মানুষটিকে আরও বেশি মানবিক হতে হবে নিশ্চয়। আমাদের অমানবিক আনন্দে শুধু অন্য প্রাণী কেন, মানুষও কষ্ট পায়, নির্যাতনের শিকার হয়, মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করে। এটি বন্ধ করা জরুরি এবং সেজন্য রাষ্ট্রকে যদি কঠোর হতে হয়, হবে। আমি মনে করি তা মানুষ এবং অন্য প্রাণী, সবার জন্য মঙ্গল এবং আশীর্বাদের।...
প্রতি বছর নববর্ষে, তা ইংরেজি কিংবা বাংলা, আমাদের খুব আনন্দ বেড়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশীর ঘুম কিংবা অসুস্থতা আমাদের একটুও ভাবাতে পারে না। টলাতে তো নয়ই। বহু প্রাণী (বিশেষ করে ছোট আকারের পাখি) তাদের জীবন হারাবে। আমরা তবু আনন্দ করব। হয়তো কারও বাড়িতে রয়েছে একটি নবজাতক, কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা অন্য কেউ। থাকতে পারে খুব অসুস্থ কোনো রোগী। পাশেই হয়তো রয়েছে কোনো হাসপাতাল। যাদের ভালো ঘুম দরকার, শব্দের বাইরে থাকা দরকার, শান্ত একটি পরিবেশ দরকার। সে বিবেচনা আমরা কখনো করি না। আমরা নববর্ষ পালন করি, কোনো মানবিক বিবেচনা ছাড়া। করি এক বিশেষ কায়দায়। পটকা, আতশবাজি ফুটিয়ে। আমাদের অমানবিকতার মধ্যে একটু পশ্চিমা পশ্চিমা ভাব আসে। যেন পশ্চিমারা এসব করে। করে, সে কথা ঠিক। কিন্তু আমাদের মতো করে নয়। আমি নিশ্চিত, তারা কোনো ঘনবসতি এলাকায় এটি করে না। বাড়িতে বাড়িতে তো নয়-ই। তাদের আতশবাজিতে পশুপাখি আক্রান্ত হবে কিংবা হতে পারে, এমনকি এসব প্রাণী আতঙ্কিত হতে পারে, তেমন কাজ তারা করবে না। নববর্ষ পালন করতে গিয়ে, কিংবা তাদের কোনো অনুষ্ঠানের কারণে কোনো প্রাণী বা পাখি মারা যাবে, তা তারা করে না। যদি এমন ঘটনা ঘটেও যায় কখনো, তারা খুব খতিয়ে দেখবে এবং সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজনে ওই অনুষ্ঠান পরবর্তীতে আর নাও হতে পারে কিংবা হতে পারে কোনো বিকল্প কিছু। আশ্চর্যের বিষয়, আমরা তাদেরই নববর্ষ পালন করলাম অন্য প্রাণীদের প্রতি মানবিক গুণ বর্জন করে। আমরা চিন্তাও করলাম না কিংবা গুরুত্বই দিলাম না শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষের বিষয়গুলো। এসব আচরণ বিবেচনায় নিয়ে, আমরা কীভাবে বলি, মানুষ সেরা জীব! আশ্চর্য রকমের বড়াই ছাড়া সেটা কিচ্ছু নয়। আমাদের এ অমানবিক অসভ্যতার চর্চা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মারাত্মকভাবে চলে। বছরে একটি কনসার্ট তাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে। বহু ক্ষেত্রে অনেক রাত পর্যন্ত চলে তা। অন্যের অসুবিধার বিষয়টি আমাদের শিক্ষার্থী কিংবা প্রশাসন কেউ বিবেচনা করে না।
