রাষ্ট্রকে কেবল ঘটনার পর সক্রিয় হলে চলবে না। প্রতিটি থানায় শিশু সহায়তা সেল, প্রতিটি জেলায় ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, স্কুলে মনোবিজ্ঞানী এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালু করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণ বা শিশু হত্যা কোনো দলীয় বিষয় নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।...

২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে সারা দেশে তিনটি শিশু ধর্ষণের ঘটনার খবর গণমাধ্যমে ঘুরছে। গত ১৮ মে নাটোরের সিংড়ায় ৫ বছরের এক মেয়েশিশু ধর্ষণ, ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লী থানাধীন দেবীপুর এলাকায় পঞ্চম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ এবং রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ এবং নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহেই দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের খবর শিরোনাম হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন হচ্ছে? আমাদের দেশে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে মিডিয়ায় তোলপার শুরু হয়। এরপর কয়েকদিন গেলে নতুন আরও একটি ইস্যু এসে আগের যেকোনো তোলপারকে মলিন করে দিয়ে নতুন আঙ্গিকে তোলপার শুরু হয়। যথারীতি এমন প্রক্রিয়া অব্যাহতভাবে চলতেই থাকে। কখনোই তাৎক্ষণিক দ্রুত বিচার এবং কার্যকরের ঘটনা ঘটে না। আর এ কারণে ঘটে থাকে এমন পৈশাচিক বর্বরতার পুনরাবৃত্তি।
বর্তমান সরকার নারী অধিকার, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিলেও সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দৃঢ়, জবাবদিহিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ এখনো স্পষ্ট নয়। খুবই দুঃখজনক বিষয় হলো, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও যৌন সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসছে। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশুরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। তবে কতটি মাদ্রাসায় কতটি শিশু এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তার বার্ষিক পরিসংখ্যান রাখা জরুরি। যদিও এমন উদ্যোগ নিতে তেমন কোনো সংস্থা বা গোষ্ঠীকে দেখা যায় না। ফলে এমন পৈশাচিক ঘটনার বেশির ভাগই অন্তরালে থেকে যায়। যে কয়টি খবর পাচ্ছি প্রকৃত হিসাব তার চেয়ে অনেক বেশি। কোনোটির খবর আমরা পাচ্ছি, কোনোটি মোটেও পাচ্ছি না। আবার কোনোটির জন্য প্রতিবাদ হচ্ছে, কোনোটির হচ্ছে না। প্রতিবাদ হলেও সেগুলোর কাঙ্ক্ষিত সমাধান আসছে না। ধরে নিলাম, ধর্ষণের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে যে ঘটনা, তা কি প্রতিরোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়?
যতদিন থেকে ধর্ষণ প্রতিরোধে দেশের সচেতন মানুষ সোচ্চার ভূমিকায় রয়েছে, ততদিনে ধর্ষণপ্রবণতা কমে যাওয়াটাই ন্যায্য ছিল। কিন্তু তা না হয়ে বরং দিনে দিনে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সহসাই এ ঘৃণ্য প্রবণতা থামবে কি না তা বলা মুশকিল।
নারী কিংবা শিশু ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃকও নারী শ্লীলতাহানির ঘটনার নজির আছে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিবাদ হলে সংশ্লিষ্টরা সাময়িক বরখাস্ত হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চূড়ান্তভাবে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয় না। এমনকি দেখা গেছে যে, ধর্ষিতার পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা পেতে হয়রানির শিকার হতে হয়। নানা কটূক্তি ও ভয় প্রদর্শন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেই। তাহলে কীভাবে জনগণের আস্থা অর্জন করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী? এ ছাড়া আমরা দেখেছি, অপরাধী প্রভাবশালী হলে ধর্ষিতা বা নির্যাতিত থানায় মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে বরং নানা ধরনের অজুহাতের ভিত্তিতে পাল্টা হয়রানি চলতে থাকে। সাম্প্রতিককালেও আমরা এমন নজির অবলোকন করেছি।
যৌন নিপীড়নের ঘটনা আদালতে পরিচালনাকারী আইনজীবী ও মানবাধিকার অভিজ্ঞতা মতে, ধর্ষণ মামলায় মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের শেষ পর্যন্ত সাজা হয়। অথচ, আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে এসব মামলা শেষ করার কথা থাকলেও তা গড়ায় বছরের পর বছর। এমন পরিস্থিতিতে ধর্ষণ বাড়াটাই স্বাভাবিক। কাজেই রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এমন ধর্ষণপ্রবণতা কিংবা নিপীড়নের ঘটনা চলতেই থাকবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নয়, দেশের প্রতিটি মানুষকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকায় দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যমান আইনের সংস্কার এবং তা দ্রুত প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে না পারলে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাটি খুব বেশি অমূলক হবে না।
এ ধরনের অপরাধ কেন বাড়ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে বেশ কয়েকটি উত্তর মাথায় আসে। প্রথমত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভয়ংকরভাবে বেড়েছে। অনেক ঘটনায় গ্রেপ্তার হলেও বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে গেছে। তারা জানে, কিছুদিন পর ঘটনাটি মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পরিবারে মূল্যবোধ শিক্ষা কমছে, সহিংসতা ও নারীবিদ্বেষমূলক ভাষা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। অনলাইনে ঘৃণামূলক ও বিকৃত মানসিকতার কনটেন্ট সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণাত্মক ও সহিংস ভাষা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করছে।
তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সংকট বড় কারণ। অর্থনৈতিক চাপ, মাদক, পারিবারিক সহিংসতা, হতাশা- এসব মিলিয়ে সমাজে বিকৃত আচরণ বাড়ছে। পল্লবীতে দুই শিশুকে হত্যার ঘটনায়ও পুলিশ পারিবারিক কলহ ও অর্থনৈতিক সংকটের বিষয় উল্লেখ করেছে।
চতুর্থত, শিশু সুরক্ষায় আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। অনেক বাসা, স্কুল, মাদ্রাসা, পরিবহন বা কর্মস্থলে শিশু নিরাপত্তা নীতিমালা নেই। এমনকি অধিকাংশ শিশু জানেই না কোন আচরণ বিপজ্জনক, কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে।
তাহলে কি কেবল কঠোর শাস্তি বিধান সমাধান? বাংলাদেশে প্রায়ই ধর্ষণের শাস্তি কঠোর করার দাবি ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু মৃত্যুদণ্ড দিলেই অপরাধ কমে না। বিশ্বের অনেক দেশে কঠোর শাস্তির পাশাপাশি দ্রুত বিচার, সামাজিক নজরদারি, মানসিক চিকিৎসা, শিশু সুরক্ষা শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং একসঙ্গে কাজ করে।
রাষ্ট্রকে কেবল ঘটনার পর সক্রিয় হলে চলবে না। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি থানায় শিশু সহায়তা সেল, প্রতিটি জেলায় ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, স্কুলে মনোবিজ্ঞানী এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালু করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণ বা শিশু হত্যা কোনো দলীয় বিষয় নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আজ যে শিশুটি নিহত হলো, সে শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়; সে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ছিল। একটি শিশু যখন নিরাপদ থাকে না, তখন কোনো রাষ্ট্রই সভ্য দাবি করতে পারে না। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ দেখাব, নাকি শিশুদের জন্য সত্যিকার অর্থে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ব? কারণ, প্রতিটি বিলম্বিত পদক্ষেপের মূল্য দিচ্ছে একটি নিষ্পাপ শিশু।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
