দেশে রাজনৈতিক সংকট চলমান। তার ওপর সুযোগসন্ধানীদের অপতৎপরতা মোকাবিলা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তার পরও সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। বারবার এ ধরনের সংকট মোকাবিলা করাই কঠিন। দেশজুড়ে আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা চাই না। দেশের স্বার্থে, শিল্পের স্বার্থে সংকটগুলো সমাধানে জনমত গঠনের পাশাপাশি সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

বর্তমানে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এগুলো কোনো ভালো লক্ষণ নয়। মব এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা জানি, জুলাই-আগস্টের পরিবর্তনের মূল নায়ক এ দেশের তরুণ যুবকরা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবশক্তি কিন্তু তার মধ্যে শিক্ষিত বেকার অনেক, কর্মসংস্থান তেমনভাবে তৈরি হয়নি। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অনেক উচ্চস্বরেই বলছে যে, পৃথিবীর কোনো শক্তি-ই এই নির্বাচন থামাতে পারবে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি, তরুণরা এ দেশের পরিবর্তন এবং সংস্কার দেখার জন্য এ অভ্যুত্থ্যান ঘটিয়েছে, আজকে তারাই শঙ্কিত।
বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এর বাস্তব চিত্র অর্থনীতিতে বেকারত্বের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বেকারত্ব ও জীবিকার মধ্যে স্পষ্ট কোনো পার্থক্য অনেক সময় দেখা যায় না। কারণ সেখানে মানুষের একাধিক আয়ের উৎস থাকে। ফলে বেকারত্বের পরিণতি বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এখনো ততটা গুরুতর আকার ধারণ করেনি। অনেক ক্ষেত্রে বৈদেশিক আয়ের মাধ্যমে বেকারত্বের অবস্থাও দূর হয়ে যায়।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট তুলনামূলক ভালো হয়েছে। রাজস্ব বাজেটের আকার বেড়েছে; যা এডিপির তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। রাজস্ব নিয়ে আমাদের আগে থেকেই আরও চিন্তাভাবনা করা উচিত। দেশের অর্থনীতির সংস্কারের দিকে আমাদের আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হবে। দেশের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে ভালো কিছু আশা করা যায় না। আগের সরকার নির্বাচনের নামে নানারকম প্রহসন করেছে। ফলে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কাজেই গণতন্ত্রের নামে আমরা এখনো যদি বিভাজন করি, তাহলে কোনোভাবেই সামনে এগোনো সম্ভব নয়। সবারই নজর নির্বাচনের দিকে। কাজেই সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন হলেই দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন।
বর্তমানে অর্থনীতিতে এক ধরনের গতি সঞ্চার হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে এখনো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রিজার্ভ-রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় বাড়ানো কঠিন। একই সঙ্গে রাজস্ব ও ব্যাংক খাত নিয়ে যে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ হবে না। এমতাবস্থায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে কিছু স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ব্যাংক বা অন্য কোনো খাতে যেন কাঠামোগত সংকট দেখা না দেয়। বৈদেশিক দায়দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রেও যেন কোনো সমস্যা তৈরি না হয়। কোনো কোম্পানি যখন কোনো লাভ করতে পারবে না, সেটাকে ভর্তুকি দিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। কৃষকের জন্য ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে। আমাদের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এ ভর্তুকির সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারব, ততদিন আমাদের অর্থনৈতিক দৈন্য থেকেই যাবে। আর এসব কারণে আমরা কর সংগ্রহ যতটুকুই করি, যতটা অপব্যয় হচ্ছে তা আমাদের রোধ করতে হবে। দেশে ডলারসংকটের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সুদের হার, পণ্য আমদানি-রপ্তানি, রাজস্বসহ কোনো সূচকেই সন্তোষজনক অবস্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা বিদ্যমান। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো যাচ্ছে না।
বর্তমানে নানামুখী সমস্যায় বৈশ্বিক আর্থসামাজিক অবস্থা সংকটজনক। এ সংকট শিগগিরই দূর হওয়ার নয়। এমতাবস্থায় বিরাজমান বিশ্বমন্দা ও সংকট কেটে যাওয়ার আশা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে যে ক্ষেত্রগুলো করহারের অধীনে আসেনি সেগুলোকে করহারের আওতায় আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে অটোমেশনে যেতে হবে। যাদের ঢাকা শহরে অনেক বাড়ি আছে, অথচ তারা সরকারকে কর ফাঁকি দিচ্ছে। এ রকম উদাহরণ বহু আছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না। ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে রাজস্ব আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। বাজেটঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে ব্যয় সংকোচন করতে হবে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।
কোম্পানির লাভ নেই, কিন্তু সেগুলো বাজারে রেখে দেওয়া হয়েছে। কোম্পানি যখন কোনো লাভ করতে পারছে না, সেটাকে ভর্তুকি দিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। কৃষকের জন্য কোনো কিছুর ভর্তুকি দেওয়া- সেটা হয়তো ঠিক আছে। কিন্তু আমি কেন একটি লোকসানি শিল্পকে, যেটা দিয়ে কিছু হবে না সেটাকে কেন সরকারের মধ্যে রেখে দিয়েছি। আমাদের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। পুঁজিবাজারকে দুর্নীতিমুক্ত করা, ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা, কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি কেউ হিসাব গোপন করে কি না, এগুলো যাচাই করে দেখা ছিল আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। এসব উদ্যোগ নেওয়া হলে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং পুনরায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে।
নানা ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে হলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সুশাসন দরকার। যেকোনো সমস্যা সমাধানে যৌক্তিক আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতায় দলমতনির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিককে নিজের অবস্থান থেকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতার পাশাপাশি জনমত গঠন জরুরি। প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন, দেশের অর্থনীতিকে মোটামুটি সচল রাখছে আমাদের পোশাকশিল্প। অথচ এ খাতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সুযোগসন্ধানীরা নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এমনিতেই দেশে রাজনৈতিক সংকট চলমান। তার ওপর সুযোগসন্ধানীদের অপতৎপরতা মোকাবিলা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তার পরও সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। বারবার এ ধরনের সংকট মোকাবিলা করাই কঠিন। দেশজুড়ে আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা চাই না। দেশের স্বার্থে, শিল্পের স্বার্থে সংকটগুলো সমাধানে জনমত গঠনের পাশাপাশি সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান আইসিবি
