উপযুক্ত কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক হচ্ছে একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আবার শ্রমিক যদি অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত হয়, তাহলে তা দেশের জন্য ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এক সময় বাংলাদেশের অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু জনসংখ্যা, তা পরিকল্পিতই হোক, আর অপরিকল্পিত, কখনোই এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হতে পারে না।...

একজন মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো না কোনো কাজে ব্যাপৃত থাকেন। সেটা হতে পারে কায়িক পরিশ্রম, আবার হতে পারে মানসিক পরিশ্রম। যেহেতু একজন মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো-না-কোনোভাবে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। বস্তুতপক্ষে, প্রত্যেক মানুষই শ্রমিক বা শ্রমজীবী; আমরা অনেকেই এ সত্য স্বীকার করতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুন্দর কথা বলেছেন- নিজেকে শ্রমিক হিসেবে ভাবতে পেরেছেন, এটি তার উদারতার লক্ষণ বটে।
বাংলাদেশ একসময় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ ছিল। সে অবস্থা থেকে এখন আমরা শিল্পনির্ভর অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। বিশেষ করে ’৭০-এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। এখন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলেই প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক এবং জনশক্তি রপ্তানি খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশ দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এটি কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, আমরা এখনো শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করতে পারিনি। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত চমৎকারভাবে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক শোষণ এসব প্রতিষ্ঠানেই সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। যেসব শিল্পকারখানার মালিক রাজনৈতিক দলের অনুসারী, তাদের প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক শোষণ সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন মোটামুটি পালন করা হলেও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে এসবের কোনো বালাই নেই। কর্মরত শ্রমিকদের যে মজুরি দেওয়া হয়, তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো সম্ভব হয় না। সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করে দিনশেষে তারা যে মজুরি নিয়ে বাড়ি ফেরে, তা দিয়ে নিত্যদিনের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা। তারাই সবচেয়ে নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত এবং মজুরিবৈষম্যের শিকার।
মানবজাতির ইতিহাস প্রকৃতি এবং সমাজকে মানুষের বিকাশের উপযোগী করে তোলার সংগ্রামের ইতিহাস। মানুষ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ভীষণ গরম, বন্যা, খরা ইত্যাদি মোকাবিলা করে যেমন বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে, তেমনি চেষ্টা করেছে প্রকৃতির নিয়মকে জেনে তা কাজে লাগানোর; যাতে তার জীবন নিরাপদ হয়, সুন্দর হয়। পাশাপাশি মানুষ চেয়েছে সবাই মিলে বাঁচতে এবং জীবনকে উন্নত করতে। সে কারণে সমাজে বৈষম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুগে যুগে মানুষ লড়েছে। প্রকৃতির নিয়ম জানা এবং কাজে লাগানোর জন্য মানুষ হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলগত জ্ঞানকে আর সমাজকে বুঝতে ও উন্নত করার জন্য চর্চা করেছে সমাজবিজ্ঞানের। প্রকৃতিকে জানা এবং সমাজকে জানা- এ দুই ক্ষেত্রেই মানুষ ব্যবহার করেছে তার শ্রমশক্তিকে। তাই মানবজাতির ইতিহাস এক অর্থে শ্রমের ইতিহাস। এ ইতিহাসের প্রধান নায়ক শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ ও উপেক্ষা করে সমাজ এগিয়ে যেতে চেয়েছে বলেই বিশ্বব্যাপী বৈষম্য তীব্রতর হয়েছে দিনে দিনে।
বাংলাদেশে প্রচলিত আইন মোতাবেক ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কর্মে নিযুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনের এ বিধান লঙ্ঘন করে শিশুরা বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রে কর্মরত আছে। পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের হার বেশি। বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশে এ হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক অর্থাৎ ২৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ শিশু শ্রমিক কাজ করে। ৬৯ শতাংশ শিশু শ্রমিকের পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। পর্যায়ক্রমে শিশুশ্রম নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের আইনসম্মত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিক, কর্মচারী ও কৃষক না বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে না।
উপযুক্ত কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক হচ্ছে একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আবার শ্রমিক যদি অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত হয়, তাহলে তা দেশের জন্য ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এক সময় বাংলাদেশের অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু জনসংখ্যা, তা পরিকল্পিতই হোক, আর অপরিকল্পিত, কখনোই এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হতে পারে না। জনসংখ্যাকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসম্পদে পরিণত করা গেলে তা একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হতে পারে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে না পারার ব্যর্থতা রাষ্ট্রের। বর্তমান সরকার জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। সরকার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্যও উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে যারা শ্রমিক-কর্মচারী হিসাবে কর্মরত আছেন, তাদের আইনসম্মত অধিকার নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে নৈতিকতা ও কর্মকুশলতা প্রত্যাশা করা যায় না। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মেশিনের পেছনে যে মানুষটি কর্মরত, তার প্রয়োজন কখনোই শেষ হবে না।
তারেক রহমান বলেছেন, ‘আজ থেকে আপনাদের খাতায় শ্রমিক হিসেবে আমার নাম লিখবেন। আমি আপনাদেরই লোক।’। তিনি আরও বলেন, বিগত দিনগুলোয় যেসব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো আবারও পর্যায়ক্রমে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, শ্রমিকরা ভালো থাকলে, বাংলাদেশ ভালো থাকবে। একইভাবে কৃষক ভালো থাকলে, বাংলাদেশ ভালো থাকবে। তিনি আরও বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকার আমলে দেশের শিল্পকারখানাগুলো পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দিয়ে দেশকে আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারে ২০৩৪ সালে মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটাই প্রমাণ করে, তিনি মানসিকভাবে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করেন। তার এ বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং জাতীয় জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি। অতীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীদের অনেকেই শ্রমিকদের কল্যাণে নানা কথা বলেছেন; কিন্তু কেউই নিজেকে শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত বলে আখ্যায়িত করেননি। শ্রমিকদের দলভুক্ত ভাবার মধ্যে তাদের সমস্যায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। একজন মানুষ চাইলেই নিজেকে কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত ভাবতে পারেন না। তিনি শ্রেণিভুক্ত হয়েও নিজেকে খেটে খাওয়া মানুষের অন্তর্ভুক্ত বলে ভেবেছেন। সরকারপ্রধানের এ একাত্মতা বোধ শ্রমিকশ্রেণির অগণিত সমস্যা সমাধানে অবদান রাখবে বলে মনে করি।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
