মুক্তিযুদ্ধ ও ঈদ: স্মরণীয় কিছু কথা । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

মুক্তিযুদ্ধ ও ঈদ: স্মরণীয় কিছু কথা

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৩৪ এএম
মুক্তিযুদ্ধ ও ঈদ: স্মরণীয় কিছু কথা
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

যখন গ্রামের স্কুলে নিচু ক্লাসে পড়তাম, তখনই পবিত্র রমজান মাসে ইফতার খাওয়ার জন্য স্কুলের আশপাশে অপেক্ষা করতাম। স্কুল কর্তৃপক্ষ রুটিন করে দিয়েছিল। কোন ক্লাসের ছাত্ররা কবে ইফতার করতে পারবে। সেই ছয় দশক আগেকার কথা। আবার খুশির ঈদ এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ঈদের সম্পর্কের কথা শুরুতেই বলছি। তখন পশ্চিমবঙ্গে চলছে মুক্তিযুদ্ধের উন্মাদনা। এমনই একদিন অধ্যাপক ইউসুফ আলি, যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির নেতা ছিলেন, আমাকে ফোন করে বললেন, চলে আসুন। হেনা ভাই (আবু হেনা কামারুজ্জামান), নজরুল সাহেব আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। যত তাড়াতাড়ি পারেন, চলে আসুন।

কামারুজ্জামান সাহেব প্রশ্ন করলেন, কলকাতায় ঈদের নামাজ কোথায় হয়। আমি বললাম কলকাতার সব মাঠেই হয়। তিনি বললেন, তুমি আমাদের নিয়ে যাবে। আমি উত্তরে বললাম, আপনারা ভারত সরকারের অনুমতি নিয়েছেন। সবাই বললেন- না, আমরা অনুমতি নিইনি। আপনারা তো কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আছেন। কী করে নামাজ পড়তে যাবেন? সোজা পার্কস্ট্রিট ধরে আমরা সেখানে উপস্থিত হলাম। গাড়ি থেকে নামিয়ে নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের নামাজস্থলে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমার স্কুলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। স্কুলের ছেলেরা নতুন জামাকাপড় পড়ে খুশির মেজাজে কোলাকুলি করছে।

এবার ফেরার পালা। গাড়িতে উঠতে যাব, তখন ইউসুফ আলি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আর কোথায় কোথায় নামাজ পড়া হয়, আর ঈদের উৎসব পালন করা হয়। বিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা এই দিনটিকে মহাসমারেহে পালন করেন। ইউসুফ আলি বললেন, আরও দু-একটা জায়গায় আমাদের নিয়ে চলুন। আমরা শুধু দেখব। আমি তাদের প্রথমে পার্ক সার্কাস ময়দান, তারপর মৌলালী ময়দানে নিয়ে গেলাম। এবার ওরাই বললেন, আর দেখব না। এবার ফিরে চলুন।

গাড়িতে বসে ক্যাপ্টেন মনসুর আলি বললেন- আরে, আমরা স্বাধীনতার পর থেকে শুনে আসছি পশ্চিমবঙ্গে ঈদের নামাজ হয় না। এবার তো স্বচক্ষে দেখলাম। এতদিন পাকিস্তান আমাদের মিথ্যে কথা বলে এসেছে। কামারুজ্জামান উত্তেজিত হয়ে বললেন, আমি তো দীর্ঘদিন পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলাম। আমি করাচি, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি সব দেখেছি। ওরা বাঙালিদের নামই শুনতে চাইত না। ভারত সম্পর্কে ঘৃণা ছাড়া কোনো কথাই বলত না। ওদের কথার কোনো মূল্য আছে? 

সবচেয়ে বড় নামাজ হয় রেড রোডে। সেখানে লাখ লাখ লোক আসেন। তার বর্তমান নাম ইন্দিরা গান্ধী সরণি। সৈয়দ সাহেবের নির্দেশেই ইউসুফ আলি গোলক মজুমদারের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানালেন।

গোলক মজুমদার তাদের সরাসরি বলে দিলেন, নিরাপত্তার দিকটি আমি দেখব। কিন্তু দিল্লির অনুমতি চাই। দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করে সেদিন রাতেই গোলক মজুমদার জানিয়ে দেন, আপনাদের চারজনকে দিল্লি অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তাজউদ্দিন সাহেবকে অনুমতি দেয়নি।

বিষয়টি নিয়ে কামারুজ্জামান, সৈয়দ সাহেবরা তাজউদ্দিনের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বললেন। তাজউদ্দিন সাহেব বাকি নেতাদের রেড রোডে নামাজ পড়তে যাওয়ার সম্মতি ছিলেন। তার নামাজের জন্য মুজিবনগর দফতরে সব ব্যবস্থা করা হলো। আমি কলকাতার সুরেন্দ্রমোহন এভিনিউয়ে যেখানে থাকতাম, তার পাশেই একটি বাড়িতে এই নেতারা থাকতেন।

ঈদের দিন আমাকে সকালে ওই বাড়িতে যেতে বলা হয়েছিল। নিরাপত্তার জন্য সেখানে সাত-আটটি পুলিশের গাড়িও উপস্থিত ছিল। ওদের একটি বড় গাড়িতে তোলা হলো। আমিও সেই গাড়িতে ছিলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা পর আমরা যখন সুন্দরী মোহন এভিনিউয়ে এলাম, গাড়ি থেকে নেমে চারজন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মিষ্টি না খেয়ে যাবে কোথায়? আমি স্থির করে তিনজনের বাড়ি গিয়ে মিষ্টি খেলাম। আর কামারুজ্জামানের বাড়ি গিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

বাড়িতে ঢুকতেই গোলক মজুমদারের ফোন- সব ঠিকঠাক আছে তো? আমি বললাম, আপনি তো খবর পেয়েই গেছেন। আর আমি আনন্দবাজারে খবরটা আজ করব। করেওছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ ও ঈদ। ঈদ সবার। আনন্দের উৎসব। আমার ছোটবেলায় যা ছিল, আজও তাই।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক 

উত্তেজনা-অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:৩১ এএম
উত্তেজনা-অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে
মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার

দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, সেটি এখনো পরিষ্কার না। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে রকম সম্পর্ক, তাতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা- মোসাদের প্রতি অনেকের সন্দেহ হতে পারে। কারণ মোসাদ বিভিন্ন সময়ে ইরানের রাজনীতিক, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। এর আগে সিরিয়ায় ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে ইরানের ছয়-সাতজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। তাই মোসাদ জড়িত থাকতে পারে, এমন সন্দেহ করা অমূলক নয়। 

যদি ইরানের গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন যে এটি নাশকতা, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধ নিতে চাইবে। সেটি হলে এই অঞ্চলে নিশ্চিতভাবে উত্তেজনা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নেবে। সেটি তারা কীভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়। এমনকি সেটি সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়েও চলে যেতে পারে। 

এমনিতেই ওই অঞ্চলে নানা সংঘাতপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। গাজা হত্যাকাণ্ড, হুথি বিদ্রোহীদের হামলা, হিজবুল্লাহ, হামাসের গেরিলা যুদ্ধ; তার ওপর এমন ঘটনা নিঃসন্দেহ অঞ্চলটিতে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করল।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন হয়নি

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২৯ এএম
ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন হয়নি
এম হুমায়ুন কবির

দুর্ঘটনার কারণে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে পরিবর্তন ঘটেনি। খামেনি সাহেব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যমণি। কাজেই নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত তেমন নেই। 

দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যুতে প্রতিবেশীরাও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কোনো কোনো প্রতিবেশী তো সহযোগিতাও করছে, যেমন তুরস্ক। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রও নেতিবাচক কিছু বলেনি বা করেনি। তাই আমার মনে হয় না, এই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা বাড়বে। 

