ঢাকার সাধারণ মানুষ যাদের নাম শুনলেই আঁতকে উঠত, সেই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখন কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছে। এতে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছে। কারণ এসব সন্ত্রাসী আগে দিনে-দুপুরে তাদের চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা না পেয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আবার কেউ কেউ মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে টাকার পাহাড় গড়েছিল। একাধিক হত্যাকাণ্ড ও বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগে দেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনে পুলিশ। দীর্ঘদিন তারা কারাগারে ছিল। গত ১ মাসে প্রায় ৬ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। এদের পাঁচজনের অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
এদিকে আইনজীবীদের মতে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনের বিরোধিতা করার সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে সহজেই তারা জামিন পেয়েছে। তবে জামিন বাতিলের সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে জনমনে আতঙ্কের কথা বিবেচনা করে জামিন বাতিলের আবেদন করতে পারে।
জামিনে মুক্তি পাওয়া ছয় শীর্ষ সন্ত্রাসী হলো শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, আব্বাস হোসেন ওরফে কিলার আব্বাস, সানজিদুল ইসলাম ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল ও ফ্রিডম রাসু।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে। এদের ধরিয়ে দিতে সরকার সে সময় পুরস্কার ঘোষণা করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত ও একজন গণপিটুনিতে মারা গেছে। দুজন কারাগারে রয়েছে। ১৩ জন ভারত, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে পলাতক রয়েছে। বাকি ছয়জন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে।
সূত্র জানায়, এই ছয় শীর্ষ সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার কারণে তারা যেসব এলাকাতে প্রভাব বিস্তার করত সেই সব এলাকায় আবারও নতুন করে নজরদারি শুরু হবে। তারা যাতে আগের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে না পারে সেই দিকে নজর রাখা হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করীম মল্লিক জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যে জামিনে মুক্তি পেয়েছে, তারা সেই বিষয়টি অবগত আছেন।
এ বিষয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের জেলার লুৎফর রহমান জানান, শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম এবং কিলার আব্বাসের জামিনের কাগজপত্র কারারক্ষীরা হাতে পেলে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। অন্যদেরও একইভাবে মুক্তি দেওয়া হয়।
জানা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছে সুইডেন আসলাম। ২০১৪ সাল থেকে সে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিল। বিগত চারদলীয় জোট সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২০ নম্বরে ছিল আসলামের নাম। ১৯৮৬ সালে কিশোর শাকিলকে গুলি করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। পরে সে সুইডেনে চলে যায়। এরপর দেশে ফিরে এলে তার নামের সঙ্গে সুইডেন যুক্ত হয়। শেখ আসলাম ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ছাতিয়ার এলাকার মৃত শেখ জিন্নাত আলীর ছেলে। ১৯৯৭ সালের ২৩ মার্চ তেজগাঁওয়ে যুবলীগ নেতা গালিব খুন হন। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় আসলাম আসামি ছিল। আসলাম ছাড়াও মামলার এজাহারে ২০ জন আসামি ছিল। ওই মামলায় ১৯৯৮ সালের ৮ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। এ মামলার ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত পুলিশ মাত্র ১৪ জনকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে। এ মামলায় জামিন পায় আসলাম। এ ছাড়া বাকি আটটি মামলায়ও জামিন পায় আসলাম। ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, সুইডেন আসলাম দেশেই আছে। তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট সোমবার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পায় রাজধানীর আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস। আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাসের বাবার নাম সাহাবুদ্দীন ওরফে তমিজ উদ্দীন। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের সামনে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার পর এই শীর্ষ সন্ত্রাসী আলোচনায় আসে। এ ছাড়া কাফরুলের কচুক্ষেতে আরও এক ব্যবসায়ীকে গুলি করার অভিযোগে তার নামে মামলা হয়। ২০০৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
সেই থেকে কাশিমপুর কারাগারের হাই সিকিউরিটি সেলে বন্দি ছিল আব্বাস। প্রায় ২১ বছর কারাবন্দি থাকার পর কিলার আব্বাস থেকে মুক্তি পায়। কিলার আব্বাসের বিরুদ্ধে ৬টি হত্যাসহ ১০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেসব মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়েছে। শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর তালিকার ১০ নম্বরে আছে কিলার আব্বাসের নাম। কিলার আব্বাস দেশে নেই বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তার অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করছে পুলিশ।
গত ১৬ আগস্ট কাশিমপুর কারাগার থেকে পিচ্চি হেলাল মুক্তি পায়। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর পিচ্চি হেলালকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে চারটি হত্যা মামলাসহ আটটি মামলা রয়েছে। ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় পিচ্চি হেলাল ছিল ১৬ নম্বরে। জানা গেছে, পিচ্চি হেলাল তার সব মামলায় জামিন পেয়েছে। গত তিন বছর ধরে হেলাল নিয়ম রক্ষার জন্য কারাগারে ছিল। তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সাক্ষ্য দিতে কেউ আদালতে যাননি। তার বাবার নাম আব্দুল জব্বার ওরফে শফিক আহম্মেদ। বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব এলাকায়। পিচ্চি হেলাল জামিনে পাওয়ার পর দেশেই আছে বলে জানা গেছে। তবে তার অবস্থান জানা যায়নি।
গত ১২ আগস্ট মুক্তি পায় ফ্রিডম রাসু। ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় তার অবস্থান ছিল ৬ নম্বরে। রাসুর বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তা হত্যাসহ ১৩টি মামলা রয়েছে। সব মামলায় জামিন পায় রাসু। ডিবি পুলিশ রাসুর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।
গত ১৩ আগস্ট কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি জেল থেকে জামিনে মুক্তি পায় শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। টিটনকে ২০০৪ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটন ছিল ২ নম্বরে। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। টিটন জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর লাপাত্তা হয়ে গেছে।
গত ১৫ আগস্ট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন মুক্তি পান। তার বিরুদ্ধে প্রায় ১ ডজন মামলা রয়েছে। সব মামলায় জামিন পেয়ে ইমন কারাগার থেকে মুক্তি পায়। ইমনের অবস্থান জানা যায়নি।
এদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবাধে জামিন পাওয়ার বিষয়ে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতে সন্ত্রাসীদের জামিনের বিরোধিতা করার সুযোগ ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সেই কাজটি করেননি। ফলে তারা সহজেই জামিন পেয়েছে। তবে এখন জামিন বাতিলের সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে জনমনে আতঙ্কের কথা বিবেচনা করে জামিন বাতিলের আবেদন করতে পারে।
এ বিষয়ে গতকাল সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল খবরের কাগজকে বলেন, সন্ত্রাসীদের জামিন আবেদনের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা বিরোধিতা করেননি বা করতে পারেননি। ফলে তাদের জামিন পাওয়া অনেকটা সহজ হয়েছে। এরপর তাদের জামিন বাতিল চেয়ে আপিল করা যেত। সেটাও করা হয়নি। তারা (সন্ত্রাসীরা) যদি ডিউ প্রসেসে জামিন নিয়ে বেরিয়ে থাকে, কারামুক্তির পর যদি তারা জামিনের অপব্যবহার করে বা আবারও সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টের শঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সরকার চাইলে তাদের জামিন বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারে। তা ছাড়া এখনো নিম্ন আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষের সেই আইনজীবীরাই আছেন। প্রসিকিউশন টিম এখনো ঠিকঠাক রদবদল হয় নাই। নতুন আইনজীবী নিয়োগ হলে হয়তো বিষয়গুলো তারা দেখবেন।’