তথ্যকে চাপা দিয়ে রাখা কিংবা দেশের জনগণকে কোনো তথ্য জানতে না দেওয়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের শামিল। সম্প্রতি তিস্তা প্রকল্প ও তার সম্ভাব্য ঋণ প্রদান নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। তা জনগণকে জানতে দেওয়া হয়নি। তবে কি তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে চূড়ান্ত হবে? সেটা প্রকাশ করলে কী ক্ষতি হতো। সত্য এক দিন সামনে আসবেই।...

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার আগে অধ্যাপক ইউনূস তড়িঘড়ি করে শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বিতর্কিত চুক্তি করে গেছেন, সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সে শুল্কযুদ্ধের প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি বাতিল হলেও তা নিয়ে সৃষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক গুজব ও অর্থনৈতিক হাঙ্গামার আজও অবসান ঘটেনি। নির্বাচিত ট্রাম্প সরকারের পক্ষে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করার ক্ষমতা থাকলেও অনির্বাচিত ইউনূস সরকারের সে ধরনের কোনো চুক্তিতে যাওয়ার সাংবিধানিক এখতিয়ার ছিল না। কিন্তু সেটা করে পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তিনি একটি অপ্রত্যক্ষ চাপের মুখে ফেলে গেছেন। সে চুক্তি বাতিল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলেও তারেক রহমান তার বিয়য়বস্তু নিয়ে আজও কোনো মতামত ব্যক্ত করেননি। বাংলাদেশের ওপর ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, সয়াবিন ও জ্বালানি আমদানিসহ বাণিজ্যিক বিমান ক্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তার পরিবর্তে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য বাংলাদেশি পণ্যসামগ্রীর ওপর শুল্ক হ্রাস করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু স্বাক্ষরিত চুক্তির মধ্যে প্রতিরক্ষা এবং এ অঞ্চলে শান্তি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রণতরীর চলাচল ও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়াস লক্ষ করা গেছে। তাতে চীন, রাশিয়া ও ভারত খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি, ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তাতে দীর্ঘ দেড় দশক পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে অধ্যাপক ইউনূসকে নিয়ে কিছুটা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেছেন যুক্তরাষ্ট্রকে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস মাতারবাড়ীসহ চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকা ভারত ও চীনের আধিপত্য থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন। অপরদিকে অনেকে আবার মনে করেন, ক্রমে ক্রমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস পাচ্ছে।
ওপরে উল্লিখিত বিষয়াদি নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই এখন স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ায় এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় ভুক্তভোগী এলাকাবাসী অস্থির হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুখ থেকে সেসব বিষয় সরাসরি বিভিন্ন তথ্য জানার জন্য। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শোনা যাচ্ছে যে, আগামী মাসে অর্থাৎ জুনের যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করতে পারেন। সামনে আসছে বাজেট অধিবেশন। সে কারণে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দেওয়া কিংবা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের অবস্থান জানার জন্য দেশের মানুষ অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। কারণ তিস্তা কিংবা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতাত্তোর বিগত ৫৪ বছরের অধিক সময় অপেক্ষা করে রয়েছে। একনেকে অনুমোদন পাওয়া পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিত হবে বলে জানা গেছে। তার পর থেকে সে বিশাল অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একটি আনন্দের ধারা বেয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট খবর না পেয়ে মানুষের মধ্যে নানা গুজবের সৃষ্টি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, শিলিগুড়ি করিডর কিংবা ‘চিকেন নেক’-এর অবস্থানের কারণে ভারতের বাধার মুখে চীন শেষ পর্যন্ত এ মহাপ্রকল্পে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। সে কারণে এ বিশাল অঞ্চলের মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জানতে চায়–শেষ পর্যন্ত ২ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত রংপুর বিভাগের এ বিপন্ন জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে কী জুটবে? ১২ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাবিত ব্যয় ধরে ১০ বছরের মেয়াদে এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল। এবং চীন সরকার এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থ প্রদান করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, ভারত সরকার চায় না তার ঘরের পাশে একটি প্রকল্পে চীন ক্রমে ঢুকে পড়ুক। সে কারণে এ অঞ্চলের মানুষ চায় নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশ এ কাজটি আগে শুরু করুক। তার পর সাহায্য লাগলে পরে দেখা যাবে।
রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর চীন তাদের প্রণীত তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি নিয়ে বেশ তৎপর হয়ে ওঠে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত তিস্তার প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকাটি সরেজমিন ঘুরে এসেছেন। তার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতারা এলাকাটি সফর করেন এবং অপেক্ষমান স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের আশ্বাস দেন যে, সবকিছু ঠিকমতো এগোলে বিএনপি সরকার এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে খুব শিগগিরই কাজ শুরু করবে। কিন্তু দৃশ্যত তা এখনো ঘটেনি। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু কানাঘুষা বা গুজবের সৃষ্টি হয়েছে। ভারত তার শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তাজনিত কারণে চীনা বিশেষজ্ঞ কিংবা কর্মীবাহিনীকে প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প এলাকায় আসতে দেওয়ার ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। সে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে নাকি বারবার থেমে যাচ্ছে প্রকল্পের কাজ। দিন দিন বাড়ছে প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে গুজবের পরিমাণ। সরকার বিগত একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কোনো বরাদ্দ দেয়নি বা সে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি। তাতে বিস্তীর্ণ তিস্তা এলাকার মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়। কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফরকালে বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে পারে। কিন্তু সরকার বা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি নিয়ে এখনো কিছুই বলেননি। তিস্তাপারের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কথা বলেছেন মরহুম জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানী, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু এ ব্যাপারে ঋণদানে চীন সম্মত হলেও প্রকৃত অর্থে কাজটি এগোচ্ছে না কেন? এ প্রশ্ন এখন বিস্তীর্ণ তিস্তা অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের। তাদের প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতর কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধান করবে দেশের সরকার, বহির্বিশ্বের কোনো দেশ নয়। সুতরাং বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার এ ব্যাপারে কোনো কথা বলছে না কেন?
প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনায় পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি ছাড়াও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, কৃষি জমি উদ্ধার, ফলন বৃদ্ধি এবং নদীর নাব্য বৃদ্ধি থেকে শুরু করে দুই পারে বাঁধ নির্মাণ করে সমৃদ্ধ জনপদসহ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। বলা হয়েছিল তিস্তাপারের এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে প্রাচ্যের লেকোয়ান সিটির মতো করে গড়ে তোলা হবে। কিন্তু স্থানীয় জনগণের ভাষ্য অনুযায়ী, সে স্বপ্ন বাধাগ্রস্ত হতে হতে এখন অনেকটাই হতাশা সৃষ্টি করছে। তা ছাড়া, তিস্তাপারের লালমনিরহাটে আধুনিক সামরিক বিমান ঘাঁটি গড়ে তোলা থেকে শুরু করে বিমান তৈরি ও বিমানবাহিনীর জন্য একটি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার অগ্রগতি সম্পর্কে এখন আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বিদায়ের আগে ইউনূস সরকার বলেছিল, লালমনিরহাটসহ তিস্তাপারে ভবিষ্যতে অনেক উন্নয়নের কাজ হবে। নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসলে এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবেও অনেক প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত বিজ্ঞানভিত্তিকে কাজ হবে। এ কথা ঠিক যে, গত রমজানের আগে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ঊর্ধ্বশ্বাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছু কিছু কাজ আছে যেখানে সঠিক সময়ে যথাযথ তথ্যের অভাবে যথেষ্ট গুজব বা বিতর্কের সৃষ্টি করে। দেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন্দ্রের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খবর পেতে দেশব্যাপী মানুষ সবসময়ই অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে। কারণ এগুলো আমাদের জাতির ভাগ্য বদল করে দেওয়ার মতো মহাপ্রকল্প। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প, যা ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে, সমাপ্ত হলে সেখান থেকে বছরে আমাদের ৮ হাজার কোটি টাকা উপার্জন হবে। বিদ্যুৎ, উৎপাদন, সেচ প্রকল্প ও মৎস্য চাষ থেকে সে অর্থ উপার্জিত হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় ক্ষেত্রে আমাদের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে। আগামী অর্থবছর থেকে এ মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ চালু হওয়ার সম্ভাব্য খবরে দেশবাসী আনন্দিত হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ধোঁয়াশা মানুষকে নিঃসন্দেহে হতাশাগ্রস্ত করছে। এ ব্যাপারে সরকারকে তার অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত।
অসমর্থিত সূত্রে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরকারের আসন্ন সামরিক বাজেট নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। ২৭ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে সরকারের কাছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। বিমান বাহিনীর জন্য সম্ভবত রাখা হচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকা। সে অর্থে কেনা হবে মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট-জেএফ ১৭ থান্ডার ব্লক থ্রি এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও শক্তিশালী রাডার সিস্টেম। এবং তার সঙ্গে থাকবে বিভিন্ন পাল্লার মিসাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। সে খবরে জাতি তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় গর্বিত ও নিরাপদ বোধ করে। এ আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্রশস্ত্র কারও ওপর অনৈতিক আক্রমণ চালানোর জন্য নয় বরং প্রয়োজনে আত্মরক্ষার নিমিত্তে ব্যবস্থা গ্রহণ।
বিষয় হলো তথ্য আদান-প্রদান এবং জনস্বার্থে তা প্রচার করা। তথ্যকে চাপা দিয়ে রাখা কিংবা দেশের জনগণকে কোনো তথ্য জানতে না দেওয়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের শামিল। সম্প্রতি বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন ই ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের মধ্যে তিস্তা প্রকল্প ও তার সম্ভাব্য ঋণ প্রদান নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। তা জনগণকে জানতে দেওয়া হয়নি। তবে কি তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে চূড়ান্ত হবে? সেটা প্রকাশ করলে কী ক্ষতি হতো। তাতে তিস্তা উপকূলের মানুষের দুশ্চিন্তা হয়তো অনেকখানিই লাঘব হতো, সরকারেরও বিশেষ ক্ষতি হতো না। সত্য এক দিন সামনে আসবেই।
লেখক: সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)
[email protected]
