শিশুদের প্রতি সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটা বৃহত্তর সামাজিক সহিংসতার অংশ। যে সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীবিদ্বেষ, সহিংস ভাষা ও দুর্বল মানুষের প্রতি নির্যাতন স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে শিশুরাও নিরাপদ থাকে না।...
২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। ঈদের ছুটির বিকেলে বাড়ির পাশের মাঠে খেলতে বেরিয়েছিল আট বছরের এক শিশু। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, অন্যদিনের মতোই সন্ধ্যার আগেই সে ফিরে আসবে। কিন্তু সময় গড়াতে থাকে, তার কোনো খোঁজ মেলে না। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। রাতের দিকে স্থানীয় একটি নির্জন এলাকা থেকে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, শিশু নির্মম যৌন সহিংসতার শিকার। পরদিন হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, মানববন্ধন হয়, প্রশাসন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ জানে–এ ধরনের ক্ষোভের স্থায়িত্ব খুব কম। কয়েক সপ্তাহ না যেতেই আরেকটি নতুন ঘটনা সংবাদ শিরোনাম দখল করে নেয়। অথচ ওই একটি ঘটনায় ধ্বংস হয়ে যায় এক শিশুর শৈশব, একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন এবং একটি সমাজের নিরাপত্তাবোধ।
সীতাকুণ্ডের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় প্রতিদিনই শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, অনলাইন শোষণ কিংবা হত্যার খবর আসছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং বিভিন্ন শিশু অধিকার সংগঠনের তথ্য বলছে, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর বয়স ১২ বছরের নিচে, এমনকি ছয় বছরের নিচের শিশুও এই সহিংসতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
২০২৬ সালের প্রথম চার মাসের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত একাধিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই সময়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার শিশুদের মধ্যে অন্তত ৫৬ জনের বয়স ছিল ১২ বছরের নিচে। তাদের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ছয় বছরেরও কম। একই সময়ে ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনাও সামনে এসেছে, যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো–অপরাধীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরিচিত কেউ নয়। প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, পরিবহনকর্মী, মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক কিংবা পরিবারের পরিচিত মানুষই বহু ঘটনায় অভিযুক্ত। ফলে শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে সেই জায়গাগুলোই, যে জায়গা শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা ছিল।
ঘরের ভেতরেই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ শিশুরা
শিশু নির্যাতনের আলোচনায় সাধারণত বাইরের ‘অপরিচিত’ মানুষকে ভয় হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রায়ই পরিচিত সামাজিক পরিসরের ভেতরে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বহু ঘটনায় অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তি–যেমন প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কেউ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচিত মানুষের হাতে নির্যাতন শিশুর মানসিক নিরাপত্তাবোধকে গভীরভাবে ভেঙে দেয়। এ পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোও অনিশ্চয়তায় ভুগছে, কারণ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার কাঠামো এখনো দুর্বল। বাংলাদেশে অধিকাংশ শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক child safeguarding policy না থাকায় প্রতিরোধ ও জবাবদিহি ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।
ধর্ষণের শিকার শুধু কন্যাশিশু নয়, বাড়ছে ছেলেশিশু নির্যাতনও
বাংলাদেশে শিশু যৌন নির্যাতনের আলোচনায় ছেলেশিশুরা প্রায় উপেক্ষিত। যদিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ছেলেশিশু নির্যাতনের ঘটনা উঠে এসেছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক ধারণার কারণে অনেক পরিবার ছেলেশিশুকে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে মানতে চায় না, ফলে নির্যাতনের ঘটনা গোপন থেকে যায়। এই নীরবতা অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল করে। আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের অনেক ঘটনাই আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট হয় না।
ছয় বছরের নিচের শিশুও রক্ষা পাচ্ছে না
বাংলাদেশে শিশু যৌন সহিংসতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ভুক্তভোগীদের বয়স ক্রমেই কমে আসা। মানবাধিকার সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ছয় বছরের নিচে অন্তত ১৬ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত ছোট শিশুরা কী ঘটেছে তা বুঝতে বা জানাতে পারে না, আর অপরাধীরা এই অসহায়তাকে কাজে লাগায়। চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সহিংসতায় শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতির শিকার হতে পারে।
মাদ্রাসা, স্কুল, কোচিং-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন ঝুঁকির জায়গা হয়ে উঠছে?
বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ মনে করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে স্কুল, মাদ্রাসা, কোচিং ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশু যৌন নির্যাতনের বহু অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন ঘটনায় শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক বা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা ও কাউন্সেলিংয়ের অভাব রয়েছে। ক্ষমতার সম্পর্ক ও সামাজিক ‘সম্মান’ রক্ষার মানসিকতার কারণে অনেক শিশু ও পরিবার অভিযোগ প্রকাশ করতে ভয় পায়, ফলে বহু ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি কি অপরাধীদের সাহসী করে তুলছে?
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক পরিবার ন্যায়বিচার পায় না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এসব মামলায় দণ্ডের হার এখনো কম, যা অপরাধীদের শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার বার্তা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতা ভবিষ্যতের অপরাধ বাড়ায় এবং আইনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। গ্রামাঞ্চলে স্থানীয়ভাবে ‘মীমাংসা’ করার প্রবণতায়ও অনেক শিশু ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
শিশু নির্যাতনের খবর কি বাস্তব সংখ্যার খুব সামান্য অংশ?
মানবাধিকার কর্মীরা প্রায় সবাই একমত–সংবাদে প্রকাশিত ঘটনাগুলো বাস্তবতার কেবল একটি অংশ। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলো প্রায়ই সামাজিক লজ্জা, বিয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, স্থানীয় চাপ কিংবা হুমকির মুখে পড়ে। ফলে বহু ঘটনা কখনো থানায় পৌঁছায় না। বিশেষ করে ছেলেশিশুর ক্ষেত্রে নীরবতা আরও বেশি। অনেক পরিবার মনে করে বিষয়টি প্রকাশ করলে শিশুর সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশে এখনো শিশু যৌন সহিংসতার কেন্দ্রীয় ও স্বচ্ছ ডেটাবেইস গড়ে ওঠেনি।
ডিজিটাল যুগে নতুন হুমকি
অনলাইন গ্রুমিং, ব্ল্যাকমেইল ও পর্নোগ্রাফি ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও একই সঙ্গে তৈরি করেছে নতুন ধরনের সহিংসতা। সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে শিশুদের টার্গেট করা হচ্ছে। প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে আবেগিক সম্পর্ক, এরপর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল–এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। ডিপফেক প্রযুক্তি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। বিশেষ করে কিশোরীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করার অভিযোগ বাড়ছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা এখনো সীমিত। অধিকাংশ পরিবার জানেই না, তাদের সন্তান অনলাইনে কী ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
সহিংস সমাজের মানসিক শেকড় কোথায়?
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের প্রতি সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটা বৃহত্তর সামাজিক সহিংসতার অংশ। যে সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীবিদ্বেষ, সহিংস ভাষা ও দুর্বল মানুষের প্রতি নির্যাতন স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে শিশুরাও নিরাপদ থাকে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্নোগ্রাফির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, মাদক, সামাজিক অসহিষ্ণুতা, পারিবারিক সহিংসতা এবং বিকৃত পৌরুষবোধ–সব মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। শিশুর প্রতি সহিংসতা আসলে সমাজের গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিফলন।
রাষ্ট্র, পরিবার নাকি সমাজ–কার ব্যর্থতায় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব?
শিশু সুরক্ষা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম–সবাইকে এখানে ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কঠোর শাস্তি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন- বাধ্যতামূলক child safeguarding policy, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা, পরিবারে সচেতনতা এবং দ্রুত নয়, নিশ্চিত বিচার। কারণ, একটি সমাজকে বিচার করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো–সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদ। আর যে দেশে শিশুরা ভয় নিয়ে বড় হয়, সেই সমাজের ভবিষ্যৎও কখনো সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হতে পারে না।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
