দেশে জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের যে হার তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পৃথিবীর যেসব দেশের কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর আদায়ের হার বাড়ছে না, বরং আরও কমছে। এটি খুবই উদ্বেগজনক।...

দেশে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামালাতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাপনা এবং সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। উন্নত মুদ্রাবিনিময় স্থিতিশীলতা, উচ্চ বৈদেশিক রিজার্ভ এবং মন্দাক্রান্ত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে একটি মন্থর স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। বিনিয়োগের নিম্নমুখিতা, বেকারত্বের বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরির পতন এবং দারিদ্র্য বেশিসহ বৃদ্ধির হার প্রায় ৩.৪ শতাংশ, যা কম বিনিয়োগ, বেকারত্ব বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রতিফলন। খাদ্য ও চালের উচ্চমূল্যের চাপে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে রয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতের তীব্র চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রাজস্ব আদায়- সবকিছুতেই গতিশীলতা আনা দরকার। আর এ গতিশীলতা আনতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে হলে সময়মতো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। বর্তমানে যে পরিমাণে এলসি খোলার কথা, তার থেকে কম খোলা হচ্ছে। এতে কাঁচামাল যতটা আসার কথা তার তুলনায় কম আসছে। উৎপাদন যতটা বাড়ার কথা ততটা বাড়ছে না। বর্তমানে ব্যক্তি খাতের সঞ্চয় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যেতে পারছে না। অনেকে সঞ্চয় করতেই পারছে না। পুঁজি না থাকলে বিনিয়োগ করবে কীভাবে? অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটাতে শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে। অন্যদিকে নতুন শিল্প হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকার পরিবর্তনের পর অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। মালিক অন্যায় করলে তার বিচার হবে। এর জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা যাবে না। আমি চাই, কোনো উৎপাদনশীল খাতে সরকার এমন কোনো কাজ করবে না, যাতে দেশের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শ্রমিকরা তাদের চাকরি হারায়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে ঠিক। কিন্তু দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে মন্থরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ ও অত্যন্ত নিম্নহারের কর-জিডিপি অনুপাত অর্থনীতিতে সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখন আমাদের ব্যবসায়িক আস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আবার, স্বল্পমেয়াদে নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থায় মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়ন দুটোই হতে পারে। অবমূল্যায়ন রপ্তানি বাড়ায় ও আমদানি কমায়, আর মূল্যায়ন আমদানি বাড়াতে ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা আছে। বিশেষভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, অবকাঠামো- এসব খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেশি। অথচ আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ পরিস্থিতির সমাধান দরকার। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। সরকার রাজস্ব আয় থেকে ব্যয় নির্বাহ করতে পারছে না। বেতন-ভাতাসহ অনেক খরচ সরকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে করছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পে বিনিয়োগ না বাড়লে এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না। দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট চলছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পে উৎপাদন দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে জ্বালানিসংকট আছে। আমাদের ৭ দশমিক ৮০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত আছে। প্রতি বছর আমাদের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর ৩০ শতাংশ আমদানি করি। বাকি ৭০ শতাংশ মজুত থেকে ব্যবহার করি। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে গেলে তখন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হতে হবে আমাদের। এনিয়ে বিনিয়োগকারীরা দুশ্চিন্তায় আছেন। বিগত সরকারের সময়ে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা উচিত। আশা করি, এ বিষয়ে আগামী নির্বাচিত সরকার গুরুত্ব দেবে।
বর্তমানে দেশের সাধারণ জনগণ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। তার কারণ, মূল্যস্ফীতি বাড়লে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে কারণে উচ্চমধ্যবিত্তের মানুষ হয়তো তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার মানটা রক্ষা করতে পারে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো সঞ্চয় নেই। এ মানুষগুলোর জীবনমান ক্রমশই নিম্নমুখী হচ্ছে। এখানে যা করতে হবে; সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যেসব প্রকল্প আছে তা যেন সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রতিটি দেশই চায় কীভাবে সর্বাধিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। বিপরীতে বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর দরকার আছে। সে ক্ষেত্রে ঋণ না নিয়ে কীভাবে রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে বাড়তি ব্যয় মেটানো যায়, সেটি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশে জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের যে হার তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পৃথিবীর যেসব দেশের কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর আদায়ের হার বাড়ছে না, বরং আরও কমছে। এটি খুবই উদ্বেগজনক। দেশে বিদ্যমান আর্থসামাজিক অবস্থায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। বাস্তবে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। এরপর যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটিও ব্যয় হয় না। ফলে সরকারি অর্থ ব্যবহারের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব আছে, ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ফলে বরাদ্দ অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। কারণ, সরকারি বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। এতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দেশে রপ্তানি আয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের নিচে। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের মুদ্রার বিনিময় হার বেশি। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে টাকা। তবে ডলারের দাম মূল্যস্ফীতি আমাদের প্রভাবিত করে। কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং কিছু খাদ্যও আমরা আমদানি করে থাকি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কাম্য নয়। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষের যাতে ক্ষতি না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অন্যদিকে দেশে বৈষম্য বাড়ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আঞ্চলিক বৈষম্য। সে ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যেসব বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার সুবিধা প্রকৃত লোকজন পায় না। তাই এখানে দুর্নীতি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজস্ব বাড়ানোর জন্য অবশ্যই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এজন্য বর্তমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করা জরুরি। তাদের কর নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে কর ফাঁকি রয়েছে। যেমন ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক দোকানদার রসিদ দেয় না। তারা টাকা আদায় করলেও সরকারের কোষাগারে জমা দেয় না। আয়করের ক্ষেত্রে যাদের টিআইএন যাদের আছে, আয়কর রিটার্ন জমা দেয় তার অর্ধেক। বাকি অর্ধেককে কেন পাওয়া যাচ্ছে না, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। ফলে আমাদের করদাতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি- এটি সংকুচিত হয় না, বরং প্রবৃদ্ধি কমে যায়। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতি রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩-৩.৫ শতাংশ, কিন্তু পরবর্তী প্রতিটি দশকে গড় প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ১ শতাংশ করে বেড়েছে। অর্থাৎ অন্তর্নিহিত প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা প্রায় ৬ শতাংশ। বর্তমানে ৪ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি মূলত বিনিয়োগ হ্রাসের ফল। আমাদের প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগ-নির্ভর; ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ৩০ শতাংশ প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে তা প্রায় ২৮-২৯ শতাংশ। তবুও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক থেকেই সামষ্টিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার হয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি, যা প্রায় ৮.৩ শতাংশ। দেশে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও জনগণের ওপর সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসই হতে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ছাড়া প্রবৃদ্ধি ভঙ্গুরই থাকবে। সিন্ডিকেট নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে- এখনো সিন্ডিকেট আছে এবং তা ব্যাপকভাবেই আছে। এ মন্তব্য নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য। মাঝেমাঝে আমরা দেখি অপারেশন হয়। সেই অপারেশনে কয়জনকে ধরা হয়, কয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেটা নিয়ে আলোচনার বিষয় থাকতে পারে। মোটামুটিভাবে সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য আমি মনে করি, বর্তমানে যে আইন আছে ‘প্রটেকশন অব কনজ্যুমার লাইফ’- সে আইনের যথাযোগ্য বাস্তবায়ন জরুরি। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে এর মাত্রা বাড়ানো যেতে পারে। সবশেষে বলা যায়, সর্বপ্রথম অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ
