কেউ ছিলেন দলের চেয়ারম্যান, কেউবা সাধারণ সম্পাদক। আবার কেউবা ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে। প্রত্যেকেই জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে রাজপথেও ছিলেন সক্রিয়। কোনো কোনো নেতা আবার নিজের দলই বিলুপ্ত করেছেন। নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন শরিক দলের আট নেতা। যোগদান করা একাধিক নেতা আলাপকালে জানান, প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও তাদের নেই কোনো পদ-পদবি। বড় দলে যোগ দিয়েও যেন ‘পরিচয়হীন’ অবস্থায় দিন কাটছে তাদের। নির্বাচন শেষ হওয়ায় বিএনপিতে তাদের প্রকৃত অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে সবাই একসঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চিন্তাভাবনা করছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুধু বিএনপির সদস্য ফরম পূরণ করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে নামেন শরিক দলের সাত নেতা। এরা হলেন গণফোরামের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া, বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সাবেক মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) সাবেক চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। এদের মধ্যে হবিগঞ্জ-১ আসনে রেজা কিবরিয়া, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজ জয়ী হয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন ববি হাজ্জাজ। এ ছাড়া বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন গণফোরামের আরেক সিনিয়র নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাইয়িদ। তিনি ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এই আট নেতারই যোগদানের এক মাস অতিবাহিত হলেও এখনো মেলেনি কাঙ্ক্ষিত দলীয় পদ। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় সংকট কাটাতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবছেন তারা। কয়েকজন নেতা নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন।
যদিও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বিএনপিতে যোগ দেওয়া নেতাদের পদ-পদবির বিষয়টি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে। তাদের কাউন্সিলের মাধ্যমে পদ-পদবি দেওয়া হতে পারে। এপ্রিল-মে মাসে দলের কাউন্সিল হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, যারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, নির্বাচনের ব্যস্ততার কারণে তাদের ব্যাপারে দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়নি। বিএনপির চেয়ারম্যানের ওপর তাদের পদ-পদবি নির্ভর করছে।
যদিও যোগ দেওয়া একাধিক নেতা বলেন, বিএনপিতে অনেক পদ এখনো শূন্য আছে।
হাইকমান্ডের সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো সময়ই তাদের পদ দেওয়া সম্ভব।
যোগদান করা একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের কঠিন সময়ে যখন বিএনপির কেউ কথা বলতে পারত না, তখন তারাই জাতীয় রাজনীতিতে কথা বলেছেন। টেলিভিশন টকশোতে বিএনপির পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন। সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলে যোগ দিতে বলেছেন, তাই তারা যোগ দিয়েছেন। কিন্তু এখন আর তাদের পুরোনো দলে ফেরার পথও বন্ধ। দল বিলুপ্ত করেছেন, সেই দলও আর গড়তে চান না তারা। শুধু বিএনপিতে সম্মানটুকু চান তারা। দলে যোগদান করার সময় পদ-পদবি নিয়ে আলোচনা করার মতো পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না বলেও জানান একাধিক নেতা।
নির্বাচনের মাঠে পরাজয়ের কারণ হিসেবে কেউ কেউ বলেন, প্রতিটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী থাকায় শরিকদের ভোটের মাঠে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মীদেরও একটি অংশ তাদের পক্ষে কাজ করেননি। ভোটের মাঠে তাদের পরাজয়ের এটিই অন্যতম কারণ।
নিজেদের দল বিলুপ্ত করে নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা। দুজনই বিএনপির চেয়ারপারসন প্রয়াত খালেদা জিয়ার হাতে গড়া ২০-দলীয় জোটের অংশ ছিলেন। ২০-দলীয় জোট বিলুপ্ত হওয়ার পর ১২-দলীয় জোট গঠনে ভূমিকা রাখেন সেলিম ও হুদা। এরপর আবারও যোগদান করেন যুগপৎ আন্দোলনে। রাজপথে সক্রিয় ছিলেন তারা। সৈয়দ এহসানুল হুদা জুলাই আন্দোলনের সময়ে তাকে পুলিশ আটক করেছিল।
শাহাদাত হোসেন সেলিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘দলীয় পদ-পদবির বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে এখনো কথা হয়নি। কথা বলার সময়ও পাইনি। আমরা যারা বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করেছি, তারা সবাই মিলে কথা বলব। আমাদের তো রাজনীতি করার সুযোগ দিতে হবে। আমরা তো সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ। এখন সুযোগ না দিলে ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে পারব না।’
বিএনপি দলীয় পদ-পদবি নিয়ে যোগাযোগ করেছে কি না–জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো যোগাযোগ করেনি। মাত্র তো সরকার গঠন করল। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার সময় দলের পদ-পদবি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। শুধু বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যোগ দিতে বলেছেন, আমরা যোগ দিয়েছি। তখন দলের পদ-পদবির বিষয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না।’
সৈয়দ এহসানুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাত্র নির্বাচন শেষ হলো। এ বিষয়ে আসলে কারও সঙ্গে কথাও হয়নি। আর এই মুহূর্তে তো আসলে দলীয় পদ বা অন্য কিছু দেওয়ার কোনো সুযোগ ওইভাবে দেখছি না। দলের কাউন্সিল না হলে আশা করাটা ঠিক হবে না। আমরা নিজের দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছি। আসলে জানি না এই মুহূর্তে বিএনপি আমাদের নিয়ে চিন্তা করছে কি না।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপিতে আছি। আমি আর দল বদল করব না। আর দল গঠন করব না। সেই জায়গা থেকে আমি মূল্যায়ন পেতে পারি না?’
বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজপথে সক্রিয় ছিল গণঅধিকার পরিষদ। সেই সময়ে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাশেদ খান বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করাসহ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে থেকে অবদান রেখেছেন তিনি। আর সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনের সময় দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন রাশেদ খান।
খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন থেকে সেই সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার যুগপৎ আন্দোলন চলার সময় থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্ক ও যোগাযোগ। গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে তার পরামর্শে আমি ও নুরুল হক বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে অনেক বিষয় সমন্বয় করেছি।’
তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের আদর্শিক জায়গাটার অনেকটা মিল রয়েছে। নুরুল হক নুর বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী। যারা দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করেছেন, তাদের বিএনপি অবশ্যই কাজ করার জন্য সুযোগ তৈরি করে দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাশেদ প্রধান।
গণঅধিকার পরিষদে ফিরে যাওয়ার গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে রাশেদ খান বলেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলতে পারেন। কিন্তু সেটা আমার কথা নয়। আমি বিএনপিতে যোগদান করে নির্বাচন করেছি এবং এখানে থেকেই রাজনীতি করতে চাই। বিএনপির সঙ্গে থেকেই দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে চাই। এর বাইরে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেই।’
১৯৯৬ সালে বিএনপিতে যোগদান করেন রেদোয়ান আহমেদ। তিনি খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভারও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে এলডিপিতে যোগ দেন। এরপর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট থেকেই শরিক ছিলেন তিনি। সম্প্রতি আবারও তার পুরোনো ঠিকানা বিএনপিতে ফেরেন। খবরের কাগজকে রেদোয়ান আহমেদ বলেন, দলের ভেতরে তার অবস্থান নিয়ে কারো সঙ্গে এখনো আলোচনা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কথা বলবেন। বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের দিকে তিনি তাকিয়ে আছেন বলেও জানান।
বিএনপির সঙ্গে জোট রাজনীতির আরেক শরিক এনপিপির সাবেক চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। তিনিও সম্প্রতি বিএনপিতে যোগদান করেন। যদিও খবরের কাগজকে ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘মাত্রই নির্বাচন শেষ হলো। এখন কোনো কিছু চিন্তা করিনি। তবে আমি জোট থেকেই নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছি। আমি দলও বিলুপ্ত করিনি। শুধু ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছি।’
বিভিন্ন দল ঘুরে সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন রেজা কিবরিয়া। আর নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত দল এনডিএম। ববি হাজ্জাজ দলের চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেন। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেও বিএনপিতে নেই তার কোনো পদ।