সংকটকালীন প্রত্যাবাসনের জন্য সরকারের উচিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাল্ক-সিট চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা; আটকে পড়া স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জন্য রাজস্ব বাজেট থেকে বিমান ভাড়ায় ভর্তুকি দেওয়া; প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের (পিকেবি) সংকটকালীন ঋণ সম্প্রসারণ করা।...
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা, ইরান এবং সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী অভিবাসীদের জন্য এবং বিশেষ করে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য একটি তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি করে। আইওএমের সহায়তায় একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে আজারবাইজান হয়ে ইরান থেকে ১৮৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ইরানের এয়ারপোর্টগুলো আক্রান্ত এবং এয়ারস্পেস বন্ধ থাকায় স্থলপথে ইরান-আজারবাইজান সীমান্ত দিয়ে অভিবাসীদের পার করিয়ে পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে বাকু থেকে ঢাকায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি ছিল বাস্তবসম্মত এবং এটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস দুটি ব্যাচে ইরান থেকে আরও ১৪ জন বাংলাদেশি নাগরিককে সফলভাবে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। এ প্রত্যাবাসন পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপূর্ণ সময় বা জরুরি অবস্থাকেই প্রতিফলিত করে। যদিও ইরানে বাংলাদেশিরা কেউ হতাহত হননি, তবে যুদ্ধের ফলে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বাংলাদেশিদের হতাহতের ঘটনা সামগ্রিকভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যদিও অভিবাসীদের সহায়তা প্রদানে বাংলাদেশি দূতাবাস ও শ্রম শাখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বড় আকারের সংকট মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা সীমিত। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইরান বাংলাদেশিদের জন্য কোনো প্রচলিত শ্রমবাজার নয়। সাধারণত কিছু শিক্ষার্থী, পর্যটক ও স্বাস্থ্যসেবাপ্রত্যাশীরা সেখানে যাতায়াত করেন। যুদ্ধের আগে এই সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২০০০ জন। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এখনো আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বাংলাদেশ প্রস্তুত কি না? বিশেষ করে ইউএই এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রে কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন। ২০১১ সালে লিবিয়ায় সিভিল ওয়ার সংঘটিত হওয়ার সময়ও বাংলাদেশের একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল, প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিককে সে সময় প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। সেই সংকটের পরও বাংলাদেশ অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেনি। ফলে, যখনই কোনো নতুন সংকট দেখা দেয়, সরকার যথাযথ প্রস্তুতি বা বাস্তবায়ন কৌশল ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে প্রতিক্রিয়া জানায়। এটা ভয়ার্ত পরিস্থিতি এবং উচ্চ খরচের কারণ হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, পূর্ববর্তী অভিবাসী সংকটগুলো থেকে আমরা আসলে কী শিক্ষা পেয়েছি?
যুদ্ধকালীন সময়ে সক্রিয় বোমাবর্ষণের মধ্যে কাটানোর দুঃসহ পরিস্থিতি এবং সৃষ্ট মানসিক আঘাত যা অনেকের ক্ষেত্রেই ট্রমার সৃষ্টি করেছে। দেশে ফিরতে পেরে খুশি হলেও, কিছু প্রত্যাবর্তনকারী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন হচ্ছেন। বকেয়া বেতন, ইরানে ফেলে আসা সম্পদ এবং প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনঃএকত্রীকরণ নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। কারণ তাদের প্রায় সবাই বেকার হয়ে পড়েছেন। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে ইরানি নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে বকেয়া মজুরি প্রাপ্তি ও প্রতিকারের সম্ভাবনা রয়েছে ক্ষীণ।
যুদ্ধের কারণে এ পর্যন্ত অন্তত নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। ইরানের বাইরে জিসিসি রাষ্ট্রে কর্মরত এ পর্যন্ত নয়জন বাংলাদেশির মৃত্যুবরণ করার ঘটনা সামগ্রিকভাবে পুরো রিজিয়নে অবস্থানরত অভিবাসীদের শারীরিক নিরাপত্তার অভাব ও ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরে। এ ছাড়া লেবাননে ইসরায়েলি হামলা চলমান থাকায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যাপক হুমকির সম্মুখীন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। জিসিসি সরকার এখন পর্যন্ত সংঘাতে নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেনি। যুদ্ধে নিহত অভিবাসীদের জন্য গন্তব্য দেশের সরকারি ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি কার্যকর করার জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে কি না? তবে এটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থায় না পাওয়া গেলে বহুপক্ষী ফেরামে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে।
লেবাননে কর্মরত বাংলাদেশি প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি চাকরি হারিয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমিকরা ও ব্যাপক মজুরি কর্তনের স্বীকার হচ্ছেন। নিয়োগকর্তাদের আয় কমে যাওয়ায় প্রতি মাসে ৪-৫ দিন বেতন প্রদানে বিলম্বের ঘটনা জানিয়েছেন অনেকেই। বিভিন্ন খাতে রেগুলার কাজের শিফট বা ডিউটি আওয়ার কমে গেছে। এ ছাড়া ওভারটাইমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা অভিবাসী শ্রমিকদের আয়ে প্রভাব ফেলেছে। ফ্রি ভিসায় কর্মরত শ্রমিকরা যেহেতু সম্পূর্ণরূপে দৈনিক কাজের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল; এখন তাদের অনেকেরই কোনো আয় নেই। সংঘাতের আগে দেশত্যাগকারী পূর্ব-অনুমোদিত ছুটিতে বাংলাদেশে আসা শ্রমিকরাও সময়মতো ফিরতে পারছেন না- তাদের চাকরি এবং ভিসার অবস্থা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেকে অতিরিক্ত বিমান ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সশস্ত্র সংঘাত বা যুদ্ধকালীন বেতন প্রদান নিশ্চিত করার জন্য কোনো দ্বিপক্ষীয় মজুরি সুরক্ষাব্যবস্থা নেই।
অভিবাসী শ্রমিকরা ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের স্বীকার হচ্ছেন। রামরু কর্তৃক সম্পাদিত ইন্টারভিউয়ের সময় অনেক শ্রমিক তা অবহিত করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘যেটা আমরা ৪০০-৪৫০ দিরহামে চালাতে পারতাম, এখন তার জন্য প্রায় ৬০০ দিরহাম খরচ হয়। সবকিছুর দাম বেড়েছে; বিশেষ করে খাদ্যের, কারণ এর বেশির ভাগই আমদানি করা হয়।’ কিছু ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
যেসব শ্রমিক দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিট কেটেছিলেন, আকাশপথ বন্ধ থাকায় তারা আটকা পড়েন। অন্যরা দেখছিলেন ইউরোপীয় নাগরিকরা নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন। অথচ তাদের কাছে তুলনীয় কোনো বিকল্প ছিল না। গবেষণায় দেখা যায়, জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাবর্তন এবং যুদ্ধের কারণে অভিবাসন করতে না পারা অনেক অভিবাসীর জন্য সুইসাইডাল পরিস্থিতি তৈরি করার শঙ্কা রয়েছে। রেমিট্যান্স উপার্জনকারীদের হঠাৎ করে ফেরত আসা বা বিদেশে কাজ হারানোর ফলে রেমিট্যান্স নির্ভর পরিবারসমূহ অর্থনৈতিক সংকটে আপতিত হয়েছে। অতিমাত্রায় রেমিট্যান্স নির্ভরতা এবং আগে পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে সঞ্চয় না করতে পারা পরিবার এবং গ্রামীণ অর্থনীতি তদুপরি জাতীয় পর্যায়ে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের বাইরের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত সরাসরি অভিবাসীনির্ভর পারিবারিক অর্থনীতি ও গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ভালো থাকাকে ব্যাহত করতে পারে। যুদ্ধ চলতে থাকলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ব্যবসায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারিভাবে ইরান থেকে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশি আটকেপড়া নাগরিকদের ফেরত এনেছে। ইরানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে আটকে পড়া অভিবাসীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং ইরান থেকে জরুরি প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগকে স্বয়ং অভিবাসী, তাদের পরিবারের সদস্য, অভিবাসী অধিকার কর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গভীরভাবে প্রশংসা করেছেন। আমরা তেহরান, আঙ্কারা, জেনেভা ও আজারবাইজানে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলোর ভূমিকার গভীর প্রশংসা করি এবং নিঃসন্দেহে সেখানকার কর্মকর্তারা এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজতর করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। ইরান থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের দ্রুত পুনর্বাসনের জন্য একটি জাতীয় পুনর্বাসন নীতি বাস্তবায়নের সুপারিশ করছি।
সংকটকালীন প্রত্যাবাসনের জন্য সরকারের উচিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাল্ক-সিট চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা; আটকে পড়া স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জন্য রাজস্ব বাজেট থেকে বিমান ভাড়ায় ভর্তুকি দেওয়া; প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের (পিকেবি) সংকটকালীন ঋণ সম্প্রসারণ করা।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
