শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ এটা কি শুধুই কথার কথা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিশুস্বাস্থ্য, শিশুদের নিরাপত্তা, লেখাপড়ার সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। উন্নত দেশে শিশুদের ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর আমাদের দেশে শিশুরাই সবচেয়ে অবহেলিত।...

মাত্র তিনটি ঘটনা উল্লেখ করি। এক. ফাতিমা আর খাদিজা। দুই বোন। হামে আক্রান্ত ফাতিমা মারা গেছে। খাদিজা ভর্তি আছে নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে। হামে আক্রান্ত যমজ মেয়েদের নিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাবা-মা ছুটছেন হাসপাতালে। ফাতেমা মারা যায় ২৩ এপ্রিল। খাদিজার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় বাসায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দেওয়ায় তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দুই. এরাও যমজ। রাইসা ও রুমাইসা। ফরিদপুরের বাসিন্দা। ফরিদপুরে পিআইসিইউ নেই। তাই দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলেন বাবা-মা। সকালে ফরিদপুর সদর হাসপাতাল থেকে তারা ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছান। বেলা ১১টার দিকে রাইসা মারা যায়। দেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় দুই সন্তানকে কোলে নেওয়া অবস্থায় অসহায় বাবা-মায়ের ছবি ছাপা হয়েছে। খবরের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘যমজ সন্তান কোলে মা-বাবা, একটি মৃত, অনটি অসুস্থ!’
তিন. রোগীর চাপ বেশি। কোনো হাসপাতালেই সিট খালি নেই। বাধ্য হয়ে একটি হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতে শিশু আব্দুল্লাহর চিকিৎসা চলছে। একই পরিবারের আরেকটি শিশুর নাম আলিফ। তাকে ভর্তি করা হয়েছে অন্য একটি হাসপাতালে। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি অটোরিকশাচালক সাইফুল ইসলাম রাজধানীর কামরাঙ্গীচর এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। প্রচার মাধ্যমে সাইফুল বলেছেন, ছোট ছেলের অবস্থা ভালো নয়। সারা শরীরে ফুসকুড়ি বেরিয়েছে। ঠোঁট ও মুখের অবস্থা করুণ। মুখের ফুসকুড়ি ফেটে ঘা হয়েছে। শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। অক্সিজেন ছাড়া শ্বাস নিতে পারছে না। চিকিৎসকের পরামর্শ, জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নিতে হবে। আইসিইউ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে মেঝেতে রেখে মুখে অক্সিজেন লাগিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সাইফুল বললেন, আমি গরিব মানুষ। সন্তানদের চিকিৎসার জন্য টাকা জোগাড় করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আল্লাহ জানেন আমাদের ভবিষ্যৎ কী?
চার. সাত হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো গেল না ছোট্ট শিশু সাজিদকে। ১৪ এপ্রিল সাজিদ জ্বর, সর্দিকাঁশিতে আক্রান্ত হয়। প্রথমে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে সাজিদকে নেওয়া হয়। পরে ফেনীর একটি হাসপাতালে নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি না হওয়ায় ঢাকায় আনা হয়। একে একে সাতটি হাসপাতালে নেওয়ার পরও সাজিদকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।
এ পর্যন্ত সারা দেশে হামে আক্রান্ত প্রায় ৫০০ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। বাবা-মায়েরা অসহায় চোখে ছোট ছোট সন্তানদের করুণ মৃত্যু দেখেছেন, এখনো দেখছেন। চোখের সামনে ছেলেমেয়েদের মৃত্যু হচ্ছে। কারও কিছুই করার নেই। জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। তাই বলে এমন করুণ মৃত্যু কি মেনে নেওয়া যায়? কারও অযত্ন, অবহেলায় শিশুদের এমন অসহায় করুণ মৃত্যু হচ্ছে না তো? আসলে যার যায় সেই বোঝে ক্ষতিটা কেমন? সেজন্যই বোধকরি এত শিশুর মৃত্যুর পরও উচ্চপর্যায়ে তেমন হইচই, টেনশন, উদ্বেগ উত্তেজনা চোখে পড়ছে না।
শিশুদের অকাল মৃত্যু তাহলে কি গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল? তা না হলে এই যে প্রতিদিন হামে এত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, এর পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? প্রতিদিনই প্রচারমাধ্যমে শিশুদের করুণ মৃত্যুর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার হচ্ছে। আহা! উহু করছেন অনেকে। কিন্তু হামের বিস্তার রোধে এখন পর্যন্ত সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। শিশু সন্তান যে কোনো পরিবারের ‘সাত রাজার ধন’। একটি পরিবারকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতে একজন শিশুর উপস্থিতিই যথেষ্ট। সারাক্ষণ দৌড়ঝাঁপ, একজনের কোল থেকে অন্যজনের কোলে বিচরণ। ছোট হাত, ছোট মুখে কী যে মায়া। একজন শিশুই পরিবারের সবাইকে ব্যস্ত রাখতে সক্ষম। হঠাৎ যখন শিশুটি হারিয়ে যায় তখন তার পরিবারের ওপর পাহাড়সম মানসিক যন্ত্রণা ও করুণ হাহাকার ভর করে।
হামে আক্রান্ত প্রায় ৫০০ শিশুর করুণ মৃত্যু আমাদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছি। বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির কারণে দেশে হামের বিস্তার ঘটেছে। অথচ এ ব্যাপারে কার্যত: কাউকেই জবাবদিহি করা হয়নি। দেশে টিকা সংকট ও হামে শিশু মৃত্যুর তদন্ত শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন পত্রিকা ও প্রচারমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। সরকার বলছে, হামের টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইউনিসেফ এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নিশ্চুপ। শুধু এ কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সহ স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত, বিভিন্ন মহল থেকে এই দাবি তোলা হলেও কার্যত এই দাবি অনেকটাই উপেক্ষিত।
হামে আক্রান্ত শিশুদের করুণ মৃত্যু অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ এটা কি শুধুই কথার কথা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিশুস্বাস্থ্য, শিশুদের নিরাপত্তা, লেখাপড়ার সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একবার সিঙ্গাপুরের রাস্তায় দেখলাম রাস্তা পার হবে একটি শিশু। ট্রাফিক পুলিশ তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শিশুটি যতক্ষণ না রাস্তা পার হলো ততক্ষণ রাস্তায় গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকল। উন্নত দেশে শিশুদের ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর আমাদের দেশে শিশুরাই সবচেয়ে অবহেলিত। সরকার বদল হলে শিশুদের পাঠ্যপুস্তকের ভাষা বদল হয়। দেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের স্কুলে খেলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মফস্বল শহর ও গ্রামীণ জনপদে শিশুস্বাস্থ্য ও শিশুদের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রগুলো বেশ নড়বড়ে। হামে এ পর্যন্ত যত শিশুর মৃত্যু হয়েছে তারা অধিকাংশই মফস্বল শহর ও গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দা। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। ফলে তাদের মৃত্যু নিয়ে ওপর মহলের বোধকরি তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। উদাহরণ টানতে গিয়ে একজন মনোবিদ বললেন, হামে গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকার কোনো শিশু যদি মারা যেত তাহলে প্রতিক্রিয়াটা অন্যরকম হতো। দুর্ভাগ্য, এই দেশে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও ধনী ও গরিব পরিবারের বিভাজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হামে শিশুদের করুণ মৃত্যুর কথা যখন লিখছি তখন চোখের সামনে ভাসছে পাশবিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণকারী আরেক অসহায় শিশু রামিসার মুখ। শুধু দেশে নয়, গোটো বিশ্বে রামিসার মৃত্যু নিয়ে হইচই শুরু হয়েছে। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ আসলে কী? উত্তর কার কাছে খুঁজব?
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
সম্পাদক, আনন্দ আলো