দুর্ঘটনার পর অনেক ধরনের স্পেকুলেশন দেখছি। অনেকে বলছেন, নাশকতাও হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার না। নাশকতার বিষয়টি উড়িয়েও দেওয়া যায় না, আবার ঘটনা না জানা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তেও আসা যাবে না। শেষ পর্যন্ত যদি নাশকতা বা অন্য কোনো দেশের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি অবশ্যই অন্য রকম হবে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন লক্ষণ নেই।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

পরিস্থিতি ভিন্ন হবে, নাশকতা হলে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২৬ এএম
পরিস্থিতি ভিন্ন হবে, নাশকতা হলে
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ

এটি এখন পর্যন্ত একটি নিছক দুর্ঘটনা। ফলে এ নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া হবে না। পরবর্তী সময়ে যদি কোনোভাবে প্রমাণিত হয় যে বিদেশি সম্পৃক্ততায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে; সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্য রকম হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। 

তবে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকেও সন্দেহ করার মতো এমন কিছু বলা হয়নি। ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও কিছু বলা হয়নি। এই অবস্থায় উত্তেজনাকর কিছু হবে বলে মনে হয় না। 

ইরান খুব সুশৃঙ্খল একটি দেশ। দুর্ঘটনার পর পরই ভাইস প্রেসিডেন্টকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। তাই ইরানের অভ্যন্তরেও উত্তেজনাকর কিছু হবে না। তবে ইব্রাহিম রাইসির অনুপস্থিতি ন্যূনতম হলেও ইরানের এগিয়ে যাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করবে। এর বেশি কিছু আপাতত মনে হচ্ছে না।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২০ এএম
পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে
অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান

অবশ্যই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে এই দুর্ঘটনা। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। দুজনই অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। এটা নাশকতা কি না, যদিও সেটা এখনো প্রমাণিত নয়।

নিহত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনেক নতুন নতুন পরিবর্তন এনেছেন ওই অঞ্চলে। যেমন, ইরান-সৌদি আরব সম্পর্ক স্থাপন বা ইরান-তুরস্ক সম্পর্কের কথাও বলা যায়। এগুলো ইসরায়েলকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। 

ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে নাশকতা হতেও পারে। সঙ্গে আরও দুটো হেলিকপ্টার ছিল প্রোটেকশনের জন্য। তারা অ্যাটেম্পট নিলে বাঁচাতেও পারত হয়তো, কিন্তু তারা সেটা করেনি। তা ছাড়া আমেরিকা-ইসরায়েল বিশেষ ধরনের ডিভাইস তারা ব্যবহার করে এমন ঘটনা আগেও ঘটিয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:০৪ এএম
বাংলাদেশের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন
মো. তৌহিদ হোসেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে আসেন গত ১৪-১৫ মে। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় মিলিত হন। এ ছাড়া  তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন ডোনাল্ড লু। 

বাংলাদেশে গত ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মানবাধিকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের গভীর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। অবাধ, নিরপেক্ষ ও নির্বিঘ্ন নির্বাচনের স্বার্থে ভিসানীতিতে কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনের পরও নির্বাচন সুষ্ঠু ও মানসম্পন্ন হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্র বিবৃতি দিয়েছিল। এমতাবস্থায়, নির্বাচনের পাঁচ মাসের মাথায় ডোলান্ড লুর এবারের সফর দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে এক ধরনের উত্তরণের প্রয়াস বলেই সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে।

লুর বক্তব্যেও সেটির আভাস পাওয়া যায়। অস্বস্তি কাটিয়ে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় আস্থা স্থাপনের চেষ্টা করছেন বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন ডোনাল্ড লু। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয়ে মতভেদ ছিল। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন (বাংলাদেশে) অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম। এতে কিছু টেনশন তৈরি হয়েছিল। তবে আমরা সামনে তাকাতে চাই, পেছনে নয়। কাজেই সম্পর্ক উন্নয়নের উপায় খুঁজে বের করতে হবে বলেও মনে করেছেন লু। বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

