চট্টগ্রামের অগ্নিদগ্ধ সংকটাপন্ন রোগীদের ঢাকা নির্ভরতা কাটছে না। বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রায় চার কোটি বাসিন্দার একমাত্র সম্বল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে শয্যা আছে মাত্র ২৬টি। অথচ এখানে গড়ে রোগী ভর্তি থাকে দ্বিগুণেরও বেশি। রোগী একটু সংকটাপন্ন হলেই দৌড়াতে হয় ঢাকায়।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, চট্টগ্রামে আগুনে দগ্ধ রোগীদের ঢাকা-নির্ভরতা আর কত দিন থাকবে? দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে কোনো রোগীর ২০ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি দগ্ধ হলেই চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক শিপইয়ার্ড। একসময় শিপইয়ার্ডের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এই জাহাজভাঙা শিল্পের সঙ্গে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি জড়িত। জাহাজভাঙা শিল্পে অগ্নিদগ্ধের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিদিন কোনো না কোনো ইয়ার্ডে কেউ না কেউ দগ্ধ হচ্ছেন। এ ছাড়া পোশাক কারখানাগুলোতেও আট লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করেন। রয়েছে দেশের একমাত্র সমুদ্রবন্দর। এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া আগুন ও গ্যাস বিস্ফোরণ দুর্ঘটনায় কেউ না কেউ আহত হচ্ছেন। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি শহরে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সর্বশেষ গত ১০ ফেব্রুয়ারি সোমবারও অগ্নিদগ্ধ হয়ে দুজনের মৃত্যু এবং তিনজন মারাত্মক আহত হন। ২০২২ সালের ৪ জুন বিএম কন্টেইনারে বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা যান ৫২ জন, আহত অন্তত ৫০০ মানুষ। সে সময় আহতদের অনেকেই চট্টগ্রামে সুচিকিৎসার অভাবে মারা যান। পরে কাউকে কাউকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
চমেক হাসপাতালে সরেজমিনে পরিদর্শনকালে একাধিক চিকিৎসক ও রোগীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, একসময় সার্জারি বিভাগের এক কোণায় কয়েকটি শয্যা রেখে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। ২০১২ সালে ২৬টি শয্যা নিয়ে ‘বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি’ ইউনিটের যাত্রা শুরু হয়। নামে ‘বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি’ ইউনিট হলেও এখানে কোনো আইসিইউ নেই। শুধু কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। রোগীর অবস্থা একটু সংকটাপন্ন হলেই ঢাকায় ছুটতে হয়। সেটা বেশির ভাগ রোগীর স্বজনদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ ঢাকায় নিয়ে যেতে অনেক খরচ। অচেনা শহরে গিয়ে কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের বিপদেও পড়েন। তাছাড়া ঢাকায় নেওয়ার পথেই অনেক রোগী মারা যান। ২০২৪ সালে চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মোট ১ হাজার ২৮৩ জন ভর্তি হয়। এর মধ্যে মারা যান ১২৪ জন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ৮ হাজার ৭২১ জন, আন্তবিভাগে ফলোআপ চিকিৎসা নেন ১ হাজার ৫৬২ জন, অপারেশন হয় ৬০১টি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চমেক হাসপাতালের প্রধান ছাত্রাবাসের কাছে গোয়াছি বাগান এলাকায় ১৫০ শয্যার ‘বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট’ নির্মাণের জন্য সরকার প্রায় ২৮৫ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে চীন সরকার অনুদান হিসেবে দেবে ১৮০ কোটি টাকা, বাকি টাকা দেবে সরকার। বর্তমানে এর অবকাঠামোগত কাজ চলার সময় উঠেছে পাহাড় কাটা নিয়ে বিতর্ক। এই হাসপাতালের কাজ শুরু করতে গিয়ে পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে। যেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর পাহাড় কাটা বন্ধের নোটিশ দেয়। অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে এই হাসপাতালের কাজ।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন ফোরামের মুখপাত্র মো. খোরশেদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আমাদের এখনো দগ্ধ রোগীর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে হয়। এটা মহানগরবাসীর জন্য অত্যন্ত বেদনার। চীন সরকারের অনুদান নিয়ে যে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে, সেটির গতিও অত্যন্ত শ্লথ। অথচ দেশের সিংহভাগ রাজস্ব চট্টগ্রাম থেকেই আদায় হয়।’
চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের অধ্যাপক ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পোড়া রোগীদের বিশেষায়িত পদ্ধতি ও ব্যবস্থায় চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। তাদের অন্য রোগীদের সঙ্গে মেলানোর সুযোগ নেই। যেসব পোড়া রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের বেশির ভাগের আইসিইউ দরকার হয়। যেখানে সাধারণ শয্যার সংকট, সেখানে আইসিইউ পাওয়া রোগীদের জন্য স্বপ্নের মতো ব্যাপার। এখানে মাত্র ২৬টি শয্যা আছে। সবসময় রোগী থাকে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। তবে বার্ন ইনস্টিটিউট নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে রোগীদের সুচিকিৎসা কিছুটা নিশ্চিত হবে।’