেও অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও চায় বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। উল্লেখ্য, প্রথম ধাপের ১৫০টি উপজেলা নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার পর বিএনপি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীও সিদ্ধান্ত বদল করেছে। দলটির আগের অবস্থান ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে ভোটে অংশ নেওয়ার। ঘোষণা না দিয়ে যেসব উপজেলায় জয়ের সম্ভাবনা আছে, সেখানে দলের নেতারা স্থানীয়ভাবে প্রার্থী হবেন। অনেকে গণসংযোগও শুরু করেছেন। সারা দেশে অসংখ্য নেতা-কর্মী পোস্টার-ব্যানার এবং প্রত্যক্ষ জনসংযোগের মাধ্যমে মাঠে রয়েছেন। উল্লেখ্য, জামায়াত বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা বললেও দলটির নেতারা গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, উপনির্বাচনে অংশ নেন। দুটি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াত নেতা জয়ীও হয়েছেন। উপজেলা নির্বাচন দলীয়ভাবে হলেও এবার দলীয় প্রতীক দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। এ কারণে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই অসংখ্য প্রার্থী নির্বাচনে থাকছেন। একইভাবে বিএনপি-জামায়াত থেকেও প্রার্থী থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেও বলে দেওয়া হয়েছে যে, আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নির্বাচনগুলো আর দলীয়ভাবে হবে না। যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে দলের নেতারা ভোট করতে পারবেন। এ কারণে এখন দলের ভেতরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হবে। যিনি প্রকৃত জনপ্রিয় তিনিই নির্বাচিত হয়ে আসতে পারবেন। সেটি আওয়ামী লীগ হোক আর বিএনপি হোক। 

২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হয়। বিএনপি ২০২১ সালের মার্চের পর থেকে সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। এর আগেও সিটি করপোরেশন নির্বাচন বা ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। তা সত্ত্বেও দলটির তৃণমূলের অনেক নেতা সেসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে দেড় শতাধিক প্রার্থী বিজয়ীও হয়েছেন।

এ কথা সত্য যে, দীর্ঘদিন যে দলটি নির্বাচনের বাইরে রয়েছে, সেই দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে নির্বাচনে গিয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এর মাধ্যমেই তাদের জনপ্রিয়তা তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের তৃণমূলের অনেক নেতার এলাকায় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে থাকবে। ফলে বিএনপির অনেক নেতার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আর যদি উপজেলা নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করে তাহলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যেই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। যেমনটি আমরা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ করেছি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে সবার মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, কেন্দ্রে নাম পাঠানোর সময় স্বজনপ্রীতি, স্থানীয় রাজনীতিতে গ্রুপিং, লবিং, বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনের মাঠে না থাকা এবং দলের চেইন অব কমান্ডের সংকটের ফলে এখন সবাই রাজনীতিতে নিজ নিজ অবস্থানে শক্ত ভূমিকায় থাকছে। ইদানীং আরেকটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে, উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীরা দলের প্রভাবশালী নেতাদের কাছে আসছেন এবং তাদের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মাঠে বিএনপি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ এমন প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চোখে পড়ার মতো আকার ধারণ করেছে। 

এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা যায়, যেসব আওয়ামী লীগার দীর্ঘদিন নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট করেছেন, তাদের জনসম্পৃক্ততা কমে যাওয়ায় তারা এখন কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারীরাই সরকারের নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন মূল দলের নিবেদিতদের তুলনায়। এসব কারণে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। দলের নেতা-কর্মীদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশে কিছুটা উদ্বেগ-উত্তেজনা, ক্ষোভ এবং নানাবিধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছে। সরকারের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই এমন পরিস্থিতির সূত্রপাত এবং তা মোকাবিলার বিষয়ে চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
 
এ কথা বলার অবকাশ নেই যে, সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে রয়েছে। সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতি, কার্যক্রম এবং অর্জন আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি প্রমাণ করছে বারবার। তবে একদিকে যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, অন্যদিকে নিজেদের যথাযথভাবে মজবুত করতে না পারার দীর্ঘশ্বাসও প্রায়ই লক্ষ করা যাচ্ছে। দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সচেতন মহলকেও যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে। সংগত কারণেই আগামী দিনগুলোতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠে নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর শঙ্কা তৈরি করেছে। এ জন্য এই মুহূর্তে সাংগঠনিক ভিত্তি অটুট রাখতে দলের ভেতরে একটি সুস্পষ্ট চেইন অব কমান্ড তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। 