লু বলেন, এই সম্পর্কের পথে অনেকগুলো কঠিন বিষয় রয়েছে, যথা র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার। এসবকে পাশে রেখে ব্যবসার পরিবেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও বেশকিছু বিষয়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের বলেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 

ডোনাল্ড লুর সফরে সার্বিক সুর অনেকটাই ইতিবাচক ছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, এবারের সফরের মাধ্যমে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্তু ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে, তা হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেশটার নৈশভোজের সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অব্যাহত পতনের বিষয়টি লু উল্লেখ করেছেন, এবং মার্কিন বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো যে তাদের লভ্যাংশ ফেরত নিতে পারছে না এনিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ে লু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।

নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পর্যায়ে বহিঃরাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে চীন, রাশিয়া এবং বিশেষ করে ভারত, সরকারের পক্ষে খুব শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশগুলো একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য তাদের চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিল। নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর অনেকটা স্থিমিত হয়ে আসে। অনুমান করা যায় যে, সরকারের পক্ষে ভারতের শক্ত অবস্থানের কারণে, বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্কে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্র নিজ স্বার্থের অনুকূল মনে করেনি। ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য চীনের আধিপত্যরোধ, যাতে ভারত তার সহযোগী।

বাংলাদেশের নির্বাচন যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশানুরূপ হয়নি, দেশ দুটির মধ্যে পরস্পরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তো শেষ হয়ে যায়নি। ডোনাল্ড লুর সাম্প্রতিক সফরকে এই প্রেক্ষিত থেকে দেখতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যে বহুমাত্রিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের আছে, সে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা তারা রক্ষা করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের স্বার্থ হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিভিন্ন ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও বিদ্যমান। আগামী সময়গুলোতে যে বিষয়গুলো আমাদের সামনে আছে তার মধ্যে অন্যতম নিরাপত্তা ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ইস্যুতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেবে বলে মনে করা হচ্ছে । 

অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটা আশঙ্কা সবসময় ছিল যে, নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসে কি না! এ ক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও অর্থনীতির ওপর এখন পর্যন্ত কোনো বিরূপ প্রভাব দেখা যায়নি। আগামী দিনগুলোয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে উভয় পক্ষকেই। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের জন্য। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যখন টানাপোড়েন থাকে তখন ব্যবসায়ীরাও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। বাংলাদেশ আশা করবে, এই সফরের প্রেক্ষিতে সে আশঙ্কা দূরীকরণের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। 

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও কয়েকটি দেশ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আছে, যেমন ভারত, চীন, মায়ানমার ইত্যাদি। ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকার পরিপ্রেক্ষিতে মনে করা যায় যে, ভারতের নিরাপত্তার প্রয়োজনগুলোকে সরকার হয়তো বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে অন্যান্য দেশের তুলনায়। তবে ভারতের স্বার্থ যে সবসময় বাংলাদেশের সঙ্গে একইরকম হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ যেন বিঘ্নিত না হয়। 

নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় মায়ানমার পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গা সমস্যায় আমাদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে অতীতে প্রকৃত প্রস্তাবে ভারত বা চীন কোনো ধরনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। প্রত্যাশিতভাবে, নিজেদের স্বার্থের নিরিখেই তারা তাদের কার্যক্রমকে সীমিত রেখেছে। ভারত, চীন ছাড়াও মায়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে ভারত, চীনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা লাভের চেষ্টা বাংলাদেশের স্বার্থে অপরিহার্য।

রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পশ্চিমের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে  ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। রপ্তানি পণ্যের বাজার, বিদেশি বিনিয়োগের উৎস, রেমিট্যান্স ইত্যাদি সব বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য অপরিসীম। এ ছাড়া আছে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। এসব কথা মাথায় রেখেই সামনের দিনগুলোতে আমাদের বৈদেশিক সম্পর্কের অগ্রাধিকারগুলোকে নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব