আমরা কি সহিংস ও অবিশ্বাসের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারব, নাকি বারবার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাব? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয়তার ওপর। এ নির্বাচন কি নতুন আস্থার জন্ম দেবে, নাকি আরও একটি বিতর্কের অধ্যায় তৈরি করবে- তা এখনো বলা কঠিন।...

বাংলাদেশ ২০২৬ সালের শুরুতেই এক বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বিষয়টি শুধু আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এ উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একজন সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী ও ছাত্র-জনতা আন্দোলনের পরিচিত মুখ প্রকাশ্য রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হওয়ায় জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনি মাঠ যদি প্রার্থীর জন্যই নিরাপদ না হয়, তবে সাধারণ ভোটারের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? এ প্রশ্নের মধ্যদিয়েই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বা ভোটকেন্দ্র পাহারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এ ধারণার অর্থ অনেক বিস্তৃত। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর সমানভাবে প্রচারের সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ, বিচারব্যবস্থার অরাজনৈতিক ভূমিকা, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং ভয়মুক্ত নাগরিক অংশগ্রহণ প্রভৃতি মিলিয়ে একটি আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। নির্বাচনকে সেখানে একটি রাজনৈতিক উৎসব হিসেবে দেখা হয়, ভয়ের উপলক্ষ হিসেবে নয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা বরাবরই উল্টো চিত্র দেখেছি। নির্বাচন এলেই এক ধরনরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। পাল্টাপাল্টি হুমকি-ধমকি, আক্রমণ, সহিংসতা সর্বসাধারণকে অনেক সময় শঙ্কিত করে তোলে। এবারও সে ধরনের উদ্বেগ ও উত্তেজনার বাইরে সাধারণ মানুষ নেই।
তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সহিংস ঘটনা, সভা-সমাবেশে বাধা এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণের অভিযোগ দেখাচ্ছে যে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই একটি অসম ও অনিরাপদ কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনা শুধু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নই তোলে না; এটি নির্বাচনকালে তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করে।
সরকার এবং নির্বাচন কমিশন বারবার আশ্বাস দিচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রভৃতি বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এসব পদক্ষেপ তখনই কার্যকর হয় যখন জনগণ বিশ্বাস করে যে, এগুলো কোনো পক্ষের স্বার্থে নয়, বরং সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে। শুধু শক্তি প্রদর্শন বা নিরাপত্তা বলয় দিয়ে আস্থা তৈরি হয় না; আস্থা তৈরি হয় আচরণ, সিদ্ধান্ত ও নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর। নির্বাচনি সময়কালে সরকারি সম্পদের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে কার্যকরভাবে পরিচালনা- এসবই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের মৌলিক উপাদান। সেখানে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেবে কি, নেবে না, সে প্রশ্ন ওঠে না; প্রশ্ন থাকে কে কতটা ভালোভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারল কিংবা জনগণ কতটা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করল।
বাংলাদেশে সেই জায়গাটিতেই ঘাটতি সবচেয়ে স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-হামলা, প্রশাসনের পক্ষপাতের অভিযোগ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক অনাস্থা একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ফলে নির্বাচন এলেই আলোচনার কেন্দ্রে আসে ফল নয়, বরং পরিবেশ। জনগণের বড় একটি অংশ এখনো নিশ্চিত নয় যে তারা চাপ ও ভয় ছাড়াই ভোট দিতে পারবে কি না। এ অনিশ্চয়তাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের সবচেয়ে বড় শত্রু।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক আহ্বানও মূলত এ জায়গাটিকেই স্পর্শ করছে। তারা বারবার বলছে, সহিংসতা পরিহার, মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণযোগ্য হয় না। ইতিহাস দেখায়, যেসব দেশে নির্বাচনকে ঘিরে আস্থা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এ নির্বাচন তাই একটি মোড় পরিবর্তনের সুযোগও বটে। সরকার যদি সত্যিই একটি বিশ্বাসযোগ্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে চায়, তবে তাকে শুধু নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক আস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সহিংসতার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ও নিরপেক্ষ বিচার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যকর স্বাধীনতা- এসবই সেই আস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল ভোটের আগে বা পরে ঘটে এমন একটি নির্দিষ্ট সময় নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, স্থানীয় সমস্যা, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিরোধী মতের প্রতি সহানুভূতির অভাব- এসব মিলিত হয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে স্থিতিশীল নীতি ও কাঠামো নির্মাণ, যেখানে রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যা শুধু নির্বাচনের দিন নয়, বরং নির্বাচনকালজুড়ে জনগণের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। বাস্তব চিত্র বলছে, নির্বাচনি মাঠ এখনো নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলা হয়েছিল, তা স্থায়ী হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের শরিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ক্ষমতার প্রশ্ন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং কৌশলগত মতভেদ সেই ঐক্যকে ভেঙে দিয়েছে। জনগণ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা এখন অনিশ্চয়তায় ঢাকা পড়েছে। মানুষ প্রশ্ন করছে, এ নির্বাচন কি সত্যিই সেই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হবে, নাকি আবারও ক্ষমতার পুরোনো খেলা চলবে?
আজকের বাংলাদেশ একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি। আমরা কি সহিংস ও অবিশ্বাসের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারব, নাকি বারবার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাব? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয়তার ওপর। সামগ্রিকভাবে, আসন্ন নির্বাচনটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে দেশকে। এ নির্বাচন কি নতুন আস্থার জন্ম দেবে, নাকি আরও একটি বিতর্কের অধ্যায় তৈরি করবে- তা এখনো বলা কঠিন। তবে নির্বাচনকে অর্থবহ করতে হলে সব পক্ষকে একই মানসিকতা নিয়ে এগোতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
