অবিলম্বে সারা দেশে বিশেষ করে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা, যেন কোনো শিশুই টিকার বাইরে না থাকে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা- ঘনবসতি, দুর্গম অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।...

দেশে হামের চলমান মহামারি একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে রূপ নিয়েছে। হামের ব্যাপকতা এত বেড়েছে যে, হামের টিকা আগে নিয়েছে এমন শিশু এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদেরও সংক্রমিত করেছে। এ মৃত্যুগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল যদি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হতো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার-কর্তৃক টিকা কেনা নিয়ে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, জনস্বাস্থ্যের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা প্রভৃতি হামের মহামারিকে ডেকে এনেছে এবং ইপিআই কর্মসূচিকে দুর্বল করেছে বলে আমরা মনে করি। যারা প্রতিরোধযোগ্য এ শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী, তাদের ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত যে ২২৩ জন শিশু হামে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা দ্বারা নিশ্চিত হওয়া গেছে ৩৮ জন, বাকি শিশুরা হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। হামে ভুগেছে ও এখনো ভুগছে প্রায় ৩০ হাজার রোগী। এই মুহূর্তে হাম নিয়ে হাসপাতালে আছে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ। এসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে পাওয়া। হামে সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। তাই প্রায় সব মৃত্যুই শিশুদের মধ্যে ঘটেছে।
দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট, যা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা ও টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। হাম একটি সংক্রামক রোগ, যা প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে যে কয়েকটি জরুরি করণীয়
প্রথমত, অবিলম্বে সারা দেশে বিশেষ করে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা, যেন কোনো শিশুই টিকার বাইরে না থাকে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা- ঘনবসতি, দুর্গম অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) গত ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। ২০ এপ্রিল থেকে গণটিকা অভিযান শুরু করেছে। টিকার স্বল্পতার কারণে প্রথমে শুধু উপজেলা হাসপাতাল পর্যায় পর্যন্ত টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা ও শিশুকে আমন্ত্রণ করে বাড়ির কাছে টিকাকেন্দ্র স্থাপন করে (আউটরিচ সেন্টার) টিকা না দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে বিশেষ ‘হাম কর্নার তথা সংক্রামক ব্যাধি কর্নার’ চালু করা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শনাক্ত শিশুদের বিশেষ করে প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের সরকারি চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে, শিশুর পরিবারকে উপযুক্ত সামাজিক সহায়তা দিতে হবে, যেন তারা চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত না হয়। প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা জ্বরে আক্রান্ত হলেও সামর্থ্যের অভাবে অভিভাবক শিশুকে প্রথম পর্যায়েই চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে না, বিনা চিকিৎসায় শিশুর অবস্থা জটিল হয়। তখন তার অভিভাবকরা ঘটিবাটি বিক্রি করে মরণাপন্ন শিশুকে নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হন। এটা ঠেকাতে হলে চিকিৎসা সুবিধার বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুব্যবস্থা থাকতে হবে। কাছেই সুসংগঠিত মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান (উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) থাকতে হবে। মহানগরীতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে হবে। মহানগরীতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশেষায়িত তৃতীয় পর্যায়ের সেবা একই হাসপাতালে দেওয়ার নামে জগাখিচুড়ি, বিশৃঙ্খল, মেঝেতে রোগী রেখে চিকিৎসার নামে প্রহসন বন্ধ করতে হবে। গ্রাম ও শহরে এ ধরনের স্তরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থার পুনর্গঠন করলে একদিকে জটিল রোগীর সংখ্যা কমে যাবে, অপরদিকে হামের লক্ষণযুক্ত শিশুরা আইসোলেশনে থাকার কারণে রোগের সংক্রমণেরও নিয়ন্ত্রণ হবে।
তৃতীয়ত, টিকা নিয়ে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও গুজব মোকাবিলায় জনসম্পৃক্ত কার্যকর প্রচার কার্যক্রম চালু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, একটি শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, দ্রুত মোকাবিলা কার্যক্রম ও জনস্বাস্থ্যের জরুরি অপারেশন কেন্দ্র সচল করা, যাতে দ্রুত নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। শনাক্ত শিশুদের ওপরে বর্ণিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হবে।
পঞ্চমত, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আহ্বান করা। হামের সংক্রমণ ক্ষমতা খুবই বেশি (১২-১৮ গুণ)। গায়ে লালচে দানা (র্যাশ) দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকেই রোগ ছড়াতে শুরু করে। একটি শিশুর মাধ্যমে পুরো কমিউনিটি আক্রান্ত হতে পারে। জটিলতা: নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব, মস্তিষ্কের প্রদাহ, মৃত্যু। হাম হলে শিশুর শরীরে গড়ে ওঠা আগের প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যেতে থাকে। পুষ্টি ও ভিটামিন এ কার্যক্রম জোরদার করা উচিত। অপুষ্ট শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধপান ও পুষ্টি কর্মসূচি শক্তিশালী করা জরুরি। স্বাস্থ্য সংস্কার বাস্তবায়ন ও বাজেট বৃদ্ধি করা খুব দরকার। সে ক্ষেত্রে বাজেটের ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়া দরকার। স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়/ বিভাগ/ প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি হাম নির্মূল কৌশলপত্র পুনরায় সক্রিয় করা এবং ভ্যাকসিন সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা দরকার। ভ্যাকসিন উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান (আইপিএইচ)-এর ভ্যাকসিন উৎপাদন সক্ষমতা পুনঃস্থাপন করা দরকার। ভবিষ্যতে এ ধরনের জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি বা স্বাস্থ্য দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি চালু করা। উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার চালু আছে। স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আইন ও বিধি দ্বারা তা নিশ্চিত করা জরুরি।
উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালসমূহে ১০০ শয্যা ও জেলা পর্যায়ে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী হাসপাতালগুলোতে শয্যা অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং শহরাঞ্চলেও স্বাস্থ্যসেবায় অনুরূপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র করতে হবে।
এ সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভিভাবক, সমাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যেন আর কোনো শিশুকে প্রতিরোধযোগ্য এ রোগে প্রাণ হারাতে না হয়। প্রতিরোধযোগ্য রোগ হাম সংক্রমণে চার শতাধিক শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তাদের মা-বাবা-প্রিয়জনদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানাচ্ছি। যেসব শিশু এখনো চিকিৎসাধীন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। যেসব চিকিৎসক, নার্স, টিকাকর্মী, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সব সেবাদানকারী যারা শিশুদের রোগমুক্তির জন্য হাসপাতাল ও মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সদস্য, ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ
