যে আইন-নীতি দরকার তা নেই
আবুল হোসাইন
রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পান না। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির জন্য যে শ্রম আইন থাকা দরকার, যে শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করা দরকার, তা নেই। সরকার ও মালিকদের যে দৃষ্টিভঙ্গি থাকা দরকার, সেই দৃষ্টিভঙ্গিও নেই। শ্রম আইনে শুধু মালিকদের একপক্ষীয় কথা লেখা হয়ে থাকে। কিন্তু সরকার শ্রমিকদের কথা শুনতে চায় না। সরকার মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করে চলে। এখানে সরকার ও মালিক পক্ষ মিলেমিশে একাকার। তাহলে শ্রমিকরা কিভাবে তাদের ন্যায্য মজুরি পাবেন?
বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলনের আগের সেই জৌলুশ নেই। শ্রমিক সংগঠনগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন শিল্পকারখানা আগের মতো নেই। ফলে সরকারি শ্রমিক সংগঠনগুলো দুর্বল হচ্ছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের চাপ আগের মতো নেই। চাপ না থাকলে তো মালিকরা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দেন না। কারণ পুঁজিবাদের ধর্মই হচ্ছে মুনাফার ধর্ম। মালিকদের বেশি মুনাফা লাভের আশায় ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকরা। এ ছাড়া ন্যায্য মজুরি আদায়ের জন্য মালিকদের ঠিকমতো চাপ দিতে পারছে না শ্রমিক সংগঠনগুলো।
বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলন সার্বিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কারণ শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন তাদের রাজনৈতিক আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। সবার দৃষ্টি এক না। সবকিছু মিলিয়ে একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। আশা করি, আগামী দিনে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ে সংগঠনগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
সভাপতি, জাতীয় কারিগর ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন
কমিশন গঠন ও নীতিমালা জরুরি
কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন
বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে নয়া উদারপন্থি নীতির ভিত্তিতে। অর্থাৎ তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চলছে দেশ। যেখানে শ্রমিকরা মজুরি পান কম, বেশি মুনাফা করেন মালিকরা। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এই ধনী লুটেরা গোষ্ঠী শ্রমিকদের নানাভাবে শোষণ করে। তারা লুটপাট করে বিদেশে অর্থপাচার ও বিলাসী জীবনযাপন করছে। যার প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার ওপর।
অনেক সময় তো এই ধনী শ্রেণি শ্রমিকদের মজুরি ঠিক সময়মতো দেয় না। এ ছাড়া কম টাকা বেতনে সস্তা শ্রম পাওয়া যায়। এ জন্যও কারখানার মালিকরা ন্যায্য মজুরি দিতে চান না। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বাধ্যতামূলক করার জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান দ্রব্যমূল্য বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা করা জরুরি।
আগামী দিনে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে বর্তমান সরকারকে আগে জরুরিভিত্তিতে শ্রম নীতিমালা করতে হবে। শ্রম কমিশন গঠন করে তা কার্যকর এবং কমিশনের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। যাতে শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষ ঠিকমতো বাঁচতে পারে। পাশাপাশি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতে দিতে হবে। আমি আশা করি, সরকার শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। শ্রমজীবী মানুষের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা গেলে ন্যায্য মজুরির স্থায়ী সমাধান হবে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রাম আমাদের অব্যাহত থাকবে।
সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
ন্যায্য মজুরি দিতে চান না মালিকরা
মোশরেফা মিশু
সরকার ও মালিকদের দোষে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। কারণ শিল্প কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে চান না। ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেছিলাম। সেই সময়ে পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ-যুবলীগ শ্রমিকদের সেই আন্দোলনে হামলা চালিয়েছিল। এতে চারজন শ্রমিক পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। পরে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি মেনে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নীলফামারী, কুমিল্লাসহ অধিকাংশ শিল্প কারখানায় এখনো সেই ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করেননি মালিকরা। কোথাও ৯ হাজার টাকা, কোথাও ১০ হাজার টাকা মজুরি দিচ্ছে। সরকারের ঘোষণাই মানছেন না কারখানা মালিকরা। তাহলে সরকার কী করছে? শ্রম মন্ত্রণালয় কী করছে? আসলে সরকার সবকিছু জেনেও মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু করেছে। কিন্তু দেশের সাড়ে ৭ কোটি শ্রমিকদের জন্য কোনো ঘোষণা নেই। কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা শুধু কাগজে আছে, বাস্তবে তার থেকেও অনেক বেশি সময় কাজ করেন শ্রমিকরা। বিশেষ করে চা শ্রমিক, গামেন্টসহ বিভিন্ন সেক্টরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টার চেয়ে অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু অতিরিক্ত এই ৪-৫ ঘণ্টা কাজের কোথাও লেখা হয় না। ওভারটাইম হিসেবেও বাড়তি মজুরি দেওয়া হয় না। এভাবে প্রতিটি ধাপে শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে। তাই অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ঠিক করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ ছাড়া বাংলাদেশে কোথাও শ্রমিকদের উন্নত কর্মপরিবেশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় শ্রমিকরা মারা যাচ্ছেন। তাই শ্রমিকদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে নজর দিতে হবে।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে মে মাসের মধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা উচিত হবে। বর্তমান বাজারদর আমলে নিয়ে শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করতে হবে। গামের্ন্টস শ্রমিকসহ সারা দেশের শ্রমিকদের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
সভাপতি, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম
বিবেচনায় রাখতে হবে বাজারদর
মনীষা চক্রবর্তী
মজুরি বাড়ানোর প্রসঙ্গ যখন আসে তখন প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার–শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর কথা বলতে চান না, তারা ন্যায্য মজুরির কথা বলেন। তারা তাদের শ্রমশক্তির বিনিময় মূল্য চান, তারা কোনো মালিকের করুণা চান না। যেকোনো কাঁচামাল, বিদ্যুৎ বিল বা যন্ত্রপাতির খরচ সেগুলো সব কিছুই সুনির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু যখন এগুলোর ওপর শ্রম যুক্ত হয়, শুধু তখনই সেটি একটি পণ্য হয়ে ওঠে, তার বিনিময় মূল্য তৈরি হয়।
বাংলাদেশে নিম্নতম মজুরি বোর্ড ৪৬টা সেক্টরে মজুরি নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ২৯টি সেক্টরে এখন পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি। ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কারখানা কম মজুরি দিয়ে কাজ করায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, গার্মেন্টস খাতের ৩২ শতাংশ কারখানা এখনো ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি সাড়ে বারো হাজার টাকা দেয় না। শ্রমিকরা শ্রম দিয়ে পণ্য তৈরি করেন, কিন্তু নিজেরা মূল্যায়ন পান না। রক্ত না দিয়ে মজুরি বাড়ানো যায় না। একদিকে তারা ঘাম ঝরিয়ে কাজ করেন, আরেকদিকে মজুরি না পেয়ে চোখের জল ফেলেন। শ্রম আইনের সংশোধনের কথা বলা হলেও ২৬ ধারায় চাকরিচ্যুত করার অগণতান্ত্রিক ধারা শ্রম আইনে রেখে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করলেই ছাঁটাই করার অস্ত্র হিসেবে মালিকরা সেই ধারা ব্যবহার করেন।
শ্রমিক কাজ করে দারিদ্র্য দূর করার জন্য, তার জীবনমান উন্নয়নের জন্য। কিন্তু আমাদের দেশের শ্রমিকরা উদয়াস্ত কাজ করেও দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারছেন না। মজুরি নির্ধারণ করতে হবে বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে। শ্রমিকদের জন্য রেশনিংব্যবস্থা, আবাসন, পেনশনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। দুর্ঘটনায় আজীবন ধরে আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। শ্রমিকদের অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার আইনে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে এই অধিকার খুবই সীমিত। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই বেশি দিন টেকেনি। মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একত্রিত হলে শ্রমিকরা বন্দুকের গুলি–ফাঁসির দড়ি কোনো কিছুকেই ভয় পায় না। শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামই আগামীর পৃথিবীর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করুক, এই হোক মে দিনের প্রত্যাশা।
সদস্যসচিব, বাসদ, বরিশাল জেলা কমিটি