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
E-mail: [email protected]

ভারতের নির্বাচন ঘিরে নানা জল্পনা

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ১১:১৩ এএম
ভারতের নির্বাচন ঘিরে নানা জল্পনা
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

সারা পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় যখন নির্বাচন হয়, তখনই দেখা যায় একদল লোক বেরিয়ে আসে। তারা সমীক্ষা করে কোন দল ক্ষমতায় আসবে। ভারতবর্ষের চলতি লোকসভা নির্বাচনে অনেক আগেই ফলাফল বলে দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতার শেষ নেই। জ্যোতিষী থেকে শুরু করে সবাই প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছেন।

বর্তমান নির্বাচনে ভারতবর্ষে কী ফলাফল হবে, তা নিয়ে চর্চার শেষ নেই। মোদি সরকার এবং আরএসএস দাবি করছে, ৫৪৩টির মধ্যে তারা ৪০০টির বেশি আসন পাবে। তাহলেই বর্তমান সংবিধানকে তুলে দিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র কায়েম করা সম্ভব হবে। রামরাজত্ব কায়েম করা সহজ এবং সরল হবে।

তারা প্রকাশ্যেই বলছেন, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল। সেই ভুল সংশোধন করার জন্য চাই একটি হিন্দুরাষ্ট্র। সেই পথে তারা দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। সম্প্রতি দিল্লির সবচেয়ে বড় ইংরেজি টিভি চ্যানেল সাবেক তিনজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেছিল।

আলোচ্য বিষয় ছিল নির্বাচন কি অবাধ ও সুষ্ঠু হবে? তিনজনই উত্তর দিয়েছেন, যে পদ্ধতিতে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার ভারতের লোকসভা ভোট সম্পন্ন করতে চলেছেন, তা সঠিক পথ নয়। বিরোধী দলগুলোকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ৪০-৪৫ ডিগ্রি পারদের মধ্যে দাঁড়িয়ে যেসব বক্তব্য রাখছেন, তা ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অশোক লাভাসা, পিরাওয়াত ও গোপালস্বামী।

তাদের মতে, আগের নির্বাচনগুলোয় যেসব পদ্ধতি চালু ছিল, ১৯৫০ সালের ভারতের জনপ্রতিনিধি আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। তখন বিজেপিও সেসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। চলতি নির্বাচনে বর্তমান তিন সদস্যের কমিশন একতরফাভাবে সরকারের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন, কংগ্রেস বা অন্যান্য বিরোধী দল সম্পর্কে শাসক দল কুকথা, অশ্লীল কথা বলছে। তারা নির্বাচন কমিশনে গেলেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। অথচ বিরোধীরা কুকথা উচ্চারণ করা মাত্রই শোকজ করা হচ্ছে।

দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারপ্রধান সোনিয়া গান্ধীকে কটাক্ষ করে বলেন, কংগ্রেস ভারতে ইতালিয়ান সংস্কৃতি চালু করেছে। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে কোনো কোনো মহল থেকে দাবি উঠেছিল, সোনিয়াকেই প্রধানমন্ত্রী করা হোক। তখন বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজের নেতৃত্বে সংসদ ঘিরে রাখার ডাক দেয় বিজেপি। সারা দেশে সোনিয়াবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়।

সোনিয়া গান্ধীর অপরাধ: নির্বাচনে জেতা, ইতালিতে জন্মগ্রহণ করা এবং রাজীব গান্ধীকে বিয়ে করা। এ ব্যাপারে বিজেপি সে সময় সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিল। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছিলেন, সোনিয়া প্রকৃতপক্ষেই ভারতের নাগরিক।

১৯৯৭-৯৯ সালে সোনিয়া ছিলেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তির পর কংগ্রেসের বর্তমান সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লেখেন সোনিয়াকে বিদেশি বলে অপমান করার জন্য। কমিশন এখন পর্যন্ত সেই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি।

বিজেপির স্লোগান- এবার ৪০০ পার। অর্থাৎ ৫৪৩ আসনের মধ্যে যদি তারা ৪০০ আসন পায়, তাহলে সংবিধান সংশোধন করে রামরাজত্ব কায়েম করার পরিকল্পনা আরএসএসের আছে। এটা গোপন কিছু নয়। এ কথা তারা জনসভাগুলোয়ও বলে বেড়াচ্ছে।

সরকারপ্রধান দুই নেতা প্রধানমন্ত্রী এরং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গলা ফাটিয়ে প্রচার করছেন, তারা ক্ষমতায় এসে গেছেন। সিএএ, এনআরসিসহ যা যা তাদের পরিকল্পনায় আছে, সব এবার বাস্তবায়িত হবে। অন্যদিকে দোসর মোহন ভাগবত নিজেও প্রচারে নেমে একই ধরনের বক্তব্য দেন। ভাগবত এখন প্রায়ই কলকাতা আসছেন। তিনি প্রকাশ্যে এবং পরোক্ষে বলে থাকেন, পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কিছু বলা যাবে না। তাকে আমাদের দরকার। মোহন ভাগবতের এই মনোভাবের সঙ্গে একমত নয় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। বরং তারা এ ব্যাপারে আরএসএসের ওপর খানিকটা ক্ষুব্ধও।

মোহন ভাগবত স্থানীয় বিজেপিকে নির্দেশ দিয়েছেন, নির্বাচনি প্রচারে মমতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা চলবে না।

উত্তর কলকাতার শোভাবাজারে কেশব ভবনে আরএসএসের সদর দপ্তর। সাবেক ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্যপাল তথাগত রায় আরএসএস ও রাজ্য বিজেপির মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করে থাকেন। তিনি বিজেপি নেতাদের বোঝান, কেন্দ্রে বিজেপির ক্ষমতায় থাকতে হলে তৃণমূলকে ঘাঁটানো চলবে না। এই মমতা দিদিই ৯৭-৯৯ সালে বিজেপিকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিলেন।

অন্যদিকে দিদিও বারবার বলছেন, আরএসএস একটি শৃঙ্খলাপরায়ণ সংগঠন। বিজেপির গোপন সূত্রে বলাবলি শুরু হয়ে গেছে, মমতাকে আমাদের দরকার। সে জন্যই কংগ্রেস এবং বামদের নির্বাচনে অবশ্যই পরাজিত করতে হবে, এমনটাই মোহন ভাগবতের নির্দেশ।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস সরাসরি সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে, বিজেপি-তৃণমূল সেটিরও হয়ে গেছে বহু আগেই। এরা পরস্পর পরস্পরকে গালমন্দ করলেও দিল্লিতে বিজেপিকে সরকারে বসানোর ব্যাপারে মমতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঈদের নামাজে গিয়েও মমতা একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি সংখ্যালঘুদের পাশে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী পাঁচবার কলকাতায় নির্বাচনি প্রচারে এসেছিলেন। তিনি তৃণমূল নেতাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করলেও মমতা বা তার ভাইপো সম্পর্কে টুঁ-শব্দটিও করেননি। তাই বাম-কংগ্রেসের সেটিং-তত্ত্ব একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এটাই এখন সবার আলোচ্য বিষয়। মোদি সরকার ইতোমধ্যে INDIA জোটের দুই মুখ্যমন্ত্রীকে জেলে পুরেছে। একজন ঝাড়খন্ডের হেমন্ত সোয়েন এবং অপরজন দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল। মমতার মন্ত্রিসভার দুজন মন্ত্রীও এখন জেলে।

দেশের বাঘা বাঘা পর্যালোচকের বক্তব্য, দেশে যা ঘটছে তা শতভাগ সংবিধান এবং গণতন্ত্রবিরোধী। তা মেনে নেওয়া যায় না। অনেকের ধারণা, শেষ পর্যন্ত মোদি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তৃণমূলের যে নেতারা জেলে আছেন তাদেরও ছাড়া হবে না নির্বাচন পর্যন্ত। ১৯ এপ্রিল শুরু, সাত দফায় ১ জুন ভোট শেষ। শেষ কথা কারা বলবেন তা বোঝা যাবে ৪ জুন। বিজেপি এখন পর্যন্ত নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেনি। যে হারে পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতি হয়েছে, তা এক ঐতিহাসিক ঘটনা বলে রাজনীতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

সামাজিক অপরাধের পরিসীমা বিস্তৃত হচ্ছে

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০৭ এএম
সামাজিক অপরাধের পরিসীমা বিস্তৃত হচ্ছে
মো. সাখাওয়াত হোসেন

মিস্টার রহমান সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে শহরে ২-৩ শতাংশ জায়গা কিনে একটি বাড়ি বানানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। জমির রেজিস্ট্রি পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু জমি দখল করতে গিয়ে তিনি বেকায়দায় পড়লেন। এলাকার উঠতি বয়সী ছেলেরা এসে বাধা দিল, তারা মহল্লায় নতুন একজনকে জমি দখল করতে দেবে না। উপায়ান্তর না দেখে এলাকার একজন রাজনৈতিক নেতার মধ্যস্থতায় তিনি ছেলেদের সঙ্গে কথা বললেন। রাজনৈতিক নেতার ভাষ্য ছিল, ছেলেদের খুশি করে জায়গা দখলে নিয়ে নিন এবং এটাই এখন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাধ্য হয়ে রহমান সাহেব ছেলেদের ভালো অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে জমি দখলে নেন। পরিস্থিতি এবং বাস্তবতার মিশেলে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ না হয়ে প্রচলিত নিয়মেই উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করেন। 

একটি প্রতিষ্ঠিত ডেভেলপার কোম্পানি বিভাগীয় শহরে ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমি ক্রয় করে এবং নিয়মমাফিক জমি দখলও করে। কিন্তু জমি পাইলিং করার সময় বিপত্তি দেখা দেয়। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে মালিকপক্ষের কাছে হুমকি আসতে শুরু করে এবং কয়েকটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ এসে কাজ বন্ধ করতে বাধার সৃষ্টি করে। পরবর্তী সময়ে একই কায়দায় (পূর্বে উল্লিখিত) মালিকপক্ষকে মধ্যস্থতা করতে হয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে। এই প্রভাবশালীরা কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, সরকার পরিবর্তিত হলেও তাদের প্রভাবের কোনো পরিবর্তন হয় না। এই প্রভাবশালীরা মেকানিজম করে সর্বসময় আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করে। বড় বড় শহরে যারা ফ্ল্যাট ব্যবসার কাজে যুক্ত, তারা নির্মাণকাজ শুরুর আগেই প্রভাবশালীদের খুশি করেই কাজ শুরু করে থাকে। এই যে প্রভাবশালীদের খুশি করতে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করতে হয়, সেই খরচের রেশ কিন্তু সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বর্তায়, ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যায়। উল্লিখিত দুটি ঘটনাই সামাজিক অপরাধের প্রকৃষ্ট উদাহরণ এবং এ ধরনের অসংখ্য সামাজিক অপরাধের চিত্র সমাজব্যবস্থায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে এবং সমাজ ক্রমান্বয়ে আরও পরিবর্তিত হবে। সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে পরিবর্তনশীলতা। এই পরিবর্তনশীলতাকে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কেননা পৃথিবী প্রতিনিয়ত অগ্রগামী এবং অগ্রগামী পৃথিবীর ধারায় আলোকিত ও কল্যাণকর পৃথিবী নির্মাণে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে ভবিষ্যতের স্বার্থে। সে জায়গায় যদি সমাজকে সঠিকভাবে বিনির্মাণে ব্যর্থ হতে হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কের শেষ থাকবে না। বাংলাদেশে শহর এবং গ্রামে উভয় জায়গাতেই সামাজিক অপরাধের প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সামাজিক অপরাধের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি সমাজ নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। কাঠামোবদ্ধ সমাজই মূলত একটি সমাজকে স্থিতিশীল ও ইতিবাচক গতির মধ্যে রাখে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতির মধ্য দিয়ে যখন সমাজ সামনের দিকে অগ্রসর হয়, চলমান থাকে সেটি প্রকৃত অর্থে কাঠামোবদ্ধ সমাজের নিদর্শন। কাঠামোবদ্ধ সমাজের ধারাকে নস্যাৎ করার প্রক্রিয়া থেকেই সমাজবিরোধী অপকর্মগুলো সাম্প্রতিক সময়কালে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

সমাজকে স্থিতিশীল রাখার তাগিদেই সমাজের মধ্যে সমাজসৃষ্ট অনুশাসন, রীতিনীতি ও নিয়মকানুনের চর্চা অব্যাহত থাকে। এ চর্চাগুলো নানাবিধ কারণে অনুপস্থিত রয়েছে সমাজে। যে সুযোগটিকে কাজে লাগায় উঠতি বয়সী তরুণরা এবং এ তরুণদের নানাভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে সমাজে প্রতিষ্ঠিত একটি মহল। শহরাঞ্চলে বহু আগেই সমাজ কাঠামোর পঠিত চর্চা অনুপস্থিত এবং গ্রামাঞ্চলে যৎসামান্য আকারে যতটুকু উপস্থিত ছিল সেটিও কালক্রমে বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থানের কারণেই মূলত সামাজিক অপরাধের পরিসীমা বিস্তৃত হচ্ছে। সামাজিক অপরাধ মূলত সেসব অপরাধ যা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত অপরাধ নয়, কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধ। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত অপরাধে যাদের সংযুক্ততা পাওয়া যায় পরবর্তী সময়ে এ শ্রেণিটিই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত অপরাধ কাঠামোতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর আবহ সৃষ্টি করে থাকে। 

Douglas and Waksler, সমাজচ্যুত আচরণগুলোকে একটি চিমনির (ফানেল) মধ্যে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কারও আচরণ ভুল, অদ্ভুত এবং আশ্চর্য মনে হলে; কারও আচরণ অপছন্দ এবং অরুচির মনে হলে; কেউ মূল্যবোধ এবং নিয়মরীতির ব্যত্যয় ঘটালে; কারও দ্বারা নৈতিক মূল্যবোধ ও নৈতিক নিয়মের ব্যত্যয় হলে; নৈতিক বিচারের মানদণ্ডে কেউ মূল্যবোধ এবং নিয়মরীতির ব্যত্যয় ঘটালে; নৈতিক বিচারে নৈতিক মূল্যবোধ ও নৈতিক নিয়মের ব্যত্যয় হলে; মন্দ আচরণের মাধ্যমে আইনের ব্যত্যয় হলে; আইনকে পাশ কাটিয়ে গুরুতর অপরাধ সম্পন্ন করলে; ব্যক্তিত্বের মধ্যে মানবিক আচরণ অনুপস্থিত থাকা এবং সর্বশেষ কৃতকর্ম প্রকৃত অর্থেই অশুভ হলে উল্লিখিত বিষয়বাদি সমাজচ্যুত আচরণের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের সমাজচ্যুত আচরণ যাদের চরিত্রে উপস্থিত তাদের মাধ্যমেই সামাজিক অপরাধ সংঘটন সম্ভব এবং সামাজিক অপরাধের প্রবণতা থেকেই মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় আইন ভাঙার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।  

শহরে পরিবেশগত নিরাপদ ব্যবস্থার কারণে অনেক স্থানেই অপরাধের হারও স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে, তবে কিছু কিছু জায়গায় বিশেষ করে বস্তি ও তৎসংলগ্ন এলাকা, ভাসমান এলাকা, নদীবিধৌত এলাকা, শ্রমজীবী ও কর্মজীবীদের আবাসস্থল প্রভূত এলাকা ও অঞ্চলে সামাজিক অপরাধের ব্যাপকতা মারাত্মকভাবে পরিলক্ষিত হয়। গ্রামাঞ্চলে কার্ড খেলার নাম করে জুয়া খেলা, ক্যারম বোর্ডে জুয়ার আসর বসানো, বাজি ধরে দাবা খেলাসহ অপ্রদর্শিত সামাজিক নিয়মের ব্যত্যয় দেখা যায় সর্বস্ব। সমাজ যে কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সুদীর্ঘকাল ধরে সেটির ব্যত্যয়ের কারণেই সামাজিক অপরাধ পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে। সমাজে একটি শৃঙ্খলা বজায় ছিল সব সময়, যেখানে সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্বে থাকতেন। কিন্তু কালের পরিবর্তনে শৃঙ্খল কাঠামোর বিপরীত আমরা একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছি। সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের সমাজ পরিচালনায় এখন আর দেখা যায় না। কেননা সমাজের শৃঙ্খল পরিস্থিতিকে ভাঙার কারণেই মূলত গণ্যমান্য ও সম্মানিতরা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এমনও সময় ছিল পুরো ইউনিয়ন থেকে কোনো অভিযোগ নিকটস্থ থানায় দায়ের করা হতো না। তার মানে কি ওই ইউনিয়নে অনিয়ম বা অন্যায় সংঘটিত হতো না? অবশ্যই হতো কিন্তু সমাজের নিয়মকানুনের দায়বদ্ধতার কারণেই মূলত সামাজিক বিচারেই সমস্যাগুলো নিষ্পত্তি হয়ে যেত। বিচারে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষের সুবিধা-অসুবিধা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো, যাতে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষই লাভবান হয়। বর্তমান সমাজে এ শৃঙ্খল ব্যবস্থা অনেক সমাজেই বিলীন হয়ে গেছে, সামান্য একটি ঘটনা ঘটলে থানা-আদালত পর্যন্ত গড়ায় অভিযোগ হিসেবে। 

সামাজিক শৃঙ্খলব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সারা দেশে কিশোর অপরাধের ব্যাপকতা দেখা যাচ্ছে। স্কুল-কলেজে দেখা যায়, ছেলেরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাইরে পিয়ার গ্রুপের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে অনিয়মের চর্চা করছে। আমাদের সমাজেই স্কুল চলাকালীন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাইরে আড্ডা দিয়ে সময় কাটানো একসময় অসম্ভব ছিল। কিন্তু সমাজ পরিবর্তিত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা সমাজবিরোধী অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিশোর অপরাধে সম্পৃক্ত হচ্ছে। অভিভাবকরাও এ বিষয়ে উদাসীন, স্কুল ফাঁকি দেওয়ায় তারা কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরা আদৌ শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে? হয়তো পরীক্ষার ফলাফল ভালো করার ক্ষেত্রে তাদের একটি ভূমিকা রয়েছে। কোচিং সেন্টারে শৃঙ্খলার ব্যাপারটি অনুপস্থিত থাকে। কেননা শিক্ষার্থীরা মনে করে এখানে তারা টাকা দিয়ে সেবা গ্রহণ করছে। তৎপ্রেক্ষিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার শৃঙ্খলার যে বন্ধন সেটি পুরোপুরি রকমের অনুপস্থিত থাকে এবং শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। 

পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, ইভ টিজিং, সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট, ব্ল্যাকমেলিং, বুলিং ইত্যাদি রকমের অপকর্ম স্কুলশিক্ষার্থীদের দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত শিক্ষকরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে থাকেন; বিশেষ করে একজন শিক্ষকের মূল কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীর মেধা ও মননকে বিকশিত করার লক্ষ্যে অনুপ্রেরণা প্রদানের মধ্য দিয়ে উদ্ভাবনীমূলক কাজের অনুসন্ধানে সহযোগিতা করা। যেখানে শিক্ষার্থীর জন্য অবাধ সুযোগ এবং অবারিত দ্বার উন্মোচন করা থাকে এবং এ সুবিধাসমূহ পরিপক্ব আকারে নিজের জীবনে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসে শিক্ষার্থীরা সামনের পথচলায় ইতিবাচকতাকে অনুসরণ করে থাকে। আমরা সবাই জানি, শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে কিশোর শিক্ষার্থীরা অনুকরণপ্রিয়, ইতিবাচক কাজের অনুপ্রেরণা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পথচলাকে মসৃণ, সুন্দর ও উজ্জ্বল করবে। 

ওপরের আলোচনায় উল্লিখিত সব অপরাধই সামাজিক অপরাধ নয়, রাষ্ট্রীয় আইনে স্বীকৃত অপরাধও রয়েছে। তবে আলোচনায় নিয়ে আসার অন্যতম কারণ হলো, সব অপরাধ সামাজিকভাবেই নিষ্পত্তি হয়ে যেত এবং বাদী-বিবাদী দুই পক্ষই সামাজিকভাবে নিষ্পত্তিকৃত সালিশের মাধ্যমে উপকারভোগী হতো। এসবের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে কিংবা সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে সমাজকে ঢেলে সাজাতে হবে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিপূর্ণরূপে কার্যকর করতে হবে এবং সমাজ স্বীকৃত রীতি, নিয়ম, প্রথা, বিধিবিধানকে মেনে চলার যোগ্য নাগরিক তৈরি করতে পারলেই সামাজিক অপরাধের পরিধি ও ভয়াবহতাকে নিমেষেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মুজিবনগরে স্বাধীনতার সূর্যোদয়

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১০:২৫ এএম
মুজিবনগরে স্বাধীনতার সূর্যোদয়
তোফায়েল আহমেদ

প্রতিবছর জাতীয় জীবনে ‘মুজিবনগর দিবস’ ফিরে আসে এবং এ বছর ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের ৫৩তম বার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ১৭৫৭-এর ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরের আম্রকাননে স্বাধীনতার সেই সূর্য উদিত হয়েছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের স্মৃতিকথা লিখতে বসে কত কথা আমার মানসপটে ভাসছে। ২৫ মার্চ দিনটির কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। এদিন মণি ভাই এবং আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে বিদায় নিই। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি বুকে টেনে আদর করে বলেছিলেন, ‘ভালো থেকো। আমার দেশ স্বাধীন হবেই। তোমাদের যে নির্দেশ দিয়েছি তা যথাযথভাবে পালন করো।’ 

২৫ মার্চ রাতে আমরা ছিলাম মতিঝিলের আরামবাগে মণি ভাইয়ের বাসভবনে। রাত ১২টায় অর্থাৎ জিরো আওয়ারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নীলনকশা অনুযায়ী বাঙালি নিধনে গণহত্যা শুরু করে। চারদিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি। এক রাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী লক্ষাধিক লোককে হত্যা করে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনি। ভাষণে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে বলেন, ‘শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের আরও আগেই গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল, আমি ভুল করেছি।’ ‘দিস টাইম হি উইল নট গো আনপানিশড।’ 

তারপর কারফিউ জারি হয় এবং ২৬ মার্চেই চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’র কথা বারবার প্রচার করে বলছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ প্রদান করে বলেছেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবিলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সেনাকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’ 

এরপর দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে আমরা কেরানীগঞ্জে আমাদের সাবেক সংসদ সদস্য বোরহানউদ্দিন গগনের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান সাহেব; মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমিসহ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত হলো মণি ভাই ও আমি, মনসুর আলী সাহেব এবং কামারুজ্জামান সাহেবকে নিয়ে ভারতের দিকে যাব। আমাদের এই যাত্রাপথ আগেই ঠিক করা ছিল। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর থেকে নির্বাচিত এমসিএ (Member of Constituent Assembly) ডাক্তার আবু হেনাকে বঙ্গবন্ধু যে পথে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন, সেই পথেই আবু হেনা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য আগেই বাসস্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন। 

ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে ভুট্টো যখন টালবাহানা শুরু করে, তখন ’৭১-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে জাতির পিতা জাতীয় চার নেতার সামনে আমাদের এই ঠিকানা মুখস্থ করিয়েছিলেন, ‘সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এখানে  তোমরা থাকবে। তোমাদের জন্য সব ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি।’ ২৯ মার্চ কেরানীগঞ্জ থেকে দোহার-নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া হয়ে এপ্রিলের ৪ এপ্রিল আমরা ভারতের মাটি স্পর্শ করি এবং সানি ভিলায় আশ্রয় নিই। এখানে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন পরে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম।

১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ গঠন করে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলাকে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে রাজধানী ঘোষণা করা হয় এবং জারি করা হয় ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ তথা ‘Proclamation of Independence’। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন করা হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আরও যা ঘোষিত হয় তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন।’ 

রাষ্ট্রপতি শাসিত এই ব্যবস্থায় ‘ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা’, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রয়োজন মনে করিলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগের’ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হস্তে ন্যস্ত করার বিধান রাখা হয়। এ ছাড়া যেহেতু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, সেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এই মর্মে বিধান রাখা হয় যে, ‘কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করিতে না পারেন অথবা তাহার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করিবেন।’ ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ মোতাবেক জাতীয় নেতা উপ-রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন এবং জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, জাতীয় নেতা এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দান করেন।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের সভায় কর্নেল ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা হয়। ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’- এই সাংবিধানিক দলিলটির মহত্তর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ সদস্যরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম, ‘আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে কার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’ অর্থাৎ যেদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেছিলেন সেই দিন থেকে কার্যকর হবে। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা অনুসারে প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ মোতাবেক স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ১০ এপ্রিল ও সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে।

সে সময় তাজউদ্দীন ভাইয়ের সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। একটি বিশেষ প্লেনে তাজউদ্দীন ভাই, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মণি ভাই এবং আমি যখন শিলিগুড়ি পৌঁছাই, তখন সেখানে পূর্বাহ্ণে ধারণ করা তাজউদ্দীন ভাইয়ের বেতার ভাষণ শুনলাম। বাংলার মানুষ তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপসহীন, এককাতারে দণ্ডায়মান। পরবর্তী সময়ে ১৭ এপ্রিল যেদিন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয়, তার আগে ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমি-আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান একটা গাড়িতে করে রাত ৩টায় নবগঠিত সরকারের সফরসঙ্গী হিসেবে কলকাতা থেকে রওনা করি সীমান্ত সন্নিহিত মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা তথা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী মুজিবনগরের উদ্দেশে। 

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করি প্রিয় মাতৃভূমির মুক্তাঞ্চল মেহেরপুরের আম্রকাননে। আমাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিক ছিলেন। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেখানে বোমা হামলা চালাতে পারে। মেহেরপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল। মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিতে আকাশ-বাতাস তখন মুখরিত। আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছিল নবীন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভব। দিনটি ছিল শনিবার। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে পশ্চিম দিক থেকে শীর্ষ নেতারা দৃপ্ত পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে এলেন। দেশ স্বাধীন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সমবেত সংগ্রামী জনতা আমাদের সঙ্গে সমস্বরে গগনবিদারী কণ্ঠে মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলল। 

মুজিবনগরে শপথ অনুষ্ঠানস্থলে একটি ছোট্ট মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথমে মঞ্চে আরোহণ করেন। ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সশস্ত্র দল রাষ্ট্রপ্রধানকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। এরপর মঞ্চে আসেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী। উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবকরা পুষ্পবৃষ্টি নিক্ষেপ করে নেতাদের প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। সরকারের মুখপত্র ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি আবদুল মান্নান, এমসিএর উপস্থাপনায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমেই নতুন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দলিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে মুক্তির বাণীগুলো পাঠ করা হয়। 

আকাশে তখন থোকা থোকা মেঘ। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা মায়ের চারজন বীর সন্তান প্রাণ ঢেলে গাইলেন জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। উপস্থিত সবার সঙ্গে কণ্ঠ মেলালাম। অপূর্ব এক ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল তখন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ইংরেজিতে প্রদত্ত ভাষণের শুরুতে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমি তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেছি এবং তার পরামর্শক্রমে আরও তিনজনকে মন্ত্রীরূপে নিয়োগ করেছি।’ 

এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর ঘোষণা করেন প্রধান সেনাপতি পদে কর্নেল ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার আবেগময় ভাষণের শেষে দৃপ্তকণ্ঠে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি জনগণনন্দিত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ নির্যাতিত মানুষের মূর্ত প্রতীক শেখ মুজিব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আজ বন্দি। তার নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম জয়ী হবেই।’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তাজউদ্দীন আহমদ অভূতপূর্ব ও অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় বলেন, ‘পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে। 

পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যায় মত্ত হয়ে ওঠার আগে ইয়াহিয়ার ভাবা উচিত ছিল তিনি নিজেই পাকিস্তানের কবর রচনা করছেন।’ মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বক্তৃতার শেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে আমরা কামনা করি বিশ্বের প্রতিটি ছোট-বড় জাতির বন্ধুত্ব।’ ‘বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম। বিশ্বের আর কোনো জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোনো জাতি আমাদের চেয়ে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি, অধিকতর সংগ্রাম করেনি। জয় বাংলা।’ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই তৎকালীন বাস্তবতায় যা বলার প্রয়োজন ছিল তা-ই তারা বলেছেন। আমাদের শীর্ষ দুই নেতার এই দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ ছিল ঐতিহাসিক এবং অনন্য। জাতীয় নেতারা, নির্বাচিত এমসিএ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক, পাবনার জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান, মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীসহ আরও অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিনিধিদের ইচ্ছার শতভাগ প্রতিফলন ঘটিয়ে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে, সাংবিধানিক বৈধতা অর্জন করে সেদিন রাষ্ট্র ও সরকার গঠিত হয়েছিল। আর এসব কিছুর বৈধ ভিত্তি ছিল বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তথা ’৭১-এর এপ্রিলের ১০ ও ১৭ তারিখে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সরকারের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করে সমগ্র বিশ্বের সমর্থন নিয়ে জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করে সুমহান বিজয় ছিনিয়ে আনা। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে শপথের সময় আমরা সমস্বরে বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ আমরা জানি না। কিন্তু যতদিন আমরা প্রিয় মাতৃভূমি এবং তোমাকে মুক্ত করতে না পারব, ততদিন আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোয় বাঙালির চেতনায় বন্দি মুজিব মুক্ত মুজিবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিলেন। যারা ষড়যন্ত্রকারী তাদের হোতা খুনি মুশতাক তখনই আমাদের কাছে প্রশ্ন তুলেছিল, ‘জীবিত মুজিবকে চাও, না স্বাধীনতা চাও।’ আমরা বলতাম, ‘আমরা দুটোই চাই। স্বাধীনতাও চাই, বঙ্গবন্ধুকেও চাই।’ ৩০ লাখ প্রাণ আর ২ লাখ মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু মুজিবকে মুক্ত করতে পেরেছিলাম।

প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের এই মহান দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের অমর স্মৃতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। জাতীয় চার নেতা জীবনে-মরণে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থেকেছেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, কিন্তু বেইমানি করেননি। ইতিহাসের পাতায় তাদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তারা যে আত্মদান করেছেন সেই আত্মদানের ফসল আজকের এই স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে জাতীয় নেতাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা সর্বত্র স্মরণ করা উচিত। জাতীয় ইতিহাসের গৌরবময় দিনগুলো যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করে জাতীয় মর্যাদা ও গৌরব বৃদ্ধিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য 
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। [email protected]