খুব গালভরা বুলি আমাদের, সবার উপরে মানুষ (নাকি বাংলাদেশের মানুষ?) সত্য, তার উপরে নাই। কবি মানুষের মানবতার কথা বলেছিলেন ঠিক, মানুষকে সাহায্যের জন্য বলেছিলেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, অন্য প্রাণীর অবস্থান আমাদের থেকে কিছু কম। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার, অন্য প্রাণীর প্রাণ আমাদের প্রাণের সমান। তাদের ক্ষুধা আছে। বাঁচার সাধ আছে। অধিকার তো আছেই। অথচ আমরা নিজেদের সেরা দাবি করে অধমের অধম হয়ে যাই আমাদেরই আচরণে। মুখে বলি যা, প্রমাণ করতে পদে পদে ব্যর্থ হই তা। এবং আজীবন আমাদের এই চর্চাটি চলতে থাকে। শীতের পাখি আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খাবারের প্লেটে কবে উঠবে সেকথা আমরা আয়েশ করে পরিবার নিয়ে আলোচনা করি। ওদের সৌন্দর্য আমাদের চোখে পড়ে না। ওদের জীবন আমাদের ভাবায় না। অথচ ওদের তো আমাদের মতোই স্বপ্ন থাকার কথা। এখন কারও মনে হতে পারে, অন্য প্রাণীদের স্বপ্ন থাকার কথা নয়। তাদের নাকি অত বোধ নেই। তেমন ভাবনা কারও মনে এলে আমি বলব, এটি একচেটিয়া সিদ্ধান্ত। নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবাও কোনো সুস্থ মানুষের লক্ষণ নয়। ভালো কথা তো নয়ই। তাতে অহংকারই প্রকাশ পায়। মানে, আমি যেহেতু মানুষ, তাই আমি যা বলব তাই ঠিক। বিষয়টি হাস্যকর এবং অমানবিক। মনে রাখা দরকার, অন্য প্রাণীরও স্বপ্ন থাকা স্বাভাবিক। কারণ সে বাঁচতে চায়। এবং সে তার মতো করে নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমরা তা জানতে কিংবা বুঝতে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ। ওদের স্বপ্নই যদি না থাকে, একটি পাখি কিংবা একটি পোকা কেমন করে অন্য পাখি বা পোকার সঙ্গে জুটি বাঁধে? ছেলেপুলের বাবা-মা হয়? কেমন করে তার শিশুকে আগলে রাখে বুকে? বিষয়টি ভাবা দরকার। অযথা অন্য প্রাণীর ওপর নির্যাতন তাই একটি মানুষের ওপর নির্যাতনেরই সমান। সাংঘাতিক অসভ্যতা এটি। সব প্রাণীর শান্তিতে বসবাসের অধিকার আছে। থাকতে হবে। আমাদের আনন্দের খাতিরে নিরীহ প্রাণী হত্যা কিংবা তাদের ওপর অত্যাচারের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট মানুষের শাস্তি পেতে হবে। আবার, আপনার আনন্দের জন্য, প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? যদি আপনার ঘরেই থাকত কোনো বুড়ো মানুষ, হার্টের রোগী, শিশু ইত্যাদি তাহলে নিশ্চয় আপনি তাদের সঙ্গে এ অমানবিক আচরণ করতেন না। জেনে-বুঝে এমন কিছু করতেন না, যাতে তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। তাহলে অন্যের বিষয় কেন আপনার বিবেচনায় থাকবে না? নাকি নিজের জন্য সব ঠিক? তাই যদি হয় তবে কেমন মানুষ আপনি? তা তো হতে পারে না। হতে দেওয়া উচিত নয়। সবার ওপরে মানুষ যদি সত্য হয় (আসলে বিতর্কে গেলে তা নয়; বরং সবাই সমান। অন্য প্রাণীসহ), তবে মানুষটিকে আরও বেশি মানবিক হতে হবে নিশ্চয়। আমাদের অমানবিক আনন্দে শুধু অন্য প্রাণী কেন, মানুষও কষ্ট পায়, নির্যাতনের শিকার হয়, মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করে। এটি বন্ধ করা জরুরি এবং সেজন্য রাষ্ট্রকে যদি কঠোর হতে হয়, হবে। আমি মনে করি তা মানুষ এবং অন্য প্রাণী, সবার জন্য মঙ্গল এবং আশীর্বাদের।
লেখক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং সভাপতি, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
